২৮ অক্টোবর ২০২১
`
মাদক কারবারে সহস্রাধিক গডফাদার

হোতাদের আইনের আওতায় আনুন

-

মাদকদ্রব্যের নীল দংশনে দেশের বিপুলসংখক মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজের একটি অংশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রতিনিয়ত দেশে ঢুকছে নিত্যনতুন সব ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য। এগুলো সেবনে দ্রুত জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে নির্জীব হয়ে পড়ছে অনেকে। মাদকাসক্ত ব্যক্তির পুরো পরিবারে নেমে আসছে বিপর্যয়। লক্ষণীয়, একেক সময় একেক ধরনের মাদক দেশের তরুণদের গ্রাস করছে। যেমনÑ আশির দশকে গাঁজা, নব্বইয়ে ফেনসিডিল ও হেরোইন গ্রহণের প্রবণতা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। স্মরণযোগ্য, ফেনসিডিল আসত প্রতিবেশী ভারত থেকে। বাংলাদেশের সীমানাসংলগ্ন এলাকায় ভারতে ফেনসিডিল কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল। এরপর ইয়াবার হাত ধরে এখনকার ট্রেন্ড, ভয়ঙ্কর আইস। মিয়ানমার থেকে যে পথে ইয়াবা আসে, একই রুটে আনা হচ্ছে আইস। আইস আনতে বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। তবে ইয়াবার মতো এর বিস্তার এখনো ঘটেনি। ধনাঢ্য পরিবারের বিদেশপড়–য়া সন্তানরা রাজধানীর ‘অভিজাত’ এলাকায় আইস কারবারের চক্র গড়ে তুলেছে।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সূত্র বলছে, ২০০৭ সালে প্রথম আইসের একটি চালান ধরা পড়ে। এরপর আর এ মাদকের তৎপরতা তেমন দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে ফের আইস ধরা পড়ছে। অত্যন্ত দামি ও ভয়ঙ্কর মাদক ক্রিস্টাল মেথ বা আইস ইয়াবার চেয়ে বহু গুণ শক্তিশালী। আইস ব্যবহারে মানব মস্তিষ্কের নিউরনে তীব্র প্রভাব ফেলে। ব্যবহারকারী হিংস্র হয়ে আত্মহনন বা অন্যকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আইসের মাত্র এক গ্রামের দাম ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এ দু’টি প্রাণবিনাশী মাদক ঢুকছে পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে। একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মুনাফা বেশি হওয়ায় ইয়াবা কারবারিদের নজর আইসের দিকে। একই সাথে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও এর কারবারে ঝুঁকছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) সূত্রমতে, দুই মাস আগে মাদক কারবারিদের হালনাগাদ করা তালিকা অনুযায়ী শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেই এদের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। আর অর্থলগ্নিকারী, গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে সহস্রাধিক নাম। ইতোমধ্যে খসড়া তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। লগ্নিকারীদের মধ্যে রয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, প্রবাসী, আমদানি-রফতানির ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা। এমনকি কিছু জায়গায় সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তারও রয়েছে মাদক কারবারে বিনিয়োগ। পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপির ব্যক্তিগত সচিব, আত্মীয়স্বজন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। আইস কারবারে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের বেশ করেকজন বড় ব্যবসায়ী জড়িত।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদক কারবারিদের নামের তালিকা তৈরি করা হয়ে থাকে। যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাচাই-বাছাই করেই করা হয়। ডিএনসি সূত্রে জানা যায়, মাস দুয়েক আগে ঢাকা বিভাগে সাড়ে তিন হাজার মাদক কারবারির তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। অর্থলগ্নিকারী, গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকতাকারী হিসেবে ঢাকা বিভাগে প্রায় ৬০০ জনের নাম উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে পৃষ্ঠপোষক প্রায় ৪০০ জন এবং কারবারি এক হাজার ৮০০ জনের মতো। তবে গডফাদারের সংখ্যা এখনো সঠিকভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এর কারণ তারা মাদকের পেছনে টাকা বিনিয়োগ করলেও তাদের কাছে কোনো মাদক থাকে না। ফলে আইন অনুযায়ী তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। দেখা যাচ্ছে, আইসের মতো ভয়ঙ্কর মাদক কারবারের অভিযোগে এখন পর্যন্ত যারা গ্রেফতার হয়েছে; তাদের প্রায় সবাই আর্থিক সঙ্কট না থাকলেও লোভে পড়ে এতে জড়িয়ে পড়ছে। এর আগেও আইস চক্রের যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারাও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান।
যদিও মাদকের ব্যাপারে সরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ ঘোষণা করেছে, তবে বাস্তবতা হলোÑ আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করে থাকে। অথচ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তারা চাকরিবিধি অনুযায়ী কার্যসম্পাদনের শপথ নিয়েছেন। সেই শপথের ব্যত্যয় ঘটান অনেকে। দেশবিধ্বংসী মাদক কারবারে জড়িত কারো রাজনৈতিক পরিচয় আমলে না নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হোক।



আরো সংবাদ