১৩ জুন ২০২১
`
ফুলগাছ খাওয়ায় ছাগলের দণ্ড

ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে প্রশ্ন

-

ভ্রাম্যমাণ আদালত করা হলো অপরাধীদের জরুরি শাস্তি দিয়ে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং জনসাধারণকে স্বস্তি দেয়ার জন্য। ইভটিজিং, মাদক রোধ, ভেজাল প্রতিরোধ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় যাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যায় সে জন্যই এর ব্যবহার হতে হবে। এই আদালত অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠার বদলে নিজেরা যা খুশি তাই করে বসছেন। ক্ষমতাপ্রাপ্ত অনেক ম্যাজিস্ট্রেট নিজেদের প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না। এর মধ্যে মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ঠুনকো ব্যাপার নিয়ে সাংবাদিককে শায়েস্তা করতে দেখা গেছে। ঘটেছে নানা ধরনের হাস্যরসাত্মক ঘটনাও। এ অবস্থায় আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যারা এর অপপ্রয়োগ করছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, বোঝা যাচ্ছে না। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভালো অনেক কার্যক্রমের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন হতে দেখা গেছে। এই আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা না গেলে ভালো দিকটি ম্র্রিয়মাণ হয়ে যাবে। এর দ্বারা নানাভাবে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা আরো বাড়তে পারে।
সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও এর নির্বাহী দায়িত্ব পালনকারী এক ম্যাজিস্ট্রেট আলোচনায় এসেছেন বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায়। সেখানে দেখা গেল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সীমা শারমিন ফুলগাছ খাওয়ার জন্য এক ছাগলকে দণ্ড দিয়ে দিলেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি রক্ষাকবচ কিভাবে হাসিতামাশার বিষয়ে পরিণত হয়, এই ঘটনা তার প্রমাণ। ইউএনও ঠিক ছাগলকে সরাসরি দণ্ড দেননি। তিনি ছাগলের মালিককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। এ ধরনের সামান্য ব্যাপারে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কারণে দেশের মানুষের কাছে ব্যাপারটি হাসির খোরাক হয়েছে। আইন প্রয়োগ করে সাজা দান একটি সিরিয়াস বিষয়। একজন দায়িত্বশীল ম্যাজিস্ট্রেট এটা নিয়ে তামাশা করতে পারেন না। সংবিধানের আওতায় থেকে এভাবে সিরিয়াস বিষয় নিয়ে হালকা কাজ করা হলে আইনের কার্যকারিতা নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ওই ইউএনওকে অবশ্য বদলি করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সাংবাদিক নিপীড়নের জন্য ব্যবহার করতে দেখা গেছে প্রশাসনের লোকদের। কুড়িগ্রামের একটি পুকুরের নামকরণ সাবেক এক জেলা প্রশাসকের নামে করার খবর প্রকাশিত হওয়ায় তিনি এক সাংবাদিকের ওপর ক্ষেপে যান। বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিকে গভীর রাতে এ জন্য দরজা ভেঙে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। মধ্যরাতে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তার বিরুদ্ধে রায় দেয়া হলো। এ কাজটি করতে গিয়ে পুরো প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই সময় সে সাংবাদিককে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। একই জেলায় আরেকটি ঘটনায় মোবাইল কোর্ট স্থানীয় এক দোকানিকে ১০ দিনের জেল অনাদায়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। বরিশালের এক আইনজীবীকে ধরে সাত দিনের কারাদণ্ড দিয়ে বসেন আদালত। এ ধরনের অনেক অভিযোগ ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের বিচারে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ভুল রায় দেয়া হয়েছে।
খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কিছু কার্যক্রম সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে। নদী উদ্ধার করে এবং অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষায় এই আদালত কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইভটিজিং দমনসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের আরো কিছু ভালো কাজ আমরা দেখেছি। ভোক্তা অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে সাহসিকতা প্রদর্শন করে কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। এই আইনটি সঠিক ব্যবহার করে সুখ্যাতি পাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটদের জাতি মূল্যায়ন করে থাকে। তাদের কার্যক্রমের সুফলের জন্য তাদের প্রশংসা করে। দেখা গেল, এ ধরনের ন্যায়পরায়ণ মাজিস্ট্রেট বদলি হয়ে গেছেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ করে সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। অন্য দিকে যারা এ আইনের অপব্যবহার করে প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন তাদের বিরুদ্ধে উচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। তাহলে এ থেকে কী বার্তা পাওয়া যায়? সরকার কি ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঠিক ব্যবহার করতে চায় না? আমরা মনে করি, এই আইনটি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে যারা এই আইনটি ব্যবহার করে নিজেদের হীনস্বার্থে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন নিয়ে যেন কোনো ধরনের খেলতামাশা করার সাহস কেউ না দেখান; সেই ব্যাপারটি সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে।



আরো সংবাদ