১৪ এপ্রিল ২০২১
`
জয়শঙ্করের ঢাকা সফর

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আনন্দসূত্র

-

সীমান্তে অপরাধ না ঘটলে হত্যাও হবে না। বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। ঢাকায় ঝটিকা সফরে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুুল মোমেনের সাথে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘অপরাধ না ঘটলে হত্যার ঘটনাও ঘটবে না। সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে অপরাধের কারণেই।’ এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান কিছুটা পিছিয়ে গেল বলেই সাধারণভাবে মনে হচ্ছে। কারণ এর আগে বহুবার সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে ভারত। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের প্রাণঘাতী অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ করাসহ বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে কথাও হয়েছিল। খোদ সে দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পুরো দায়টি বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিলেন জয়শঙ্কর।
আমরা আগে দেখেছি, সীমান্তে অপরাধের সাথে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদেরও সংশ্লিষ্টতা আছে। তারাই গরু পাচারসহ সীমান্তে চোরাচালান উৎসাহিত করে। এমন অভিযোগে বিএসএফের কর্মকর্তাসহ বেশ ক’জন সদস্য ভারতের আইনেই অপরাধী সাব্যস্ত ও দণ্ডিত হয়েছেন। তাহলে পুরো বিষয়টি এখন বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেয়ার এই প্রবণতা কেন? এর কারণ বাংলাদেশ ভারতের সাথে সম্পর্ককে সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। ক্ষেত্রবিশেষে জাতীয় স্বার্থের দিকে না তাকিয়েও ভারতকে সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ যাতে পারস্পরিক সম্পর্কে কোনো তিক্ততার সৃষ্টি না হয়। আর এর পুরো সুযোগ নিয়েছে ভারত।
জয়শঙ্কর এসেছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিববর্ষ ও দুই দেশের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এ নিয়েই কথা বলেছেন তিনি। তবে ভবিষ্যতে দু’দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আরো বড় পরিসরে কানেকটিভিটির ওপর জোর দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আমাদের সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং প্রগতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উভয়পক্ষই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। তিনি বলেন, আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা এখন এত বেশি যে, আমরা দেখিয়েছি- এমন কোনো সমস্যা নেই যা আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি না। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ভারত সবসময় নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
এসব বক্তব্য বাস্তবতার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেই প্রশ্ন তোলার মতো অবস্থায় বাংলাদেশ নেই। কাজেই ভারতের কর্মকর্তারা তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বলতেই পারেন। পদ্মায় চুক্তি অনুযায়ী পানি না এলে, তিস্তার পানিবণ্টনের প্রশ্ন যুগের পর যুগ ঝুলিয়ে রাখতে পারলে, নামমাত্র শুল্কে ট্রানজিট, করিডোর পেয়ে গেলে এবং সর্বোপরি অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে না এমন নিশ্চয়তা পেলে ভারত ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ বোধ করবে এ আর অস্বাভাবিক কী!
আমরা জানি, এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আগরতলায় পরীক্ষামূলকভাবে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা, ত্রিপুরাকে সংযুক্ত করার জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথে দুটি নতুন প্রটোকল রুট যুক্ত করা, ১০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ হস্তান্তর, কনটেইনার ও পার্সেল ট্রেন চলাচল শুরু এবং জ্বালানি খাতে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। সুতরাং কানেকটিভিটি তো যথার্থই প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং বাস্তব অগ্রগতি যথেষ্টই। কিন্তু এসব উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পণ্য ভারতের পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্সে ঢোকার যে স্বপ্ন এ দেশের ব্যবসায়ী, উৎপাদকরা বহু বছর থেকে দেখে আসছিলেন সেটি নস্যাৎ হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ভারত বাংলাদেশের পাশে কখনো দাঁড়িয়েছে তেমন দৃষ্টান্ত বিরল। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘে ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি। সমর্থন করেছে মিয়ানমারকে। সব মিলিয়ে দু’দেশের আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের পুরো চিত্রটিই ভারসাম্যহীন এবং শতভাগই ভারতের অনুকূলে। তার পরও বাংলাদেশ ভারতের সাথে সম্পর্ককে সকৃতজ্ঞচিত্তে মূল্য দেয় এটি ভারতের জন্য আনন্দের। জয়শঙ্কর সেই আনন্দ প্রকাশে কুণ্ঠাবোধ করেননি। ভারত স্বাচ্ছন্দ্যে আছে, আনন্দে আছে এটাও তো বাংলাদেশের জন্য কম আনন্দের নয়!



আরো সংবাদ