২৭ জানুয়ারি ২০২১
`
পেঁয়াজের ফলন বাড়ানোর পরিকল্পনা

সব কৃষিপণ্যে স্বয়ম্ভর হওয়া চাই

-

পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে চায়। এ লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর চার বছরব্যাপী একটি পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে। অতীব প্রয়োজনীয় এই ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ায় তারা সাধুবাদ পেতে পারে। দেশে প্রায় সবসময় পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি গড়ে ৫০ টাকার নিচেই থাকে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এর দামের ঊর্ধ্বগতি বাজার টালমাটাল করে দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে নিয়মিত আমদানি করে আমরা পেঁয়াজের ঘাটতি মোকাবেলা করি। গত দুই বছর বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়েই হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারত। এর ফলে পেঁয়াজের দাম অস্থিতিশীল হওয়ায় ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্য অনেক কিছুর মতো সামান্য পেঁয়াজের স্বাভাবিক সরবরাহ পেতেও দেশটি থেকে আমরা বন্ধুসুলভ আচরণ পাইনি।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ গড়ে ১০ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করে। অন্য দিকে দেশে গড়ে উৎপাদন হয় ২৫ লাখ টন। এর মধ্যে থেকে ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে ১৯ লাখ টন দেশীয় পেঁয়াজ ভোক্তারা পান। আমদানি করা পেঁয়াজ যোগ করে দেখা যাচ্ছেÑ প্রায় ৩০ লাখ টনের মতো পেঁয়াজ গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে দরকার। একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নেয়া পরিকল্পনার কথা জানা যায়। কৃষি বিভাগ পেঁয়াজ চাষের এলাকা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত পদ্ধতির চাষাবাদ ও উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার করার চিন্তা করছে। এর সাথে উন্নত প্রযুক্তির সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এ জন্য কৃষকদের দেয়া হবে প্রশিক্ষণ।
২৫ শতাংশ অপচয় বা নষ্টের হিসাব ধরে সবমিলিয়ে ৩৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরে পেঁয়াজের ফলন দুই লাখ টন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। পরের বছর ২০২১-২২ অর্থবছরে তিন লাখ ২২ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তিন লাখ ৫০ হাজার টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক লাখ টন উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। কৃষি বিভাগের কৌশল ঠিকভাবে এগোলে চার বছর পর ঘাটতি ১০ লাখ টন পেঁয়াজ বাংলাদেশেই উৎপাদিত হবে। একটি দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার লক্ষণ হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য যদি নিজেরাই উৎপাদন করতে পারে। কোনো একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অপরের কাছে রেখে নিজেরা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এর আগে আমরা গরুর গোশতের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। ভারত গরু রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কয়েক বছরের মধ্যে দেশ গরু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর একটি দেশ। যেসব খাদ্যপণ্য দেশে উৎপাদন হয় সেগুলোর প্রত্যেকটির উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া উচিত। এ জন্য দেশের কৃষি বিভাগের আলাদা পরিকল্পনা থাকার দরকার।
বাংলাদেশের বাজারে যখন নতুন পেঁয়াজ ওঠে তখন এর দাম থাকে কেজিপ্রতি ২০ টাকা। এরপর সারা বছরে এর দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে থাকে। যদিও ফটকাবাজারিরা কখনো কখনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এর দাম বাড়িয়ে দেয়। যেমন গত বছর আমরা দেখলাম হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে গেল। এক কেজি পেঁয়াজ এই দামে কিনলে একজন নি¤œবিত্ত মানুষ বাকি নিত্যপণ্য কিভাবে কিনবে? অনেকে তখন বাধ্য হয়ে পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দেন। এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত আমরাই দায়ী। আমরা ভারতকে বন্ধু ভাবলেও দেশটি অনেক সময় এর মর্যাদা দিতে পারে না। আগের বছর তারা হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর এবার সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে আহ্বান রাখা হয়েছিল তারা যেন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের আগে বাংলাদেশকে জানায়। দেখা গেল, ভারত এবারো পেঁয়াজ রফতানি হঠাৎ বন্ধ করে দিলো। বাংলাদেশকে জানানোর সাধারণ সৌজন্যটুকু রক্ষারও বিন্দুমাত্র দরকার মনে করল না। আমরা অনেক নিত্যপণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করি। এমন নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে প্রত্যেকটি পণ্য নিজেরা শতভাগ উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করাই শ্রেয়। আশা করব, পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে কৃষিবিভাগের পরিকল্পনা সফল হবে।



আরো সংবাদ