২৯ নভেম্বর ২০২০
সামাজিক অবক্ষয় রোধে

সুশাসনের বিকল্প নেই

-

দেশে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অসন্তোষ ও অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। একের পর এক খুন, হত্যা, ধর্ষণ, মারামারী, হানাহানি, সংঘর্ষসহ নানা অনাচার-অত্যাচার হরহামেশাই ঘটছে আমাদের চার পাশে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের মতো পাশবিক ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়। স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নববধূকে কিংবা কন্যাশিশুকেও দলবেঁধে ধর্ষণ করছে নরপশুরা। যে ঘরকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ভাবা হয়, সেখানেও নির্মম খুনের শিকার হচ্ছেন অনেকে। আদরের ছেলের হাতে খুন হচ্ছেন মমতাময়ী মা। বিশেষ করে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার-নির্যাতন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুবসমাজের বড় একটি অংশ মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্নভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। হাত বাড়ালেই তাদের কাছে মিলছে মাদক। মাদকের সহজলভ্যতাই মূলত এর জন্য দায়ী। বখাটের খাতায় নাম লেখাচ্ছে উঠতি বয়সী কিশোররা। প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং; যাদের ভয়ে নারী ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন প্রতি মুহূর্তে। অভিভাবকরা সন্তান নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হয়ে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অনেকেই ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছেন। অনেক সময় জীবনও দিতে হচ্ছে কাউকে কাউকে। চেনাজানা চার পাশে এমন নির্মম ও পৈশাচিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে যে, কোনোটার খবর গণমাধ্যমে আসছে; আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বেশির ভাগ ঘটনার খবর থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ সময়ে অজানা। যার হিসাব হয়তো থানা পুলিশের তালিকায়ও থাকছে না।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোথাও যেন কেউ নিরাপদ নয়। ফলে এখন পরিবার কিংবা সমাজে কেউই আর নিরাপদ বোধ করছেন না। পুরো দেশটাই যেন হয়ে উঠেছে বিপদসঙ্কুল ও অনিরাপদ। চিরচেনা সমাজের সামগ্রিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটেছে; এর চিহ্ন স্পষ্ট। দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের বিষয় হলোÑ এ ভয়াবহ প্রবণতা না কমে বরং বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সাথে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার সাথে এমন পরিস্থিতি উদ্ভবের যোগ রয়েছে; এমন কথা বলা অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং তা বজায় রাখার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে উদাসীন বলেই মনে হয়। অথবা গোষ্ঠীস্বার্থে মৌনতা অবলম্বন করাকেই শ্রেয় মনে করছেন তারা। যে ভাবনা নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য করছে তাদের। এমনটি হলে গোটা জাতির জন্য তা দ্রুত আরো বড় ধরনের অমঙ্গল বয়ে আনবে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুধাবনে চার পাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাই বলে দেয় সামগ্রিক সামাজিক অবস্থা ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। পুরনো মূল্যবোধগুলো বোধহয় আর কাজ করছে না। বলা যায়, সামাজিক ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আমরা। পাশাপাশি দেশে আইনের শাসন দুর্বল হওয়ায় অনেকের মধ্যে বেপরোয়া ভাব ভয়াবহভাবে বেড়েছে। অপরাধীরা আইন-আদালত বা শাস্তির ভয়ে সংযত থাকছে না। তারা ‘ধরাকে সরাজ্ঞান’ করছে। একই সাথে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার উত্তাপে অপরাধ করে অপরাধীরা ছাড় পাওয়ায় দেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে দেশে সামাজিক বিপর্যয় সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় হলোÑ দেশে কঠোরভাবে আইনের শাসন বলবৎ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। যেসব কর্মকাণ্ড নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে কার্যকর সেগুলোর বিকাশে এবং বাস্তবায়নে তৎপর হওয়া। আর নগ্নতা, অশ্লীলতা, অনৈতিকতা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া। তবেই সামাজিক অবক্ষয়ের মতো রাহুর গ্রাস থেকে জাতির মুক্তি মিলতে পারে। মনে রাখা আবশ্যক, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’। সে ক্ষেত্রে সামাজিক অবক্ষয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যদি আমরা উদাসীন হই; তা হলে সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে যাবে; কেউ তা ঠেকাতে পারবে না।


আরো সংবাদ