২৯ নভেম্বর ২০২০
নির্বাচন তামাশায় পরিণত হয়েছে

ধোঁকাবাজি কল্যাণকর নয়

-

বাংলাদেশে নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি তামাশায় পরিণত হয়েছে। এবার জাতীয় সংসদের ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনের উপনির্বাচনে জাতি এমন তামাশা প্রত্যক্ষ করেছে। আগের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে একেবারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাই নাগরিকরা আর ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হচ্ছে না। এর পরও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন নির্বাচনকে উপলক্ষ করে কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি এবং অস্ত্রের মুখে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে। দু’টি উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেছেন। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হওয়ার সার্টিফিকেট আগের মতোই দিয়ে দিয়েছে। গত মঙ্গলবার বেশ কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়েছে। সেখানেও ক্ষমতাসীন দলের একই ধরনের সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে পছন্দের সব প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এই তামাশা আর কত দিন ধরে চলতে পারে? বাংলাদেশ কি স্থায়ীভাবে নির্বাচনী নীতিনৈতিকতাকে ত্যাগ করেছে? ‘নির্বাচন’ অর্থ কি মানুষ স্থায়ীভাবে এমন বিশ্বাস করবে যে, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিজয়?
নওগাঁ-৬ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরুর ৬ ঘণ্টা পর বিএনপির প্রার্থী উপনির্বাচন বর্জনের কথা ঘোষণা করেন। ঢাকা-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ১ ঘণ্টা পর অনিয়মের অভিযোগ এনে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান। সংবাদমাধ্যম দেশের দুই অঞ্চলে অনুষ্ঠিত একই দিনের ভোটের যে চিত্র তুলে ধরেছে তা একই। উভয় এলাকায় ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে একেবারে নগণ্য সংখ্যায় উপস্থিত ছিলেন। ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকা ছিল ক্ষমতাসীন দলের দখলে। সেখানে বিরোধী দল বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ভিড়তেও পারেননি। নওগাঁর প্রত্যেকটি কেন্দ্রে বিএনপি এজেন্ট দিয়েছিল বলে দাবি করেছে। ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের মারধর বা বল প্রয়োগ করে বের করে দেয়া হয়েছে। বিরোধীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের নারী এজেন্টদের সম্ভ্রমহানির চেষ্টাও করা হয়েছে অনেক জায়গায়। দুটো উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণের যে ছবি সংবাদমাধ্যমে এসেছে তাতে দেখা যায় ক্ষমাতাসীন দলের পক্ষে একচেটিয়া ভোট দেয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় ঢাকা-৫ আসনে ভোট পড়ার হার দশ শতাংশের কিছু বেশি। অন্য দিকে নওগাঁ-৬ আসনে ভোট পড়েছে ৩৬ শতাংশের বেশি। এই ভোটের সবই সরকারি দলের পক্ষে কাস্ট দেখানো হয়েছে। সুতরাং বিপুল ব্যবধানে সরকারি দলের প্রার্থীদের জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধরনের তামাশার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা দাবি করেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তিনি বলেছেন, দুটো উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণে কোথাও কোনো অসুবিধা হয়নি। তারা কোনো অভিযোগ পাননি। এ থেকে বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশনের কাজ হলোÑ প্রত্যেকটি নির্বাচন ঠিকঠাক হয়েছে এমন একটা ঘোষণা দেয়া। প্রকৃতপক্ষে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তার কিছুই তারা নিশ্চিত করতে পারছেন না। এ ধরনের দুঃখজনক পরিস্থিতি এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। সীমাহীন দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির কারণে আজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান সৌন্দর্য নির্বাচনী ব্যবস্থার এমন করুণ পরিণতি নেমে এসেছে।
জনসাধারণের সমর্থন যাচাই করার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি স্থির করাই নির্বাচনের উদ্দেশ্য। কাজটি গণতান্ত্রিক দেশে একটি কমিশনের যোগ্য নেতৃত্বে হয়ে থাকে। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণরূপে প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সরকার ও বিরোধী দল কারো প্রতি কমিশন ঝুঁকে পড়তে পারে না। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষ কার্যক্রম চালাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই নির্বাচন কমিশনের একমাত্র কাজ হচ্ছে, সরকার নিজ দলের পক্ষ থেকে কাউকে প্রার্থী ঘোষণা করলে তাকে বিজয়ী হিসেবে সার্টিফিকেটের আয়োজন করে দেয়া। অর্থাৎ তারা একটি নির্বাচনের আয়োজন করে। সে জন্য যাবতীয় প্রস্তুতিও নেয়া হয়। বিরোধীরা সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ততটুকুই সুযোগ পান যাতে নির্বাচন কমিশন বলতে পারে, আমরা একটি নির্বাচন আয়োজন করেছি। মূলত নির্বাচন কমিশন সরকারের পছন্দের প্রার্থীদের আইনি ভিত্তি দেয়ার জন্য একটি রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে কাজ করছে। সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন কাউন্সিলের একজন মেম্বার নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন একই নাটক বারবার মঞ্চস্থ করে যাচ্ছে। এটাকে কোনোভাবে গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা বলা যায় না। এটা দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। এ ব্যবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন হতে হবে।

 


আরো সংবাদ