৩০ নভেম্বর ২০২০
আলুর দর বাড়াল সরকার

বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই কারণ

-

আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণেও ব্যর্থ হলো সরকার। হঠাৎ করেই আলুর দাম ১১১ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার পর সরকারের তরফে বলা হয়েছিলÑ চাহিদা, উৎপাদন ও মজুদের হিসাবে আলুর দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এমন বক্তব্য দিয়ে মাত্র ক’দিন আগেই আলুর খুচরা বাজারদর ৩০ টাকায় নির্ধারণ করে দেয় সরকার। দেশের সর্বত্র এই দর নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে চিঠি দেয়া হয়; কিন্তু সেই দর কার্যকর করতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন। বাণিজ্যমন্ত্রী খোলাবাজারে ২৫ টাকা দরে আলু বিক্রির ঘোষণা দিতে গিয়ে স্বীকার করেন, সরকার নির্ধারিত দাম ‘আসলে কার্যকর করা যায়নি’। শুধু তা-ই নয়, খোলাবাজারে ট্রাকে করে আলু বিক্রির ঘোষণাও বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। ফলে নতি স্বীকার করেছে ব্যবসায়ীদের কাছে। গত মঙ্গলবার নতুন ঘোষণা দিয়ে আলুর দর প্রতি কেজি খুচরা পর্যায়ে ৩৫ টাকায় নির্ধারণ করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, নতুন নির্ধারিত দাম কার্যকর হচ্ছে কি না সেটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং র্যাব মনিটর করবে।
গতকাল বুধবার এই নতুন দর কার্যকর হওয়ার কথা। এই দরও কতটা কার্যকর হবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ সারা দেশের প্রশাসন ব্যর্থ হওয়ার পর একটি সরকারি অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হলো। এরই মধ্যে দেখা গেছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো শুরুর পর ব্যবসায়ীরা আলু বিক্রিই বন্ধ করে দিয়েছেন। গত সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর পাইকারি বাজারে কোনো আলু বিক্রি হয়নি। এর অর্থ হলো, ব্যবসায়ীরা সরকারের চেয়েও শক্তিশালী। তারা চাইলেই সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন। সুতরাং আলুসহ যেকোনো পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নামানোর আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বলা হচ্ছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্যই দাম বাড়ানো হলো। কৃষকরা যাতে আগামী মৌসুমে আলু উৎপাদনে উৎসাহিত হয় সে জন্য দর বাড়ানো হয়েছেÑ এমন কথাও বলা হচ্ছে। এসব বক্তব্যের পেছনে কতটা যুক্তি আর কতটা দায় এড়ানোর প্রয়াস আছে তা না বোঝার কারণ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, গত কয়েক বছরে ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়েছেন। মাত্র ক’দিন আগে পেঁয়াজ নিয়ে যে তোলপাড় হয়ে গেল সেই ঝাঁজ এখনো কমেনি ভোক্তাদের চোখে। চালের বাজার এখনো চড়া। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সফল হয়নি। সব ধরনের সবজির দাম মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে বহু দিন ধরে। এ নিয়ে সরকারের কোনো রকম মাথাব্যথাও নেই। মানুষ পিঠে ছালা বেঁধে মার সহ্য করার মতো সবকিছু মেনে নিয়েছে। আলুর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে বলে মনে হয়।
সরকারি হিসাবে, চলতি মৌসুমে দেশে এক কোটি ৯ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। আর আমাদের বার্ষিক চাহিদা হলো ৭৭ লাখ টন। কৃষি বিপণন অধিদফতর সূত্র জানায়, গত মৌসুমে উৎপাদিত মোট এক কোটি ৯ লাখ টন আলুর মধ্যে প্রায় ৩২ লাখ টন এখন উদ্বৃত্ত রয়েছে। রফতানির ক্ষেত্রে সরকার ২০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেয়ায় উৎসাহিত হয়ে ব্যবসায়ীরা বেশ কিছু আলু বিদেশে রফতানি করেছেন। বন্যা ও মহামারীকালে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণে আলু বিতরণ করা হয়েছে দুর্গতদের মধ্যে। কিন্তু তাতে করে বাজারে কোনো রকম ঘাটতি দেখা দিয়েছে এমন নয়। তার পরও যে আলুর দাম বাড়ানো হয়েছে এর অর্থ হলোÑ ব্যবসায়ীদের মুনাফাবাজির প্রবণতা। এই প্রবণতা এমনভাবে তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে যে, তারা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা ভাবার অবকাশ পান না। নৈতিক, অনৈতিক যেকোনো কৌশলে মুনাফা লোটাই তাদের লক্ষ্য। আর রাজনীতিকরা দেশে এমন কোনো পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেননি, যে পরিবেশে মানুষ মানুষের কথা ভাবে। দুর্নীতির যে গভীর পাকচক্রে দেশ ও জাতি তলিয়ে যাচ্ছে সেই পরিবেশই সব সেক্টরের মানুষকে যেকোনো উপায়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে উৎসাহিত করে।
আপাতত এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। কারণ নীতিনৈতিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার পরিচালনা করতে প্রেরণা দেবে বা সে রকম পরিবেশ সৃষ্টি করবে এমন কোনো রাজনীতি এ দেশে আসবে এমন আশা সুদূরপরাহত।


আরো সংবাদ