৩০ নভেম্বর ২০২০
সাগরে বিলীয়মান কুয়াকাটা সৈকত

পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে হবে

-

পটুয়াখালী জেলার সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। যাতায়াতের নানা অসুবিধা সত্ত্বেও এর কারণ হলো, বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারে কেবল সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায় এবং কক্সবাজারের পূর্ব দিকে পার্বত্য এলাকা বিধায় সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখা সম্ভব হয় না। অপর দিকে, দেশের মাঝ বরাবর অবস্থিত, সৈকতবর্তী কুয়াকাটা থেকে একই সাথে পূর্ব দিকে সূর্যোদয় এবং পশ্চিম দিকে সূর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন করা যায়। অথচ আজ পর্যন্ত কুয়াকাটার যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘœ ও সুগম হয়নি। তদুপরি ইদানীং বড় হয়ে উঠেছে এই নয়নাভিরাম সৈকতটির ক্রমাগত ভাঙনে গাছপালা সাগরের বুকে বিলীন হয়ে যাওয়া। এর ফলে কুয়াকাটা মহামারীজনিত দীর্ঘ লকডাউনের পর সম্প্রতি উন্মুক্ত হলেও অব্যাহত ভাঙনে এর সৌন্দর্য লোপ পাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কুয়াকাটা সুনাম হারিয়ে ফেলবে।
নয়া দিগন্তর কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতার পাঠানো প্রতিবেদনে এ কথা জানা গেছে। সাথে মুদ্রিত ছবিতে দেখা যায়, সাগরের ঢেউয়ের ধাক্কায় সৈকতের ঝাউবাগানের লণ্ডভণ্ড অবস্থা। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, গোড়ার মাটি সরে গিয়ে সৈকতের গাছ জোয়ারের সময়ে লুটিয়ে পড়ছে। ভূপাতিত গাছগুলো স্থানীয় লোকজন কেটে নিয়ে যাচ্ছে। গত প্রায় এক যুগে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান এবং স্থানীয় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বেশির ভাগ বিলীন হয়ে গেছে। বন বিভাগ জানায়, সৈকতকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ২০০৭-০৮ অর্থবছরে কুয়াকাটার ১০ হাজার হেক্টর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল ঝাউবাগান। তবে ২০০৭ সালের সিডর ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে ভাঙন গ্রাস করে নিচ্ছে সংরক্ষিত বন। বছরে এক শ’ একর করে বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ যাবৎ প্রায় এক হাজার ২৩৬ একর বনভূমি সমুদ্রের বুকে বিলীন হয়ে গেছে। সৈকতের ভাঙন প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় বাগান সৃজন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বন বিভাগের আগ্রহ ও উৎসাহ লোপ পাচ্ছে।
স্মর্তব্য, সর্বপ্রথম ১৯৬০ সালে কুয়াকাটায় ১৯৭ একর সরকারি জমি লিজ নিয়ে বাগান করা হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে। গাছের বেশির ভাগ ছিল নারিকেল। এক দশক আগে পর্যন্ত সেখানে ছিল অজগরসহ বিভিন্ন ধরনের সাপ এবং বানর, বাদুড়, শিয়াল, শকুনের মতো বন্যপ্রাণী। স্থানীয় একজন পর্যটন ব্যবসায়ীর মতে, ‘আগে কুয়াকাটা আরো আকর্ষণীয় ছিল পর্যটকদের কাছে। ঢেউয়ের আঘাত ও ভাঙনে তালবাগান বিলীন হয়ে গেছে। নারিকেল বাগান আজ বিলীয়মান। ঝাউবাগানও হারিয়ে যেতে পারে ভাঙনের কবলে পড়ে।’ কুয়াকাটার মেয়র জানান, ‘ভাঙনের দরুন কুয়াকাটা সৈকতের পরিসর হ্রাস পাচ্ছে। আকর্ষণীয় স্পটগুলো হারাতে হচ্ছে। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে টেকসই।’ একজন বন কর্মকর্তার বক্তব্য, ‘অবিরাম ভাঙনের শঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান অবস্থায় অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’ তিনি জানান, গঙ্গামতি এলাকায় ৪০ হেক্টর ঝাউবাগানসহ দু’স্থানে নতুন বাগান ছাড়াও ২০ হাজার তালগাছ লাগানো হয়েছে জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধের জন্য। পাউবোর একজন নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, কুয়াকাটা সৈকতের স্থায়ী সুরক্ষা ও উন্নয়নের স্বার্থে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে।
বন বিভাগ স্থানীয় বনাঞ্চলে বহু বৃক্ষরোপণ, সৈকতে আকাশমণি গাছের বাগান, ফলের বাগান, নিচু জমি উঁচু করে বাগান সৃজন প্রভৃতির ফিরিস্তি দিচ্ছে। অপর দিকে, স্যাঁতসেঁতে সৈকতে বিশাল এলাকায় পড়ে আছে অসংখ্য গাছের মূল বা শেকড়। ১৯৯৮ সালে ‘পর্যটন কেন্দ্র’ হিসেবে ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হোটেল-মোটেল নির্মাণসহ কুয়াকাটাকে আকর্ষণীয় নগরী রূপে গড়ে তুলতে চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু অব্যাহত ভাঙনের তাণ্ডব তার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ নদ-নদী, সৈকত, পাহাড়, অরণ্য, বন্যপ্রাণী ইত্যাদি দ্বারা সুশোভিত অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। যথাযথ পরিকল্পিত ও আন্তরিক পদক্ষেপ তথা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কুয়াকাটাসহ সমগ্র বাংলাদেশকে দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের কাছে অতীব আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। তা হলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছাড়াও বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। আর বাংলাদেশের খ্যাতি বৃদ্ধির সুযোগ তো আছেই। এ জন্য পর্যটন শিল্পের অগ্রগতি সুনিশ্চিত করা চাই।

 


আরো সংবাদ