৩০ নভেম্বর ২০২০
ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে

অনেক পথ এখনো বাকি

-

মহামারী করোনাকালেও দেশে একের পর এক বড় দুর্নীতির ঘটনায় হতভম্ব ও ক্ষুব্ধ দেশবাসী। পাশাপাশি ধর্ষণসহ নৃশংস খুনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের দিন কাটছে তীব্র শঙ্কায়। দুঃসংবাদ যেন সবাইকে ঘিরে ধরেছে। এই রাহুর কবল থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা কারো জানা নেই। এমন দমবন্ধ অবস্থার মধ্যেও একটি সংবাদ আশাজাগানিয়া। ক্ষুধা মেটানোর সক্ষমতায় আরো এগিয়েছে বাংলাদেশ। ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’ বলছে, গত বছরের চেয়ে ১৩ ধাপ এগিয়েছে আমাদের দেশ। গত এক বছর বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৫ দশমিক ৮। এবার কমে হয়েছে ২০ দশমিক ৪। অপুষ্টির হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নতি অব্যাহত থাকায় ক্ষুধামুক্তির লড়াইয়ে এটি বেশ অগ্রগতি। তবু সূচকের স্কোর অনুযায়ী বাংলাদেশে ক্ষুধার মাত্রা ‘গুরুতর পর্যায়ে’ রয়েছে। ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে। তাই অগ্রগতি নিয়ে আত্মতৃপ্তির কিছু নেই।
কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফের যৌথ উদ্যোগে গত শুক্রবার চলতি বছরের যে ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে ১০৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ৭৫তম অবস্থানে। গত বছর এ সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৮তম। এর আগের তিন বছর অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৮৬, ৮৮ ও ৯০ নম্বরে। কেবল সূচকের অবস্থানে অগ্রগতি নয়, যে চার মাপকাঠিতে বিচার করে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) করা হয়, এর সবগুলোতেই গতবারের তুলনায় এগিয়েছে দেশ। এ ক্ষেত্রে আমরা বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে। তবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে এখনো পিছিয়ে।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের মাধ্যমে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের ক্ষুধার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। অপুষ্টির পরিমাণ, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতা অনুযায়ী কম ওজন, কম উচ্চতা এবং শিশুমৃত্যুর হার হিসাব করে ক্ষুধার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক বা জাতীয়Ñ যেকোনো পর্যায়ে ক্ষুধার মাত্রা নির্ণয় করতে এ সূচকগুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ‘শূন্য’ হলে বুঝতে হবে, ওই অঞ্চলে ক্ষুধা নেই। সূচকে ১০০ হলো সর্বনি¤œ পর্যায়, অর্থাৎ এটি ক্ষুধার সর্বোচ্চ মাত্রা বোঝাবে। জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি শিশুর প্রতিদিনের গ্রহণ করা খাদ্যের পুষ্টিমান গড়ে এক হাজার ৮০০ কিলোক্যালরির কম হলে বিষয়টিকে ‘ক্ষুধা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সরকারি যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২০ সালের এ সূচক তৈরি করা হয়েছে, তাতে চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব আসেনি। কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড বলছে, ‘কোভিড-১৯’ মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এ বছর দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া চলতি বছর স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক আর জলবায়ু বিপদ একসাথে আসায় বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টিও যথেষ্ট ঝুঁকিতে রয়েছে। কাজেই জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্তি চাইলে সবাই মিলে ন্যায্যতার ভিত্তিতে, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুরো খাদ্যব্যবস্থাকে পাল্টাতে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ অপুষ্টির শিকার; পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ৮ শতাংশের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম; ওই বয়সী শিশুদের ২৮ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের অনুপাতে কম এবং শিশুমৃত্যুর হার ৩ শতাংশ। গত বছর এ চার ক্ষেত্রে হার ছিল যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ, ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ২ শতাংশ। আর বিশ্বব্যাপী ৬৯ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। ১৪ কোটি ৪০ লাখ শিশুর উচ্চতা অনুযায়ী দেহের ওজন কম। চার কোটি ৭০ লাখ শিশু প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভুগছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ৫৩ লাখ শিশু বয়স পাঁচ বছর হওয়ার আগেই মারা গেছে।
বাংলাদেশ সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। এখন সে খাদ্য যাতে পুষ্টিকর হয়; সে জন্য কাজ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে দেশকে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে গর্ভবতী মায়েদের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষত দিতে হবে শিশু-কিশোরদের পুষ্টিকর ও সুষম খাবার। তবেই পুষ্টি পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছেন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা।

 


আরো সংবাদ