২৯ নভেম্বর ২০২০
২৯ মাসে নেতাকর্মীসহ ৪৯ খুন

অশান্ত পাহাড়ে শান্তি চাই

-

পার্বত্য তিন জেলা আবারো অশান্ত হয়ে উঠেছে। হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, জবরদখল, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, অন্যায় দাবিতে ঠিকাদারের কাজ বন্ধ করা প্রভৃতি নিত্যকার ঘটনা হয়ে উঠেছে। অপরাধমূলক এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে পুরো জনপদে বিরাজ করছে ভীতিপ্রদ অবস্থা। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বিগত ২৯ মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসমেত খুনের সংখ্যা ৪৯। আহত আরো অর্ধশত। প্রতিনিয়ত রক্তরঞ্জিত হচ্ছে শ্যামল প্রকৃতিশোভিত পাহাড় ও অরণ্য। সময় যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই দীর্ঘ হয়ে উঠছে লাশের সারি। হামলা ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে একে-৪৭ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক ও ভয়াবহ মারণাস্ত্র। এসবের প্রেক্ষাপটে জনগণের মধ্যে নিদারুণ ক্ষোভ, অস্বস্তি ও উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছে। পাহাড়ি জনপদ আবার বিগত আশি ও নব্বই দশকের রক্তাক্ত দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয়; অত্যন্ত রহস্যজনকও। দেশবাসী অবিলম্বে এহেন সন্ত্রাসপূর্ণ অস্বাভাবিক পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান কামনা করেছেন।
একটি পত্রিকার লিড নিউজে পাহাড়ে অবাঞ্ছিত হতাহতের পরিসংখ্যান দিয়ে আরো জানানো হয় যে, গত মঙ্গলবার রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর অকস্মাৎ সশস্ত্র আক্রমণে একজন সেনাসদস্য আহত হন। সাথে সাথে পাল্টা হামলায় দু’জন দুর্বৃত্ত নিহত হয়, যারা স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী। ঘটনাস্থল থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। মাঝে মধ্যেই এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে।
এ দিকে জানা যায়, পাহাড় অঞ্চলে একের পর এক নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে প্রধানত, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অব্যাহত সঙ্ঘাত এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে। সিকি শতাব্দী আগে ‘শান্তিচুক্তি’ করা হলেও শান্তি আসেনি পার্বত্য জেলাগুলোতে। অনেকের অভিযোগ, বিভিন্ন দলের দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের পেছনে আদর্শিক নয়, মূলত নেতাদের ব্যক্তিস্বার্থে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াসই দায়ী। এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি আঞ্চলিক দল ‘শান্তিচুক্তি’র পক্ষে-বিপক্ষে দু’টি দলে বিভক্ত।
স্মর্তব্য, দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, বাঙালি-পাহাড়ি এবং সামরিক-বেসামরিক লোকজন মিলিয়ে অনেক প্রাণহানি, বিপুল সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংসযজ্ঞ-অগ্নিতাণ্ডব, নৃশংসতা, অপহরণের পর হত্যা, গুম, অর্থ আদায় প্রভৃতির পর ‘জনসংহতি সমিতি’ নামধারী সশস্ত্র পাহাড়ি বিদ্রোহী দলের সাথে সরকার ‘শান্তিচুক্তি’ করেছিল। তখনো ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও তদানীন্তন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সরকারের পক্ষে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর প্রধান সন্তু লারমা সশস্ত্র ‘শান্তি বাহিনী’র পক্ষে চুক্তিতে সই করেন ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে দুই হাজার বিদ্রোহীসহ অস্ত্র সমর্পণ করে সন্তু দৃশ্যত সশস্ত্র সঙ্ঘাতের অবসান ঘটিয়েছিলেন। তিনি এখনো এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। অবশ্য শান্তির লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও পাহাড়িদের মধ্যে বিভেদ ও সশস্ত্র সঙ্ঘাত, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতা, সরকার ও জনসংহতির মধ্যে প্রত্যাশিত সুসম্পর্ক না থাকা, মাঝে মাঝে পাহাড়িদের হুমকি, পাল্টাপাল্টি আন্দোলন প্রভৃতির পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য জনপদে পরিস্থিতি বিপজ্জনকই রয়ে গেছে। জনসংহতি সমিতি সরকারের সমালোচনা করছে পার্বত্য ‘শান্তিচুক্তি’ বাস্তবায়নে ধীরগতির জন্য; অন্য দিকে প্রতিদ্বন্দ্বী পাহাড়ি সংগঠনগুলো কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত। এর পাশাপাশি, পার্বত্য জনপদে খুন অপহরণ-হামলা প্রভৃতির মাধ্যমে সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ অব্যাহত রয়েছে। জীবন বিষিয়ে উঠেছে পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে সাধারণ বাসিন্দাদের। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তরা সশস্ত্র হামলা করছে আইনশৃঙ্খলা বিধানে নিয়োজিত বাহিনীর ওপর।
এ অবস্থায় পাহাড়ি জনপদে সর্বপ্রকার অপরাধ ও অবিচারের অবসান ঘটিয়ে আশু শান্তি ফিরিয়ে এনে জনজীবনে কার্যকর স্বস্তি কায়েম করা সবার দায়িত্ব।


আরো সংবাদ