২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯
ঋণখেলাপি ও ব্যাংক খাত

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে

-

দেশে বছরে গড়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা করে ঋণখেলাপি হচ্ছে। এ ধারা চলছে বছরের পর বছর ধরে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ১০ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪১৭ শতাংশ। ঋণখেলাপি এবং ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা নিয়ে কথা খুব কম হয়নি। কী কারণে ঋণগ্রহীতারা খেলাপি হন, এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের দুর্বলতা কোথায়, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কী প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তর কথা হয়েছে। অনেক গবেষণা, অনেক বিশ্লেষণ, অনেক সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘ব্যাংকিং খাত তদারকি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, ঋণখেলাপিদের অনুকূলে বারবার আইন সংশোধন ও নীতি প্রণয়ন ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি হতে উৎসাহিত করছে। বলা হয়েছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় সমস্যা দূর করা যায়নি এবং এ সঙ্কট কাটাতে প্রতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে জনগণের করের টাকা থেকে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, কিছু মানুষের অনিয়ম-দুর্নীতির বোঝা ক্রমাগতভাবে জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে। টিআইবির গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি নীতি ও কৌশলগুলোতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে অধিকতর সুশাসনের কথা বলা হলেও এগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে সরকার তাদের অনুকূলে আইন পাল্টে দিয়েছে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এভাবে ব্যবসায়ীরাই এখন ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকাররা আর নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বাইরের প্রভাবশালীদের চাপের অনুকূলে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের কিভাবে কতটা চাপে ফেলে মন্দঋণ অনুমোদনে বাধ্য করা হয়; এর নমুনা মাত্র ক’দিন আগেই জাতি জানতে পেরেছে যখন একজন ব্যাংকারকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক। তারপরও অবস্থার উন্নতি হয়েছে এমন নয়। এখন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এমন যখন পরিস্থিতি তখন টিআইবি ব্যাংক খাতে সুশাসন এবং সুস্থ ব্যাংকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। সুপারিশগুলো বরাবরের মতোই খুব ভালো; কিন্তু যারা এগুলো বাস্তবায়ন করবেন সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের তেমন সদিচ্ছা বা আন্তরিকতা আছে কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। দু’বছর আগে সিপিডির এক সংলাপে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন, এই হৃৎপিণ্ড সচল রাখতে এটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার ঘোষণা দিতে হবে। গত দুই বছরে কোনো রাজনৈতিক দল কি এমন কোনো ঘোষণা দিয়েছে? গত ১৫ বছরে দেশে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তাতে সব দলের ইশতেহারে কী বলা হলো না হলো তা আর গুরুত্ব বহন করে না। বরং ক্ষমতাসীন দল কী বলছে বা করছে তা-ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের কি বাধ্য করা সম্ভব?
‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে আমরা কী করব’ শীর্ষক সিপিডির ওই সংলাপে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংক খাতে উন্নয়নের বদলে অবনতি হয়েছে। এটি নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বস্তুত, ক্ষমতাসীনরা যদি নিয়ম-নীতি অনুসরণের বদলে তা ভঙ্গ করতেই বেশি তৎপর থাকেন তাহলে যা হওয়ার ব্যাংক খাতে সেটিই হয়েছে এবং হচ্ছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। ক্ষমতাসীন ও সুশীলরা যত শিগগির এই সত্য উপলব্ধি করবেন জাতির জন্য ততই মঙ্গল।

 


আরো সংবাদ