২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
মানববন্ধনে পুলিশি হামলা

অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না!

-

শান্তিপূর্ণ উপায়ে মানুষের দাবি উত্থাপনের সুযোগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বীকৃত। মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারাই হলো এ ব্যবস্থার প্রাণ। অন্যায় অপমান অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আমরা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি বাংলাদেশে এ স্বাধীনতা সীমিত হয়ে গেছে। কখনো কখনো এ ধরনের বৈধ চর্চাকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করছে পুলিশ। টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহার সাথে থাকা স্টামফোর্ডের দুই ছাত্রকে আটকের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচির ওপর পুলিশ সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়েছে। বরগুনার বামনা থানার ওসি একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি পণ্ড করতে অংশগ্রহণকারীদের ওপর হামলা করেই ক্ষান্ত হননি, নিজের এক সহকর্মীর ওপরও চড়াও হয়েছেন। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সাথে পুলিশের এমন অন্যায় আচরণ সাংঘর্ষিক হলেও বহুদিন ধরে দেশে অহরহ এমনটি ঘটে চলেছে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা হত্যার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশের অপরাধের ব্যাপারে সন্দেহাতীত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ওই সেনা কর্মকর্তার সঙ্গী, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সহযোগিতাকারী স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দিয়েছে। সাহেদুল ইসলাম সিফাতের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং শিপ্রা দেবনাথের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা দেয়া হয়েছে। সিনহা হত্যা নিয়ে এ পর্যন্ত যেসব খবরাখবর জানা যাচ্ছে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই ছাত্রের কোনো ধরনের অপরাধকর্মে সংশ্লিষ্টতার আলামত নেই। উল্টো নিরপরাধ এ ছাত্রদের আটক করে মামলা দেয়ায় পুলিশের অসততার প্রমাণ মিলছে। আন্দোলনকারী ছাত্র ও শুভাকাক্সক্ষীদের পক্ষ থেকে আটক ছাত্রদের জীবননাশের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুলিশের কাস্টডিতে একজন ব্যক্তি নিরাপদ থাকার কথা। আইন অনুযায়ী একজন মানুষ সেখানে নিরাপদ। বাস্তবে আমাদের দেশে ঘটছে বিপরীত ঘটনা। কারা হেফাজতে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হচ্ছে। একজন মানুষকে যখন পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়, তার ঘনিষ্ঠজনরা তখন তার শঙ্কা অনুভব করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সিফাত ও শিপ্রার জন্য শুভাকাক্সক্ষীদের এমন আশঙ্কা করা স্বাভাবিক ব্যাপার।
সিফাতের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে পুলিশ যে হামলা চালিয়েছে সেটি বাংলাদেশে যেন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিক্ষুব্ধ মানুষেরা রাস্তায় এখন কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারে না পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে। তাই বাসাবাড়ি কিংবা সংরক্ষিত পাবলিক প্লেসে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন পালন করে। বামনায়ও এমন মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। ওই মানববন্ধনে অংশ নেন সিফাতের শিক্ষক, সহপাঠী, স্বজন ও এলাকাবাসী। থানা পুলিশের একটি দল তাদের হাত থেকে ব্যানার পোস্টার কেড়ে নেয়। বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তারপর তাদের ধাওয়া দিয়ে আটক করে কাউকে কাউকে মারধর করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অশ্লীল গালিগালাজ করেন। তার অধীনস্থ পুলিশ কর্মকর্তা যথেষ্ট আক্রমণাত্মক হচ্ছেন না দেখে তাকেও চড় বসিয়ে দেন। থাপ্পড় খেয়ে তিনিও কঠিনভাবে চড়াও হন মানববন্ধনকারীদের ওপর। এসব ছবি গণমাধ্যমে এসেছে। অথচ কারো চলাচলের ব্যাঘাত না করে তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে কর্মসূচি পালন করছিল। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড পুলিশ এখন সব জায়গায় করে। এসব বেআইনি কাজের জন্য তাদের কোনো শাস্তি পেতে হয় না।
দেশে আজ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগ একেবারে সীমিত বলতে হবে। পুলিশের অযাচিত অসমীচীন আচরণের মাধ্যমে এমন দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। ঘটনাগুলো প্রমাণ করে পুলিশ আইনগত দায়িত্ব পালন করে না। সিনহার সহযোগীরা সেখানে কাউকে খুন করার জন্য কিংবা মাদক ব্যবসায় করতে যায়নি। পুরো জাতি কতটা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকলে এভাবে নির্দোষ মানুষকে অপরাধী সাজানো যায়! এখন এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, রাষ্ট্র কি তাহলে অপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে? অপরাধ করেছে ওসি প্রদীপ ও এসআই লিয়াকত। সিফাত শিপ্রা নিরপরাধ। তাহলে কেন তারা মামলায় আটক থাকবে। কেনই বা এর প্রতিবাদ করা যাবে না? যদি আমরা সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক দেশ চাই তাহলে এসব প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণকে পেতে হবে।

 


আরো সংবাদ