২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
দিশেহারা হাজারও মানুষ

নদীভাঙন রোধে বাস্তব কর্মসূচি চাই

-

নদীভাঙন একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভাঙন রোধে এখনো কার্যকর উপায় বের করতে না পারায় প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। মোটা দাগে এটি আমাদের ব্যর্থতা। ফি বছর দেশের নদীতীরবর্তী অনেক এলাকায় দেখা দেয় ভাঙন। এবারো তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে এর আগে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে কয়েক দফা বন্যার পর এখন তীব্র ভাঙনে দিশাহীন হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ। বন্যার পানি নেমে গেলে ভাঙন আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ বছর নদীভাঙনে দুই হাজার ৩৬৫ হেক্টর এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নদী সব সময়ই আঁকাবাঁকা পথে চলে। এ জন্য ভাঙনের প্রকোপও বেশি। বর্ষাকালে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত সিজিইআইএসের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৩ থেকে ২০১৩ সাল, এই চার দশকে এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৮ হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এটা শুধু গঙ্গা, পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙনের হিসাব। এই তিন নদীর পারে নতুন জমি জেগেছে ৫২ হাজার ৯৯৮ হেক্টর। অর্থাৎ এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি হারিয়ে গেছে। জানা যায়, স্বাধীনতা-উত্তর দেশে ৪০ লাখ লোক নদীভাঙনের শিকার। বর্তমানে প্রতি বছর নদীভাঙনে গৃহহীন উদ্বাস্তু লোকের সংখ্যা বেড়ে দুই থেকে আড়াই লাখ হয়েছে। এতে বছরে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। নদীভাঙন এ দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে যেকোনো দুর্যোগের চেয়ে বেশি মাত্রায় ধ্বংস করছে।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ধলেশ্বরীর ভাঙনে কয়েক দিনে বিলীন হয়েছে একই ইউনিয়নের ১০টি বাড়ি। হুমকিতে রয়েছে আরো ৫০টি স্থাপনা। শেরপুরের ভোগাই নদীর ভাঙনে বিলীনের উপক্রম নালিতাবাড়ী পৌরসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে যমুনার শাখা নদীর ভাঙনে বিলীনের পথে গুলুঘাট নামের একটি গ্রাম। গত এক সপ্তাহে পদ্মার ভাঙনে শিমুলিয়ার দু’টি ফেরিঘাট এবং কুমারভোগে পদ্মা সেতুর ইয়ার্ডে দ্বিতীয়বারের মতো বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। এর আগে ২০১৫ সালের এ সময় পদ্মার ভাঙনে কুমারভোগের ডকইয়ার্ডে আকস্মিক তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এবার পরিস্থিতি এমন, দ্রুত স্থায়ীভাবে নদী শাসন না করলে আগামীতে পদ্মা সেতুর পাশের এলাকা এবং নদীভাঙনের হুমকিতে থাকা ১ নম্বর ও ২ নম্বর ফেরিঘাটসহ বিআইডব্লিউটিসি ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের স্থাপনা নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নদীভাঙন ঠেকাতে কংক্রিটের তৈরি ব্লক বাঁধের ধারে বা নদীর পানিতে ফেলার চল আছে দেশে। ব্লক তৈরি ও ফেলার ঠিকাদারি এ দেশে বেশ লাভজনক। এত বছর হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আমরা নদীভাঙনের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে পাইনি। শুধু নদীর পাড়ে মাটির বাঁধ তৈরি করে দুর্যোগ মোকাবেলার চেষ্টা করছি। অভিজ্ঞতায় বলে, বাঁধ বানের পানি ঠেকাতে যত কার্যকর, নদীভাঙন ঠেকাতে ততটা নয়। তবু প্রতি বছরই আমরা নদীভাঙন ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ করে শত শত কোটি টাকা পানিতে ঢালছি। জনগণের টাকার এমন অপচয় একটি গরিব দেশে আর কত দিন চলবে? বর্তমান প্রযুক্তি, অর্থাৎ মাটির বাঁধ দিয়ে নদীর ভাঙন খুব বেশি রোধ করা যাবে না। যদিও এক যুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে দেশে নদীভাঙন কমেছে, নদীর তীর রক্ষায় ও বাঁধ নির্মাণে প্রচুর অবকাঠামো গড়ে তোলায় এটি হয়েছে। তবে বিনিয়োগ তুলনায় সাফল্য আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল।
বাংলাদেশের মাটির ধরন অনুযায়ী নদীর তীরে ভাঙন একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক ঘটনা। গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ভাঙন রোধে অবকাঠামো তৈরি করলে ভাঙন আরো কমানো সম্ভব। এ ছাড়া ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে এমন নদীগুলোর ডুবোচর খনন করা ও বাঁধ মজবুত করে বানালে ভাঙনের মাত্রা আরো অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই নদীভাঙন রোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

 


আরো সংবাদ