১৪ জুলাই ২০২০
স্বাস্থ্য খাতে চরম বিপর্যয় ও অপ্রতুলতা

মহামারী থেকে শিক্ষা নিতে হবে

-

বাংলাদেশের অবহেলিত স্বাস্থ্য খাত নিয়ে মহামারী ‘কোভিড-১৯’ মোকাবেলা করতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ খাতের কোথায়ও কোনো শৃঙ্খলা নেই। এমনকি, করোনা মহামারীর সময়েও থেমে নেই স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি। এ দিকে, সরকারি হাসপাতালে নেই কাক্সিক্ষত সেবা। তদুপরি, হয় না কোনো গবেষণা। এসব কিছুর মূল হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ, আর সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবকে।
একটি জাতীয় দৈনিকে এবারের বাজেটে বহুলালোচিত স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আলোচনার শুরুতেই কথাগুলো জোর দিয়ে বলা হয়েছে। আগামী ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের কথা। ইতোমধ্যে জানা যায়, নতুন বাজেটে ২০১৯-২০ সাল, অর্থাৎ বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেয়া হবে স্বাস্থ্য খাতে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের দাবি, সে মোতাবেক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হতে পারে মোট ২৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ১৯ হাজার কোটি টাকা। কয়েক মাস ধরে চলমান করোনা মহামারীর অভূতপূর্ব তাণ্ডবের প্রেক্ষাপটে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুরোধ করেছে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এ দেশের স্বাস্থ্য খাতের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আজো যে কী ভয়াবহ অচলাবস্থা বিরাজ করছে, তারই শোচনীয় দশা ফুটে উঠেছে ‘কোভিড’ মোকাবেলার বর্তমান কার্যক্রমে। এমন অবস্থায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ঢাকঢোল পেটানো হলেও আসন্ন বাজেটে খাতটি জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী বরাদ্দ লাভ করছে না। আগের চেয়ে বরাদ্দ বাড়লেও তা দেশের চাহিদার অনুপাতে কতটুকু এবং মোট বাজেটের হিসাবে শতাংশের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি কি না, সেটিই দেখার বিষয়। তা না হলে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’র শিকার হবে জনগণ; আর কথামালার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস থাকবে অব্যাহত। বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে অন্তত ২ শতাংশ বরাদ্দ বাড়াতে বলেছেন। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, এই বৃদ্ধিও পর্যাপ্ত নয়। এ দিকে, সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি পত্রিকা জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটের খসড়ায় স্বাস্থ্য খাতে ২৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের উল্লেখ রয়েছে। তা মোট বাজেটের ৫ শতাংশ এবং বহুল প্রচারিত জিডিপির হিসাবে ০.৭৪ শতাংশ, অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশেরও অনেক কম। স্মর্তব্য, বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে, দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম।
বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দের তুলনায় এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কম গুরুত্ববহ নয়। এ জন্য দরকার যথাযথ অর্থবণ্টন, নিয়মিত তত্ত্বাবধান এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। তদুপরি স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো অপরিহার্য। কারণ ফলপ্রসূ উন্নয়ন সম্ভব নয় কার্যকর গবেষণা ছাড়া। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশী ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, দক্ষতার অভাবে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থও কাজে লাগানো যায় না।
জানা যায়, এবার বাজেটে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বাধিক বরাদ্দ পাচ্ছে এবং এটা চলতি বছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ বেশি। অপর দিকে, অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাত পঞ্চম স্থানে। দ্বিতীয় স্থানে থাকবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার ও প্রতিরক্ষার জন্য যথাক্রমে ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি এবং প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার কথা। পুরো বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো।
প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে সুচিন্তিত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাজেটে সর্বাধিক দৃষ্টি দিতে হবে স্বাস্থ্য খাত ও খাদ্যনিরাপত্তার দিকে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।’ এবার মহামারীর সম্মুখীন হয়ে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার যাবতীয় দুর্বলতা ও ঘাটতি উন্মোচিত হয়ে গেছে। এর ফলে দেশ ও সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ হওয়ার চেয়েও বড় বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ এ কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। অবিলম্বে এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ করাই সময়ের দাবি।

 


আরো সংবাদ