১৪ জুলাই ২০২০
মানবপাচারকারীরা থেকে যাচ্ছে নিরাপদ

প্রতিরোধে জোরদার সরকারি উদ্যোগ নেই

-

অর্থগৃধ্নু মানবপাচারকারীরা বাংলাদেশের দরিদ্রতার সুযোগ নিচ্ছে। তাদের জালে হাজার হাজার মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এ ধরনের পাচারকারীর কবলে পড়ে এবার লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী প্রাণ হারিয়েছেন। শেষ খবরে জানা যাচ্ছে, দেশটিতে আরো ১৩ জন বাংলাদেশীকে অপহরণকারীরা জিম্মি করে রেখেছে। তালিকায় মানবাপাচারকারী দেশের শীর্ষে থাকার পরও এ দেশের মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি আজো। তাদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। একটি জাতীয় দৈনিক জানাচ্ছে, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও সেগুলোর অগ্রগতি খুবই ধীর। চক্রের মূল হোতারা কখনো বিচারের আওতায় আসে না। পাচারকারী দলের কিছু সদস্য, যাদের সামনে দেখতে পাওয়া যায়, কেবল তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলে। শেষ পর্যন্ত এই অভিযুক্তরা শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে করে বাংলাদেশে মানবপাচার কমছে না।
লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজধানীর একটি থানায় ৩৮ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক দুই ভাইকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার আগে আরো একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ নিয়ে আরো আটটি মামলা হয়েছে। কেবল কিশোরগঞ্জ থেকেই মোট আটজনকে আটক করা হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের মানবপাচারকারী চক্রের হাত থেকে রক্ষা করা। এদের হাতে মানুষের প্রাণহানি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আমরা বড় একটি ঘটনা ঘটার পরই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি। বঙ্গোপসাগর হয়ে মানবপাচারের জন্য বিশাল একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। আমরা দেখেছি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাচারকেন্দ্রিক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। গণকবরে পাওয়া গেছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া মানুষের হাড়গোড়। আটকে পড়া মানুষ লাশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে ভেসেছে। যারা এসব মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন?
বাংলাদেশে মানবপাচারকারী চক্র কেন এতটা শক্তিশালী, তার জবাব এ দেশের শাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকরে লুকিয়ে রয়েছে। ২০১২ সালে ‘মানবপাচার ও দমন আইন’ কার্যকর হওয়ার পর গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৭১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৪৭টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। পত্রিকার সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এসব মামলায় সাক্ষীসাবুদ পাওয়া যাচ্ছে না, তা ছাড়া মামলার তদন্তে রয়েছে ঘাটতি। পত্রিকাটি লিখেছে, ২০০২ সালের একটি মামলায় সাক্ষী হাজির করার তারিখ পড়েছিল ৫৬ বার। ২০০৫ সালের অন্য একটি মামলায় পড়েছিল ৪৮ বার। আদালত মাত্র একটি মামলার জন্য সাক্ষী হাজির করার নির্দেশ দিয়ে যে সময় ও শক্তি ব্যয় করেছেন সেটি একটা বড় অপচয়। অথচ এ দেশে বিচারালয় মামলার ভারে ন্যুব্জ। এভাবে একটি মামলার সাক্ষী হাজির করার জন্য এত বেশি শক্তি ব্যয় করার পর যদি কোনো কাজে না আসে তাহলে এ দেশের সরকার থেকে মানুষ কিভাবে উপকৃত হবে?
মানবপাচারকারীদের শিকার যারা হচ্ছেন, তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। তাদের ক্ষমতা ও সামর্থ্য খুব কম। অথচ অন্যায়ের শিকার হয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছেন। এরপর শক্তিশালী অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে ধীরলয় বিচারব্যবস্থা থেকে প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ অবস্থায় এই অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার দায়িত্ব দাঁড়ায় সরকারের ওপর। লিবিয়ায় ২৬ তরুণ হত্যার শিকার হয়েছেন বলে প্রশাসন সক্রিয় হয়েছে। যা হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে এই চক্রকে সমূলে উৎপাটিত করার চেষ্টা নিতে হবে। স্থায়ীভাবে এই চক্রকে নির্মূল করার জন্য সর্বশক্তি নিযুক্ত করুন।


আরো সংবাদ