১১ জুলাই ২০২০
করোনাকালে বেকার অসংখ্য শ্রমিক

তাঁতশিল্পের দিকে নজর দিন

-

করোনাভাইরাসের বিপর্যয়কর প্রভাব পড়েছে জনজীবনের সবক্ষেত্রে। একই কারণে ব্যাপক ধস নেমেছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে। কোটি কোটি টাকার শাড়ি-লুঙ্গি-গামছা বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক হাজার তাঁতকল স্থবির। অন্যান্য শিল্পের মতো তাঁতশিল্পের শ্রমিকরাও করোনার কবল থেকে বাঁচার জন্য কর্মস্থল ছেড়ে নিজেদের বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন।
নয়া দিগন্তের দেলদুয়ার সংবাদদাতার পাঠানো খবরে জানা গেছে, বিরাজমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কেবল টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পেই এত বড় ধস নেমেছে যে, লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। টাঙ্গাইলের বিখ্যাত তাঁতের শাড়ি বিক্রির করটিয়া হাট দেশের অন্যতম বৃহৎ বাজার। এটি ছিল বন্ধ। দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলে শাড়ির সুপরিচিত শোরুমগুলো খোলা যায়নি। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলায় এক লাখ ২০৬ জন শ্রমিক এবং চার হাজার ১৫১ জন মালিক আছেন ক্ষুদ্র তাঁতশিল্পে।
অন্যান্য বছর শবে বরাতের পর থেকেই তাঁতশিল্পে শ্রমিকরা রাতদিন ব্যস্ত থাকতেন শাড়ি তৈরির কাজে। তখন সারা দেশের ব্যবসায়ীরা করটিয়া ও পাথরাইলসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁতের শাড়ি কেনার জন্য ভিড় জমাতেন। কিন্তু এবার ছিল ভিন্নচিত্র। করোনার মহামারীতে তাঁতপল্লী ফাঁকা, নেই বিকিকিনি। বছরজুড়ে ঋণের বোঝা বয়ে তাঁতের মালিকরা মাহে রমজানেই শাড়ি বেচে ব্যাংক এবং এনজিওর পাওনা শোধ করতেন। তবে এবার করোনা ক্রাইসিসের দরুন মালিকরা ঋণ পরিশোধ করা দূরে থাক, আরো বেশি ঋণগ্রস্ত বা দেনাদার হয়ে পড়েছেন।
এ দিকে তাদের ঘরে পড়ে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার অবিক্রীত শাড়ি। সদর উপজেলার জনৈক মালিক জানান, তার ৬৩টি তাঁতে দেশের বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকরা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। করোনার ধাক্কায় তার তাঁত সবই বন্ধ রাখতে হয়। কেবল এই ব্যবসায়ীরই আটকা পড়ে গেছে ৭০ লাখ টাকার শাড়ি। চলতি মৌসুমের চূড়ান্ত সময়ে তাঁত বন্ধ থাকার ক্ষতির জের থাকবে বছরের পর বছর। দেনা শুধবার কোনো উপায় নেই। তাই সরকারই প্রণোদনা দিয়ে বাঁচাতে পারে তাঁতশিল্পের মালিক ও শ্রমিকদের। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, তাঁতের শাড়ি বেচাকেনার তেমন ব্যবস্থা বর্তমান অবস্থায় নেই।
তাঁত বোর্ড স্বীকার করেছে, করোনার প্রভাবে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পে লক্ষাধিক শ্রমজীবী এখন বেকার। প্রশাসন প্রায় তিন হাজার দুস্থ তাঁতির মধ্যে ত্রাণসামগ্রী দিয়েছে বলে বোর্ডের দাবি। বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁত মালিকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা বিশেষভাবে না থাকলেও ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে তাদের ঋণ নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত এ ঋণ দেয়া হবে।
‘টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন’ কথাটা আর কত দিন সত্য থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে করোনাজনিত ধসের কারণে। আসলে একই অবস্থা দেশের তাঁতশিল্পসমৃদ্ধ সব এলাকায়। এমনিতেই প্রাচীন ঐতিহ্যতুল্য তাঁতশিল্প পুঁজির অভাব, চোরাচালানসহ বিভিন্ন সঙ্কটে ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। এর মধ্যে করোনা বিপর্যয় এসেছে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে।
এখন এক দিকে তাঁতশিল্পসহ সবক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সামনে যে সমস্যা সবচেয়ে বড়, তা হলোÑ জীবন না জীবিকা আগে? বাস্তবতা হলো, করোনা মহামারীকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা এবং জীবিকার তাগিদে ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে ‘লকডাউন’ ক্রমান্বয়ে শিথিল করতে হচ্ছে। অন্যথায় বেকারত্ব মোচনসমেত অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়।
যা হোক, সরকার তাঁতশিল্পের জন্য আলাদা প্রণোদনা এবং এ শিল্পের দুস্থ উদ্যোক্তা ও কর্মীদের পর্যাপ্ত ত্রাণ দেয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবিলম্বে গ্রহণ করে বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যকে অক্ষুণœ রাখবে বলে সবার প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের তাঁতিদের যথাযথ মূল্যায়ন আবশ্যক বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করে।


আরো সংবাদ