১৪ জুলাই ২০২০
করোনাভাইরাস বিস্তার

তদন্তের নিরপেক্ষতা জরুরি

-

চীন বারবার প্রত্যাখ্যান করলেও শেষ পর্যন্ত করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করা এবং এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে চীনের গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি। গত মঙ্গলবার সংস্থার বার্ষিক বৈঠকে সব ক’টি সদস্য দেশের সমর্থনে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ শতাধিক দেশের পক্ষ থেকে দেয়া তদন্তের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এর ফলে আসলে চীন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানই প্রতিষ্ঠিত হলো। ট্রাম্প বারবার বলে আসছিলেন, এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য চীন দায়ী। এ ছাড়া ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর চীন এ সম্পর্কিত তথ্য গোপন করেছে বলেও অভিযোগ তার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চীনের পুতুল বলে অভিহিত করে এর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। শেষ মুহূর্তে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির বৈঠকের আগের দিন এই বলে হুমকি দেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যদি এক মাসের মধ্যে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখাতে না পারে তাহলে তিনি সংস্থাটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া তহবিল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেবেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য মিসৌরি ইতোমধ্যে চীন সরকারের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে।
সুতরাং এখন সংস্থাটিকে চীনের প্রতি অনুরাগ (যদি কিছু আদৌ থেকে থাকে) সংবরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিতে হবে। হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী বিশ্ব পরিমণ্ডলে ভূমিকা পালন করতে হবে।
সমস্যা হলো, কোভিড-১৯-এ সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক থেকে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্মানের বলে যে প্রেসিডেন্ট মনে করেন এবং এ নিয়ে প্রায় গর্ব করার মতো মন্তব্য করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সত্যিই যদি সেই প্রেসিডেন্টের কথায় ওঠবস করে তাহলে বিশ্ব যে করোনার চেয়েও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই একটি ব্যক্তি বিশ্বের পুরো শৃঙ্খলা লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং সেটি তিনি এরই মধ্যে অনেকটা করে ফেলেছেন। বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার, শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থার উত্থান, লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির নতুন বিকাশের পথ খুলে দিয়েছেন তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম সঙ্কট জলবায়ু ইস্যুতে ইউনেস্কোকে ফান্ড দেয়া বন্ধ করে বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
যা হোক, করোনা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়ার দরকার আছে। যেকোনো জায়গায় একজন মাত্র মানুষের মৃত্যু হলেও তার তদন্ত করে নিশ্চিত হতে হয়, কেন লোকটি মারা গেল। সেখানে করোনায় মৃতের সংখ্যা বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন লাখে পৌঁছতে যাচ্ছে। আক্রান্ত হয়েছে ৫০ লাখের বেশি মানুষ। আর এ জন্য লকডাউনসহ যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার ফলে বিশ্বজুড়ে কত শত কোটি মানুষ যে দুর্ভোগ, হয়রানি, ক্ষুধায় কাতর হয়েছে তার কোনো হিসাব হয়তো কখনোই পাওয়া যাবে না।
সুতরাং মানবজাতির জন্য শতাব্দীর এই বৃহত্তম সঙ্কট নিয়ে স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও ব্যাপকভিত্তিক মূল্যায়ন করতেই হবে। তদন্ত হলে তা চীনের বিরুদ্ধে যাবে বলে চীন সবসময় ধারণা করেছে। সে জন্য তদন্তের প্রস্তাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও এতে করোনার বিরুদ্ধে তার চলমান লড়াই বাধাগ্রস্ত হবে বলে যুক্তি দেখিয়ে চীন প্রস্তাবটি নাকচ করে দিচ্ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ও বিশ্ববাসীর চাপে দেশটি তদন্তের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এটি তো সবার জানা যে, গত বছর ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরেই করোনাভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। উহানের একটি পশুর বাজারে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। উহানের ল্যাবরেটরি থেকে ভুল করে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। আবার এটি ল্যাবরেটরিতে মানুষের হাতে তৈরি বলেও কারো কারো বিশ্বাস। কিন্তু এতসব সন্দেহ, সংশয় এবং ধারণার ভিত্তিতে লাখো মানুষের মৃত্যুর ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়, যৌক্তিকও নয়। সুতরাং তদন্ত হতে হবে। তবে এই তদন্ত যদি ছলে বলে চীনকে কাঠগড়ায় তোলার হাতিয়ারে পরিণত হয় তাহলে তা বিশ্ববাসীর জন্য অশুভ বার্তা বয়ে আনতে পারে।

 


আরো সংবাদ