০২ জুন ২০২০
বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ

সরকারকে সক্রিয় হতে হবে

-

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে তৈরী পোশাক খাতে। গত শনিবার পর্যন্ত তিন হাজার ৯০০ কারখানায় এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। রফতানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এসব কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিকপক্ষ। অনেক কারখানায় শ্রমিকরাই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফলে যেসব কারখানা খোলা রাখা হয়, সেগুলোও বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। এখন মাত্র এক শ’র মতো কারখানা চালু আছে। এসব কারখানার অনেক চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট বা পিপিই এবং মাস্ক তৈরি করা হচ্ছে।
গত ২৩ মার্চ সরকারিভাবে সারা দেশে ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তখন তৈরী পোশাক শিল্প চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখনই আমরা বলেছিলাম, এ সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। কারণ সহজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তাতে বাড়বে। অর্থনীতির কী হবে, সেটা ভাবার আগে মানুষ বাঁচানো বেশি জরুরি। মানুষ বাঁচলে করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করা যাবে।
বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, গত শনিবার পর্যন্ত ৩৬৯ কোটি ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়ে গেছে। বিজিএমইএর তথ্যমতে, সংগঠনের সদস্য কারখানাগুলোতে রফতানি আদেশ বাতিল বা স্থগিতের পরিমাণ ২৬৯ কোটি ডলার। আর বিকেএমইএর সদস্য কারখানার ১০০ কোটি ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে সেটি অনেক আগে থেকেই আশঙ্কা করা যাচ্ছিল। আমরা একাধিকবার বলার চেষ্টা করেছি, তৈরী পোশাক খাত পুনরুদ্ধারে বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠনগুলোও এমনই দাবি জানিয়ে আসছিল। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো, বিশেষ করে ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়া তাদের গার্মেন্ট খাতের জন্য যে বিপুল অর্থের তহবিল গঠন করেছে সেটিও আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তহবিল গঠন করা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের কথা বলেছেন। দেশের চার হাজারেরও বেশি গার্মেন্ট কারখানার জন্য এই তহবিল ‘মরুভূমিতে এক ঘড়া পানি ঢালা’র মতোই অপ্রতুল।
মনে রাখতে হবে, আমাদের রফতানি পণ্যের তথা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে, তৈরী পোশাক। এটি রক্ষা করতে না পারলে জাতীয় জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপরও করোনা সংক্রমণের প্রভাব পড়বে। কত প্রবাসী যে চাকরি-বাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বেন, সেই হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এরই মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের শ্রমবাজারের অবস্থা কেমন হতে পারে, এ তথ্যটি সে ব্যাপারে একটি ধারণা দিচ্ছে।
সুতরাং হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে বা বালুতে মাথা গুঁজে থাকলেই ঝড় থেমে যাবে, এমনটি মনে করার কোনো অবকাশ নেই। অথচ আমাদের সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, এই মহাসঙ্কটের সময় তারা যেন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। এখন পর্যন্ত তারা ভাইরাস পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত উপকরণও সংগ্রহ করতে পারেননি। গোটা বিশ্ব করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যখন সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত, তখন আমাদের মন্ত্রীরা নিজ নিজ নিরাপত্তার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এ অবস্থা চলতে থাকলে এবং খোদা না করুন, সংক্রমণ যদি ব্যাপকতর হয়ে ওঠে, তা হলে তার দায় এই সরকারকেই নিতে হবে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। দেশবাসী এখনো সরকারের কার্যকর তৎপরতা দেখার অপেক্ষায়।


আরো সংবাদ