৩০ মে ২০২০
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু

প্রয়োজন বিচার বিভাগীয় তদন্ত

-

বরগুনার আমতলীতে থানা হেফাজতে হত্যা মামলার এক সন্দেহভাজন আসামির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের দাবি করা তিন লাখ টাকা না দেয়ায় নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু স্বজনরা নন, ঘটনা সম্পর্কে গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেছেন, বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ওই ব্যক্তিকে নির্যাতনে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যার ঘটনা পুলিশের সাজানো।
খবরে প্রকাশ, ‘ওই আসামিকে তিন দিন থানায় আটকে রাখা হয়। গত বৃহস্পতিবার ভোরে আমতলী থানার ওসির কক্ষে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। গত ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে ইয়াসমিন বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ওই নারীর পরিবারের অভিযোগও ছিল পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০১৯ সালে সারা দেশে পুলিশের হেফাজতে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে গ্রেফতারের আগে নির্যাতনে চারজন, গ্রেফতারের পর শারীরিক নির্যাতনে ছয়জন এবং থানার হাজতখানায় দু’জন আত্মহত্যা করেন। দু’জন অসুস্থ হয়ে মারা যান। বাকি দু’জন নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিমত, প্রতি বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তা উদ্বেগজনক। এসব ঘটনার বিচার চেয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবার। অনেক ক্ষেত্রে বিচার চেয়ে মামলা দায়েরের পর ওই সব পরিবারকে দেয়া হচ্ছে হুমকি। এ কারণে পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিচার প্রত্যাশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পুলিশি নির্যাতনে আহত হলেও ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। তবে এসব ঘটনায় পুলিশের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযুক্তদের চাকরিচ্যুতি, পদোন্নতি স্থগিত ও পদাবনতির মতো শাস্তি দেয়া হয়। তদন্ত কমিটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বটে; কিন্তু তা গুরু পাপে লঘু দণ্ড বললে অত্যুক্তি হবে না। যেখানে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে, সেখানে অভিযুক্তকে শুধু চাকরিচ্যুতি, পদোন্নতি স্থগিত ও পদাবনতির মতো শাস্তি কতটুকু গ্রহণযোগ্য? অথচ ২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে যদি নির্যাতন করেন এবং ওই নির্যাতনের ফলে উক্ত ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করেন; তা হলে নির্যাতনকারী এ আইনের ধারা ১৩ এর উপধারা (১) অনুযায়ী অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রমাণিত হলে শাস্তি হিসেবে ন্যূনতম পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড হতে পারে। কিন্তু দেশে এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
পুলিশ যখন কাউকে হেফাজতে নেয়, তখন এর মানে হলোÑ তাকে সুরক্ষায় নেয়া। একজন দোষী সাব্যস্ত হননি, শুধু তার নামে একটি অভিযোগ এসেছে। তাই হেফাজতে নিয়ে পুলিশই যখন তাদের ওপর নির্যাতন করে; তার মানে পুলিশ রক্ষকের ভূমিকা থেকে ভক্ষক হয়ে যায়। এটি একটা গুরুতর অপরাধ। পুলিশ রাষ্ট্রের অঙ্গ, এ জন্য এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হতে হবে। তদন্ত পুলিশ দিয়ে করলে হবে না। সবার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত করাই যুক্তিযুক্ত। এতে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে। একই সাথে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনায় যারা বিচার চাচ্ছেন, সরকারের উচিত তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কাজটুকু করার কথা, তাই যেন তারা করে। কেন তারা মানুষকে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটাবে?


আরো সংবাদ