০১ এপ্রিল ২০২০
করোনাভাইরাসে অর্থনীতির ক্ষতি

সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

-

চীনে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব অত্যন্ত জোরালোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি খাত, তৈরী পোশাক শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, এ অবস্থায়, গার্মেন্ট পণ্যের অ্যাক্সেসরিজ শিল্পে দেড় হাজার কোটি টাকা তির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন জানিয়েছে, এ সঙ্কট আরও তিন-চার মাস দীর্ঘায়িত হলে এবং এ কারণে পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে, এ খাতের সম্ভাব্য তির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে বিভিন্ন কারখানার কাঁচামালের মজুদ শেষ হয়ে আসতে শুরু করেছে। চীনে ছুটি বাড়ানোর কারণে সে দেশ থেকে আসছে না এক্সেসরিজ পণ্য। বর্তমানে প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি হিসাবে ৭০০ কোটি (সাত বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের অ্যাক্সেসরিজ পণ্যের মধ্যে সরাসরি রফতানির পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার। করোনাভাইরাসের কারণে এ দেশে চীন থেকে স্বাভাবিক আমদানি বন্ধ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পায়নের স্বাভাবিক চেইন ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশের পুরো রফতানির ৮০ শতাংশই তৈরী পোশাক। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এ খাতের প্রায় ৬০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। গার্মেন্ট খাতের বিভিন্ন জিনিসপত্র যেমনÑ কাপড়, পলি, জিপার, কার্টন, লেস, হ্যাঙ্গার, বোতাম, রঙ ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক এবং আরও অনেক যন্ত্রাংশ আসে চীন থেকে। সেগুলো এখন আর আসছে না।
এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাস্টমসে দ্রুত মালামাল খালাস এবং সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার দাবি জানিয়েছে গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)। এটি আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে অবিলম্বে কার্যকর করা উচিত বলে আমরা মনে করি। কিন্তু একটি বিষয় দেশবাসীকে বিস্মিত করে। সেটি এই যে, গার্মেন্ট শিল্প দেশের বৃহত্তম রফতানি খাত হওয়ার পরও কেন এই খাতে আজো স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি? এখাতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ওপর কেন গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে। বর্তমান সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা গেলে গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ শিল্পে আমাদের স্বনির্ভর হওয়ার দিকে সরকার এবং ব্যবসায়ীরা মনোযোগী হবেন, এটিই প্রত্যাশিত।
করোনাভাইরাসের কারণে শুধু যে গার্মেন্ট শিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তা নয়। অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট ছয়টি খাতে এর প্রভাব চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে আছে ভোগ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি-রফতানি কমে যাওয়া প্রভৃতি। এ ছাড়া বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। দেশের অনেক বড় বড় প্রকল্পে কাজ করছে চীন। এ েেত্র টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য চীন থেকে আসছে। এখানে কর্মরত অনেক চীনা নিজ দেশে গিয়ে আটকা পড়েছেন। কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি প্রকল্পে কর্মরত চীনের শতাধিক কর্মকর্তা তাদের ছুটি বাড়িয়েছেন। শুধু পদ্মা সেতুতেই চীনের ১১ শ’ নাগরিক কাজ করছেন। এ ছাড়া পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, পায়রা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সংযোগ, ঢাকা বাইপাস সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের নাগরিকরা বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত। এসব প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার চীনা কাজ করে আসছেন। এর বাইরেও নানা প্রকল্পে জড়িত ৫০০ চীনা নাগরিক। এখন এ সবগুলো প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বেড়ে যাওয়া নিশ্চিত।
একটি পরিসংখ্যান মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। করোনাভাইরাস এ সম্ভাবনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।


আরো সংবাদ

সকল