০২ জুলাই ২০২০
সর্বত্র দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র

প্রধানমন্ত্রী জানেন, কোথায় শাবল চালাতে হবে

-

দেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপী হয়ে পড়েছে। আমাদের সমাজের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তা থাবা বসায়নি। এসব কথা বহু বছর ধরে বহুভাবে বলা হয়েছে এবং এখনো জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। কিন্তু এবার কিছু ছাত্র ও যুবনেতার বিরুদ্ধে অভিযোগে যে অভিযান চালানো হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে অন্যায় ও দুর্নীতির যেসব তথ্য উদঘাটিত, তাকে ‘ভয়াবহ’ বললেও কম বলা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এটিকে বলেছে, ‘লোমহর্ষক’। বলেছে, এটি ‘হিমশৈলের চূড়ামাত্র’। দুর্নীতির শেকড় আরো গভীরে।
অভিযান এবং একাধিক যুবনেতা গ্রেফতারের পর যেসব খবর প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে এসব দুর্নীতির পেছনে কারা জড়িত, কারা মদদদাতা, কারা প্রশ্রয়দাতা এবং কারা মোটা বখরার শরিক তার কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে যেসব রাঘব বোয়ালের নাম উঠে এসেছে রিমান্ডে দেয়া বন্দীদের জবানবন্দীতে, সেসব হোতাদের কারো নাম মিডিয়ায় আসেনি। আসেনি পুলিশ বা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কারা সব জেনেও এসব মারাত্মক দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তাদের নাম। যারা রাজনৈতিক দলের শীর্ষপর্যায়ে থেকে এই চরম দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, তাদের নামও আসেনি। ভবিষ্যতেও যে এদের নাম প্রকাশ পাবে, তা মনে হয় না। তবে টিআইবি ঠিক বলেছে, চলমান অভিযান উৎসাহব্যঞ্জক এবং জনমনে প্রত্যাশার সৃষ্টি করবে। তবে এর ফলে দুর্নীতির কার্যকর নিয়ন্ত্রণে কী ফল পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে এটি কতটুকু সর্বব্যাপী ও টেকসই হয় তার ওপর। দু-চারটি অভিযান আর কয়েকজন আসামি ধরার মধ্যেই যদি এটা সীমিত থাকে, তাহলে এটি যে কার্যকর কিছু হবে না তা স্বাভাবিক।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলছেন, ‘রাজনীতি, ব্যবসা, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাংশের দুর্নীতিবান্ধব যোগসাজশ সমাজের সকল পর্যায়ে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। এখন জরুরি হলোÑ কাউকে ছাড় না দেয়া; স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে এবং যেকোনো পর্যায়ের অবস্থান ও পরিচয়ে প্রভাবিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা।’ তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ‘কাউকে ছাড় দেয়া হবে না’ মর্মে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, তার মধ্যেই মূলত সর্বব্যাপী জবাবদিহিতার গুরুত্ব নিহিত রয়েছে। এর আগে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতার’ যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটা এবং সম্প্রতি দলীয় পরিচয় ও পদের অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে তার কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান ব্যক্তির পরিচয় ও দলীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নির্বিশেষে যথাযথভাবে পরিপালন করা হলেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা যায়।
আমাদেরও ধারণা, চলমান অভিযানের ফলে যে উৎকণ্ঠাজনক চিত্র সামনে এসেছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এ অভিযানের ব্যাপ্তি অন্যান্য খাত এবং পর্যায়ে বিস্তৃত করতে পারলে একই চিত্র উদঘাটিত হবে। রাজনৈতিক সংস্রবপ্রসূত দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু রাজধানী ও এর আশপাশের যুব ও ছাত্রনেতাদের একাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিস্তৃত দেশব্যাপী সকল পর্যায়ে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিসহ মূল রাজনৈতিক দল ও দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর একাংশে। প্রকৃতপক্ষে, ছাত্র ও যুব নেতারা এ ক্ষেত্রে তাদের মূল দলের অগ্রজদেরই অনুসরণ করে থাকেন, যারা তাদের এই অনৈতিক চর্চার ‘রোল মডেল’।
একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অন্তত একাংশের অংশগ্রহণ, রক্ষকের ভূমিকা ও যোগসাজশ ব্যতীত এ জাতীয় ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়ন সম্ভব নয় বিধায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে একইভাবে জবাবদিহিতার আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে অবিলম্বে। পাশাপাশি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ববোধ, পেশাগত শুদ্ধাচার, নিরপেক্ষতা ও উৎকর্ষ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে ঢেলে সাজাতে হবে।
আমাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী জানেন, দেশে দুর্নীতির মূল শেকড় কোথায় এবং কোথায় তাকে কিভাবে শাবল চালাতে হবে। আশা করি, দেশ, জাতি এবং নিজ দলের স্বার্থে তিনি এবার এটা করে দেখাবেন এবং বাংলাদেশকে সত্যিকার সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।


আরো সংবাদ