০৮ জুলাই ২০২০
হাজারের তালিকায়ও নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ অধঃপতন গোটা জাতির জন্য লজ্জার

-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আমাদের অনন্য গর্বের ধন। এটিকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’। দেশ-বিদেশের নানা বরেণ্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে নিজেদের ধন্য মনে করতেন। কিন্তু দেশে যেখানে উন্নয়ন উন্নয়ন বলে হরহামেশা বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া হচ্ছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আজ কোথায় নামিয়ে আনা হয়েছে তা ভাবতেও অবাক লাগে। গতকাল প্রকাশিত প্রায় সব ক’টি দৈনিকের এক খবরে জানা গেল, মান বিবেচনায় এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই। পৃথিবীব্যাপী র্যাংকিং নির্ধারক লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’-এর চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র পাওয়া যায়। ওই র্যাংকিংয়ে ৯২টি দেশের এক হাজার ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার অবস্থান হাজারের মধ্যে নেই। শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা সংখ্যা ও সুনাম, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি, এ খাত থেকে আয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতাসহ পাঁচটি মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
২০১৬ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়পরিধিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে প্রায় ৪০০ ধাপ পিছিয়েছে। গবেষণার সংখ্যা কমে যাওয়া, মানসম্পন্ন গবেষণার অপর্যাপ্ততা, শিক্ষক রাজনীতি, শিক্ষা-বাণিজ্য ও সহিংস ছাত্ররাজনীতি ইত্যাদি কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
আমাদের একটি স্থায়ী প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখনই কোনো প্রতিবেদন সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যায়, তখন এই রিপোর্টকে পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান করা হয়। সেই প্রবণতাতাড়িত হয়েই হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই এই র্যাংকিং প্রকাশ। কিন্তু তার কাছে প্রশ্ন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিকতাড়িত হয়ে সরকারি দলের ছাত্রছাত্রীরা বিনা ভর্তি পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং এদেরকেই কার্যত বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ডাকসুতে বিভিন্ন পদে নির্বাচিত করা হয়, সেখানে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে হাজারের নিচে চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক নয়? যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ছাত্রদের পড়ানোর চেয়ে রাজনীতির প্রতি অধিকতর আগ্রহী হয়, গবেষণায় যাদের আগ্রহ কম সেখানে আর যাই হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং উপরে উঠতে পারে না। সম্প্রতি শিক্ষকদের সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে বাণিজ্য সিদ্ধির বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত। শিক্ষকেরা গবেষক হওয়ার চেয়ে বিভিন্ন পদ পাওয়ার ব্যাপারেই অধিক আগ্রহী।
এমনই অবস্থায় র্যাংক নির্ধারকদের দিকে আঙুল না তুলে আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখার পরামর্শ রাখব। টাইমস হায়ার এডুকেশন-সূচক অনুযায়ী ২০১৬ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এর দুই বছর পরেই হঠাৎ করে শুরু হয় এর র্যাংকিংয়ের ক্রমাবনতি। ২০১৮ সালে এর অবস্থান ৪০০ ধাপ পেরিয়ে হাজারের নিচে নেমে গেল কেন তা খতিয়ে দেখার জন্য ভিসি মহোদয়কে অনুরোধ রাখছি।


আরো সংবাদ