২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

রেমিট্যান্স কমায় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহে ভাটা
-

রেমিট্যান্স প্রবাহ গত মাসে প্রায় ২৮ শতাংশ কমে গেছে। একই সাথে বাড়তে শুরু করেছে আমদানি ব্যয়। এতে টান পড়তে শুরু করেছে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহে। এমনি পরিস্থিতি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের প্রথমবারের মতো সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার ৭টি ব্যাংকের কাছে ৫ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার যাতে অস্থিতিশীল না হয় সেজন্য ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করা হবে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে পর্যাপ্ত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। প্রতি বছরই রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের বছরের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়। এরই সুবাদে গেল অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয় আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ। এক বছরে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার। কিন্তু আমদানি চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে উদ্বৃত্ত ডলার ছিল। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৭৯২ কোটি ২০ লাখ ডলার কিনে নেয়। যার স্থানীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ৮৪.৮০ টাকা) প্রায় সাড়ে ৬৭ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে যে হারে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে, চলতি অর্থবছরের শুরুতেই তা হোঁচট খায়। গত জুলাইয়ে রেমিট্যান্স আসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কম। গত জুলাইয়ে রেমিট্যান্স আসে ১৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলার। অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা কাটতে শুরু করেছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস একটানা লকডাউন শেষে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে শুরু করেছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে আমদানি ব্যয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত জুন শেষে আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। গত জুলাই মাসে হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে জুনের ধারাবাহিকতা রয়েছে আমদানি ব্যয়ে। এক দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, অপর দিকে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। এতে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। এমনি পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও যোগানের সাথে সমন্বয় করতে পারছে না কিছু ব্যাংক। বাধ্য হয়েই তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার এমনি ৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ডলারের চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এসেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে ৫ কোটি ডলার বিক্রি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর বাজার থেকে ডলার কিনছে না। মূলত সরবরাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত ডলার থাকছে না। তবে আমদানি চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু ব্যাংকের ডলারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। মূলত বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাসে বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনেছিল ১৩৪ কোটি মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মূল্য ছিল ১১ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা হিসেবে)। পরের মাসে অর্থাৎ আগস্টে ডলার কেনে ৪০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। যার স্থানীয় মূল্য ৩ হাজার ৪৪২ বোটি ৮৮ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বরে আবার তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে হয় ৮৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। যার স্থানীয় মূল্য ছিল ৭ হাজার ৪৭০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অক্টোবরে আরো বেড়ে হয় ১০১ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মূল্য ৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। ৭ হাজার ৮৯ কোটি টাকা মূল্যের ৮৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার কেনা হয় নভেম্বরে। পরের মাসেই অর্থাৎ ডিসেম্বরে কেনা হয় ৮ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা সমমূল্যের ১০১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এভাবে জানুয়ারিতে ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা মূল্যের ৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা মূল্যের ৪১ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং মার্চে কেনা হয় ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা মূল্যের ২২ কোটি ডলার। সর্বশেষ গত এপ্রিলে ৪ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা মূল্যের ৪৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার কেনা হয় বাজার থেকে। গত মে মাসে ডলার কেনা হয় ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা মূল্যের ৭৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর গত জুনে কেনা হয়েছে ২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা মূল্যের ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর এ পরিমাণ ডলার কেনা হয়েছে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা দরে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ইচ্ছা করলেই বাড়তি ডলার নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারে না। প্রতিটি ব্যাংকেরই তার বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে ধরে রাখার জন্য সীমা দেয়া আছে। এ সীমাকে এনওপি বা নেট ওপেন পজিশন বলে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলার বিক্রি করতে হবে, না হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে। কেউ নির্ধারিত সীমার বাইরে ডলার নিজেদের কাছে ধরে রাখলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জরিমানা গুণতে হয়। জরিমানার হাত থেকে বাঁচার জন্য ব্যাংকগুলো বাজারে ডলার বিক্রি করতে না পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দ্বারস্থ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংক তার মূলধনের ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারে। এর অতিরিক্ত হলেই তাকে বাজারে ডলার বিক্রি করতে হবে। গেল অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে নিয়েছিল। এতে টাকার সরবরাহ বেড়ে গেলেও করোনার কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি ও ক্রয়ের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক গত জানুয়ারি মাসে তিন কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। এর ৬ মাস পর সর্বশেষ গত ২৪ জুন বিক্রি করেছিল ৫০ লাখ ডলার। জুন মাসের পর গত ১৯ আগস্ট এক সাথে ৭ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করা হয় ৫ কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রায় এক বছর ডলারের মূল্যের কোনো হেরফের ছিল না। অর্থাৎ প্রতি ডলার ৮০ টাকা ৮০ পয়সা দরে বিক্রি হয়। কিন্তু জুলাই মাস থেকে সরবরাহ কমতে থাকায় স্থানীয় বাজারে ডলারের মূল্য বাড়তে থাকে। গতকাল প্রতি ডলার কিনতে ব্যয় করতে হয়েছে ৮৫ টাকা ১০ পয়সা। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার।


আরো সংবাদ


premium cement