২৫ নভেম্বর ২০২০

বাংলাদেশের লুঙ্গিতে ভারতের রমরমা রফতানি বাণিজ্য

বাংলাদেশের লুঙ্গিতে ভারতের রমরমা রফতানি বাণিজ্য - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের তাঁতিদের তৈরি লুঙ্গির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ২০টি দেশে প্রতি বছর প্রায় দেড় কোটি পিস লুঙ্গি রফতানি হচ্ছে। এ দিকে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা মূল্যের ৮৫ লাখ পিস লুঙ্গি কিনছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা। পরে সেই লুঙ্গিতে নামীদামি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার লাগিয়ে ভারতের লুঙ্গি হিসেবে বিশ্ববাজারে রফতানি করে ভারত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।

সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে আসা কয়েকজন ভারতীয় ব্যবসায়ীর সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। ভারতের মালদহের অজিত দত্ত, শিলিগুড়ির সেলিম খান ও মুর্শিদাবাদের বাবু মিয়া জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবাংলার প্রায় দেড় কোটি লোক বিদেশে কাজ করছেন। তাদের চাহিদা মেটাতে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিশ্বের ২০টি দেশে লুঙ্গি রফতানি হচ্ছে। বাঙালিরাই মূলত এই লুঙ্গির ক্রেতা। তবে ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশের লোকজন শখ করে বাংলাদেশী লুঙ্গি কেনেন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশের লুঙ্গি ভারতে রফতানি শুরু হয়। তখন প্রতি মাসে চার ট্রাক লুঙ্গি (৬০ হাজার পিস) রফতানি হতো। ধীরে ধীরে চাহিদা ও রফতানি পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে ভারতের মালদহর অজিত দত্ত, পাটনার তানভির আলম, শিলিগুড়ির সেলিম খান, মুর্শিদাবাদের বাবু মিয়াসহ ১২ জন আমদানিকারক সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরহাট থেকে পাঁচ ট্রাক এবং টাঙ্গাইলের করটিয়াহাট থেকে দুই ট্রাক লুঙ্গি কিনছেন। গড়ে প্রতি সপ্তাহে (সাত ট্রাক) এক লাখ পাঁচ হাজার পিস। সেই হিসেবে বছরে (৩৬৪ ট্রাক) ৫৪ লাখ ৬০ হাজার পিস লুঙ্গি তারা বাংলাদেশ থেকে কিনে তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। পরে সেখানে তাদের প্রতিষ্ঠানের স্টিকার লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করে আসছে। লুঙ্গি রফতানিতে তারা একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে বলে জানা গেছে।

পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী শহিদ আলী জানিয়েছেন, ভারতের শতাধিক ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরহাট ও টাঙ্গাইলের করটিয়াহাট থেকে প্রতি বছর (আরো প্রায় ২০০ ট্রাক প্রতি ট্রাকে ১৫ হাজার পিস) প্রায় ৩০ লাখ পিস লুঙ্গি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পরে তারা সেই লুঙ্গি উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর, হুগলী, বর্ধমান, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, জলপাইগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কুচবিহার, হওড়া ও হুগলীর নামীদামি শপিংমল, বিপণিবিতান ও ছোট-বড় পাইকার এবং রফতানিকারকদের কাছে বিক্রি করছেন।

সিরাজগঞ্জ ও পাবনা তাঁতি সমবায় সমিতি সূত্রে জানা যায়, পাবনা জেলার হাতিগাড়া, বনগ্রাম, সান্যালপাড়া, ছেঁচানিয়া, দোগাছি, সুজানগর, ডেমরা, ঢহরজানি, সোনাতলা, পুন্ডুরিয়া, বিলসলঙ্গী, চাঁচকিয়া, কুলোনিয়া, হাটুরিয়া, রাকশা, মৈত্রবাধা, সাঁথিয়া, বাটিয়াখড়া, পেঁচাকোলা, ঈশ্বরদী, জালালপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলার পুকুরপাড়, নগরডালা, ডায়া, খুকনী, শিবপুর গাছপাড়া ও নরসিংদী জেলার চরসুবুদ্ধি, হাইরমারা, নিলক্ষা, আমিরগঞ্জ, কাট্টাখালি, ঘোড়াদিয়া, করিমপুর, নজরপুর, বাবুরহাট, মাধবদী, পৌলানপুর, ভাটপাড়া ভাগীরথপুর, ঘোড়াশাল, পাইকশা, সনেরবাড়ী টাঙ্গাইল জেলার পাথরাইল, চণ্ডি, নলসুধা, চিনাখোলা, দেওজান, নলুয়া, হিঙ্গানগর, এলাসিন, বাতুলি, বাজিদপুর, বল্লা, রামপুরসহ তাঁত প্রধান এলাকার তাঁতে তৈরি লুঙ্গির সুনাম ও কদর এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

পাবনা বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা যায়, দেশে ১৯৯৮ সালে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুমে লুঙ্গি তৈরি শুারু হয়। বর্তমানে এ ধরনের তাঁতে ৯০ ভাগই লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া চিত্তরঞ্জ ও পিটলুমে লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। আর উৎপাদিত লুঙ্গির বেশির ভাগই বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নরসিংদী জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে লুঙ্গি প্রস্তÍুতকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ হাজার। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু স্থানীয়ভাবে লুঙ্গি তৈরি ও বিক্রি করে থাকে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই তাঁত মালিকদের কাছে অর্ডার দিয়ে লুঙ্গি তৈরি করিয়ে আনে। পরে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রতীক বা স্টিকার লাগিয়ে ওই লুঙ্গি বাজারজাত করেন।

তাঁতিরা জানিয়েছেন, এক সময় নামে-বেনামে বিক্রি হওয়া লুঙ্গি এখন পরিচিতি পাচ্ছে কারখানার নিজস্ব ব্র্যান্ডে। দেশে প্রথম লুঙ্গি ব্র্যান্ডিং শুরু করে নরসিংদীর হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স। বাজারে সোনার বাংলা টেক্সটাইল, ডিসেন্ট, ইউনিক, স্ট্যান্ডার্ড, আমানত শাহ, রুহিতপুরী, স্মার্ট, অমর, পাকিজা, এটিএম, বোখারী, ফজর আলী, অনুসন্ধান, জেএম, স্কাই, ওয়েস্ট, রংধনুসহ ১২৫ ব্র্যান্ডের লুঙ্গি দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তাঁত কারখানায় ৪০ থেকে ১০০ কাউন্টের সুতার লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। মানভেদে প্রতি পিস লুঙ্গি ২২০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে লুঙ্গি বাজারে। রঙ ও ডিজাইনে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে লুঙ্গি সবার কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। লুঙ্গি এখন শুধু বাঙালি পুরুষের পোশাকই নয়, গুণ-মান এবং ভালো ডিজাইনের কারণে বাংলাদেশের লুঙ্গির দিকে নজর এখন বিদেশীদেরও। তবে বাংলাদেশী লুঙ্গির বড় ক্রেতা ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তারা বাংলাদেশ থেকে লুঙ্গি ভারতে নিয়ে সেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করছেন। এই লুঙ্গি তারা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে প্রতি পিস এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করছেন।

ভারতের মালদহ জেলার আমদানি ও রফতানিকারক এম এম ইন্টরন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী অজিত দত্ত জানিয়েছেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ১২ জন আমদানি-রফতানিকারক বাংলাদেশের, আতাইকুলা, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, করোটিয়া ও বাবুরহাট থেকে লুঙ্গি কিনে সড়কপথে ট্রাকে করে ভারতের পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার ও দিল্লিতে নিয়ে মজুদ করে থাকেন। পরে সেখানে থেকে ভারতের বিভিন্ন নামীদামি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার লাগিয়ে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, লেবানন, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করে আসছেন। ভারতীয় আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লাখ পিস লুঙ্গি ক্রয় করে থাকে বলে তিনি জানান।

শাহজাদপুর হাটের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল্লা আল মাসুদ জানালেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, টাঙ্গাইলের করটিয়াহাট থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৫ কোটি টাকার কাপড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের বাজার পাওয়ায় এ অঞ্চলের তাঁত শিল্প কোনো রকমে টিকে আছে।
ভারতের কলকাতার কাপড় ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র সেন জানান, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ উৎপাদিত লুঙ্গি ভারতের রফতানিকারকদের প্রতিনিধিরা কিনে নিচ্ছে। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম, টেকশই এবং উন্নত মানের হওয়ায় তারা এখান থেকে কাপড় কিনছেন। এই লুঙ্গি ভারতের বড় বড় শহরে পাইকারি বিক্রয় করে থাকেন। তিনি বলেন, ভারতের রফতানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের লুঙ্গির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তারা বাংলাদেশী লুঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করে আসছেন।

সোনার বাংলা টেক্সটাইলের মালিক রফিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এখন ক্রেতারা লুঙ্গি কেনার ক্ষেত্রে ব্র্র্যান্ডকে প্রাধান্য দেয়। আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে সোনার বাংলা টেক্সটাইল লুঙ্গি। ডিজাইন ও মানের কারণে সোনার বাংলা লুঙ্গি এগিয়ে রয়েছে, যা সব বয়সীর দৃষ্টি কাড়ছে। প্রতি বছর গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকার লুঙ্গি বিক্রি হচ্ছে।

পাবনা জেলা কেন্দ্রীয় শিল্প সমিতির সাবেক চেয়ারম্যান মো: শাহজাহান আলী আশরাফী বলেছেন, কয়েক বছর ধরে সুতার অস্থিতিশীল বাজার, রঙ, কেমিক্যালসহ অন্যান্য উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে লুঙ্গি তৈরির খরচ বেড়েছে। কিন্তু নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে কয়েক বছর ধরে লুঙ্গি খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশী লুঙ্গি রফতানি করে ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছেন। দেশের ব্যবসায়ীরা সরকারি সাহায্য, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লুঙ্গি রফতানি করে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ লুঙ্গি ম্যানুফ্যাকচারার্স, এক্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েসন ও আমানত শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান হেলাল মিয়া বলেন, গত বছর তার প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েকটি দেশে লুঙ্গি রফতানি করেছে। প্রতি বছরই রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের লুঙ্গির মান সবচেয়ে ভালো। রফতানিতে অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমার লুঙ্গি নিয়ে ভারত যে ব্যবসা করছে সেই ব্যবসা আমরা করতে পারব। এতে দেশ প্রচুর বৈদেশী মুদ্রা আয় করবে। তৈরি পোশাকের পর লুঙ্গি দিয়েই বিশ্ববাজারে নতুন জায়গা করে নেয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।


আরো সংবাদ

জনগণকে বাঁচাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে : সেলিনা রহমান বিদেশে ঘাস চাষ শেখা নিয়ে তুলকালাম, শতকোটি টাকার প্রকল্প অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে লাশ তালাবন্দী করে কাজে গেলেন স্বামী! ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে মানুষের অনুভূতিকে উস্কে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে’ মুন্সীগঞ্জে পরকীয়া প্রেমিক যুগলের লাশ উদ্ধার ৪৮০টি বিড়াল ও ১২টি কুকুরের আশ্রয়দাতা ধর্ষকদের পুরুষাঙ্গ অকেজো করে দেয়ার আইনে ইমরান খানের অনুমোদন রাজধানীতে বস্তিতে আগুন, জামায়াতের বিবৃতি ঢাকা ও সিলেট শিক্ষা বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ বাংলাদেশী ৯ জেলেকে ফেরত দিয়েছে মিয়ানমার নারী-মেয়েশিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগের দাবি টিআইবি’র

সকল