০১ ডিসেম্বর ২০২০

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা


রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক অনুদানের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে তা ব্যয় হচ্ছে না। পণ্য আমাদনির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এতে উদ্বৃত্ত হয়েছে চলতি হিসাবের ভারসাম্য। শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমার পাশাপাশি কমে গেছে মেয়াদি ঋণ আদায়ও। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না। পাশাপাশি কমে গেছে রাজস্ব আদায়। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন কমে যায় তখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় কমে যায়। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রভাব অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও পড়েছে। মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থাকছে। অর্থনৈতিক অন্য সূচকগুলোও আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, কোভিড পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ নানা সংস্থা থেকে বৈদেশিক অনুদান আসছে। সেই সাথে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। কিন্তু আমদানি বাড়েনি, বরং কমে যাচ্ছে। শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। সেই সাথে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয়ও কমেছে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ অনুযায়ী ব্যয় হচ্ছে না। সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এলে এই অবস্থা দেখা দেয়। বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে শিল্প কারখানা আর আগের মতো চালু নেই, বরং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রায় কেনাকাটা কমে গেছে। এ কারণেই চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত হয়েছে। এর ভালো দিকও যেমন আছে, তেমিন খারাপ দিকও রয়েছে। ভালো দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ কমে যায়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকে। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হলে কর্মসংস্থান কমে যায়। কমে যায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এতে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায় অনেক মানুষ।

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতায় শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আদায়ও ব্যাপকহারে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছিল ২২ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা, গত বিদায়ী অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থাৎ গত এপ্রিল-জুনে তা কমে আসে ১২ হাজার ১৩২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় সাড়ে ৪৫ শতাংশ। শুধু ঋণ বিতরণই কমেনি, পাশাপাশি আদায়ও কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরুর পরের তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) মেয়াদি ঋণের আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৮ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অবস্থা আরো নাজুকে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শিল্পঋণ আদায়ের চিত্র নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, প্রতি তিন মাসে গড়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে শিল্পের মেয়াদি ঋণ আদায় হতো। গত বছরের এপ্রিল-জুন তিন মাসে মেয়াদি এ শিল্পঋণ আদায় হয়েছিল ২৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। চলতি বছরে একই সময়ে তা ১০ হাজার কোটি টাকায় নেমে গেছে।

জুলাই-সেপ্টেম্বরের হিসাব এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে এ তিন মাসে ঋণ আদায় আরো কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে হুন্ডি তৎপরতা কমে গেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক দেশ থেকে শ্রমিক পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। যারা বিদেশ থেকে ফিরে আসছেন, তাদের বেশির ভাগই দীর্ঘ দিন যাবৎ বিদেশে কর্মরত ছিলেন। একবারেই যখন চলে আসছেন তখন দীর্ঘদিনের সঞ্চয় নিয়ে ঘরে ফিরছেন। সর্বোপরি রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে দুই শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এর অন্যতম কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ। বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কিনে নেয়া হচ্ছে। এতে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য তেমন কমেনি। গত বছরের ১৪ অক্টোবর প্রতি ডলার পেতে যেখানে ব্যয় হতো ৮৪ টাকা ৭০ পয়সা, সেখানে গত ৩০ জুনে ডলারের মূল্য সামান্য কমে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায় নামে, যা গতকালও একই হারে লেনদেন হয়। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর তেমন কোনো প্রভাব না পড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত সেপ্টেম্বর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লেও ব্যয় বাড়েনি, বরং কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, প্রাথমিক পণ্যের আমদানি কমেছে প্রায় ২৯ শতাংশ, জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হওয়ায় রাজস্ব আদায়ও বাড়ছে না, বরং কমে গেছে। রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) রাজাস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, পণ্য আমদানি কমে যাওয়ার অর্থই হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসা। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমলে নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন হবে না, এতে বাড়বে না কর্মসংস্থান। আবার শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো বিদ্যমান শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া। আর পণ্য উৎপাদন কমে গেলে শিল্পকারখানা লোকসানের মুখে পড়ে যাবে। এতে শ্রমিক ছাঁটাই বাড়বে। বাড়বে বেকারত্বের হার। এতে মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমে না গেলে বর্তমান অবস্থা থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না বলে তারা মনে করছেন।


আরো সংবাদ