২৭ অক্টোবর ২০২০

কর্মসংস্থান নেই : দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে অনেক মানুষ


শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে স্থবিরতা নেমে এসেেছ। চলতি অর্থ বছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনী যন্ত্রপাাতি আমদানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। একই সাথে কমেছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বর্ধিত হারে নতুন নতুন শিল্প স্থাপন করতে হবে। আর নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি অমদানি। কিন্তু এ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে না বরং ব্যাপকভিত্তিতে কমে যাচ্ছে। তারা বলেন, শুধু করোনার কারণেই নয়; দীর্ঘ দিন ধরেই মূলধনী যন্ত্রপাতি কমায় বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এতে বেকারত্বের হার বেড়ে যাচ্ছে। অনেক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন কিন্তু তাদের জন্য বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম হলো বেসরকারি খাত। কিন্তু বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না। এটা শুধু করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণেই নয়; করোনা শুরু হওয়ার আগে থেকেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমছে। দীর্ঘ দিন ধরে বিনিয়োগ সূচক নেতিবাচক রয়েছে। আর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি তো কমছেই। সবমিলে বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্বের হার বেড়ে যাচ্ছে। এতে অনেক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এটা উত্তরণের একমাত্র উপায় বিনিয়োগ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম খান গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রতিবছরই ২৫ লাখ নতুন মুখ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চ হারের করনীতিই কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম বাধা বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি শক্তিশালী সূচক হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লে নতুন নতুন কলকারখানা হয়। এতে সৃষ্টি হয় বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান। কিন্তু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে না। আগে থেকেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এর প্রভাব বড় আকারে পড়েছে।

তিনি বলেন, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রণোদনা দিতে হবে। তিনি বলেন, সাড়ে ৩২ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয় উদ্যোক্তাদের। এর বাইরে ২৫ শতাংশ আয় কর পরিশোধ করতে হয়। তিনি বলেন, ব্যাংকের বাইরে হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন। তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকেই কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য ৩০ শতাংশ কর না নিয়ে ১০ শতাংশ নেয়া উচিত। কারণ একজন উদ্যোক্তাকে ধরে রাখতে পারলে ওই উদ্যোক্তার সাথে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান থাকে। এ কারণে যারা চলমান পরিস্থিতিতে শ্রমিক ছাটাই না করে ধরে রাখবেন তাদের কর হারে ছাড় দিতে হবে। আর যারা বিদ্যমান কর্মসংস্থানের সাথে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন তাদের আরো বেশি হারে ছাড় দিতে হবে। এটা করা হলে কর্মসংস্থান বাড়বে বৈ কমবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত অর্থ বছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ঋণাত্মক প্রায় ৯ শতাংশ। ওই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে চলতি অর্থ বছরের প্রথম দুই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক প্রায় ৪০ শতাংশ। শুধু শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতিই আমদানি কমছে না, শিল্পর কাঁচামাল আমদানিও ব্যাপকভিত্তিতে কমে গেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টির ওপর।

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম খান বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের বিভিন্ন খাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে গেছে প্রায় ৫০ ভাগ। বর্তমান অবস্থায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টিই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, আগে থেকেই কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ ছিল, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এ চ্যালেঞ্জের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখার জন্য উদ্যোক্তাদের ছাড় দিতে হবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে। এতে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে নীতিনির্ধারণী মহলকে সচেষ্ট হতে হবে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। একজন ব্যাংকার জানিয়েছেন, এতদিন শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বাড়ার অন্তরায় হিসেবে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারকে দায়ী করে আসছিলেন। কিন্তু বর্তমান ব্যাংক ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে অর্থাৎ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, তারপরেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। এটাই প্রমাণ করে বিনিয়োগ না বাড়ার প্রধান কারণ শুধু ব্যাংক ঋণের সুদ নয়; অন্য কারণ রয়েছে।

প্রথমত বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তাদের জন্য ভয়ভীতিহীন আস্থাশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত উচ্চ কর হার পরিহার করতে হবে। এরপরে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়ে আনার সুফল পাওয়া যাবে। অন্যথায় বিনিয়োগ বাড়বে না।

তিনি জানান, ১৫-১৬ শতাংশ সুদেও একসময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। এখন ৯ শতাংশে নামিয়েও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে আনা যাচ্ছে না। এ কারণে উদ্যোক্তাদের কর হারে ছাড় দিতে হবে। ব্যবসার অন্যান্য ব্যয় কমিয়ে আনতে উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই বিনিয়োগ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।


আরো সংবাদ