২৮ অক্টোবর ২০২০

প্রকল্প অনুমোদনের পরই পরিবর্তনের উৎসব

৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ; নির্ধারিত মেয়াদে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫৪ শতাংশ

উন্নয়ন প্রকল্প বা কার্যক্রমগুলো অনুমোদনের পর আসে পরিবর্তনের উৎসব। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক) থেকে অনুমোদন নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মাথায় চিন্তা আসে বিভিন্ন সংশোধন ও পরিবর্তনের। ফলে কাজ ঢিলেমি রোগে আক্রান্ত হয়। ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পটির নির্ধারিত সাড়ে ৪ বছরে অগ্রগতি মাত্র ৫৪ শতাংশ। আর এই প্রকল্পে অনুমোদনের সাড়ে চার বছরে এসে নানান পরিবর্তন প্রস্তাবনা দিয়ে আবার অনুমোদন নেয়া হয়েছে। প্রকল্পে ৫টি মোটরযান মেরামত, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ ধরা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা বলে প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত অনুমোদিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, ৪০টি উপজেলায় ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও চট্টগ্রামে একটি মেরিন টেকনোলজি ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য ২০১৬ সালে এক হাজার ৩৩১ কোটি ২৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৪ বছরে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। সাড়ে চার বছরে প্রকল্পের কাজে সন্তোষজনক অগ্রগতি নেই। মেয়াদ পার করে প্রকল্পে ব্যাপক সংশোধন দেখানো হয়। ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ২৫.২২ শতাংশ বা ৩৩৫ কোটি ৭৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৬৭ কোটি ৭ লাখ ৯২ হাজার টাকায়। এখন মেয়াদ আরো ২ বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এক রেট শিডিউল দিয়ে প্রাক্কলন ও অনুমোদন, এরপরেই রেট শিডিউল পরিবর্তনের যুক্তি দেখানো হয়। নতুন মূল্য হার দেখিয়ে প্রকল্পের খাতভিত্তিক সকল ব্যয়ের পরিবর্তনের প্রস্তাবনা দেয়া হয় পরিকল্পনা কমিশনের কাছে অনুমোদনের জন্য। পরে যা একনেক অনুমোদন দেয় পিইসির সুপারিশের আলোকে।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু করার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করা হয় দেরিতে। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সোয়া চার বছরে মাত্র ৩০ শতাংশ পূর্ত ও নির্মাণকাজ হয়েছে। অধিগ্রহণের পর দরপত্র আহ্বানে এক বছর সময় পার হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে নির্মাণ কাজ আরম্ভ করা হয়। অন্য দিকে যেসব এলাকায় একাডেমিক ও প্রিন্সিপাল ভবন নির্মাণ কাজ ৮০ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে সেসব কেন্দ্রের জন্য জনবল নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। কারণ প্রকল্পের ডিজাইনের সাথে জনবল নিয়োগের সংযোগ নেই। অধিকাংশ প্রকল্প এলাকায় ভবন নির্মাণে চুক্তির ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্টিলের পরিবর্তে বাঁশ ও কাঠ ব্যবহার করে সাটারিং করা হচ্ছে।

সংশোধনের কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও মামলার কারণে প্রকল্পের পূর্ত কাজ শুরু করতে দেরি হয়। এ কারণেই ডিপিপি সংশোধন করা হয়েছে। প্রথমে জমি অধিগ্রহণ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০৮ কোটি ৫৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ৮৪ কোটি টাকা। ডিপিপি প্রস্তুতের সময় দেড় গুণ মূল্য ধরে প্রাক্কলন করা হয়। এখন সেটা তিনগুণ ধরে প্রাক্কলন করায় জমি অধিগ্রহণ খরচ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রামে একটি মেরিন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নতুন করে যুক্ত করা হয়। অনুমোদিত ডিপিপি গণপূর্ত অধিদফতরের ২০১৪ সালের রেট শিডিউল অনুসারে প্রাক্কলন করা হয়। ২০১৮ সালের মে মাসে নতুন রেট শিডিউল কার্যকর হয়। ফলে এখানে পূর্ত কাজের দর অনেক বেড়েছে। ডিপিপি অনুমোদনের আগে জমি নির্বাচন করা হয়নি। ফলে গণপূর্ত গড়ে ৫ ফুট বাশু ভরাট করার পরিকল্পনা নিয়ে বালু ভরাটের প্রাক্কলন করে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত বালু ভরাট করতে হচ্ছে। যার কারণে নতুন করে ডিপিপি সংশোধন করা হয়।
এই প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে পানি শোধনাগার করার পরিকল্পনা রাখা হয়নি। কিছু কিছু এলাকার পানি লবণাক্ত ও আর্সেনিক বেশি। কোনো কোনো এলাকায় পানিতে আয়রনের পরিমাণ বেশি। ফলে এখন পানি শোধনাগার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য এখন পানি শোধনাগার নির্মাণে বিষয়টি যুক্ত করতে ডিপিপি সংশোধন করা হয়েছে।

প্রকল্পের খরচ বিভাজনে দেখা যায়, ২ জনের জন্য মোবাইল ফোনের জন্য খরচ খাত রাখা হয়েছে। আবার ওই দু’জনের জন্য টেলিফোন খাতে খরচও ধরা হয়েছে। মোবাইলে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর টেলিফোনে ১ লাখ টাকা। টেলিফোনের এই খরচ প্রথমে ১০ লাখ টাকা ধরা হয়। পরে তা কমানো হয়। রাজস্ব খাতের পাশাপাশি পণ্য ও সেবা ব্যবহার খাতে আপ্যায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। ৩টি মোটরযান মেরামত ও সংরক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। আবার মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২টির জন্য ২০ লাখ টাকা। এখানে একই খাতে দু’টি হেডে ব্যয় হবে মোট ৩০ লাখ টাকা। প্রায় ৪৪ লাখ টাকা দরে ৪৩টি মোটরযান কেনা হবে, যা প্রথমে ২টি ধরা হয়েছিল। এখন এই খাতে খরচ হবে ১৮ কোটি ৮৯ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পে সমীক্ষা ছাড়া প্রাক্কলন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই না করে প্রাক্কলন করার কারণে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ব্যয় তৈরি করা হয়। এরপর অনুমোদন নিয়ে দেখে ব্যয় কম ধরা হয়েছে। তখন আবার সংশোধনের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। যার কারণে অনেক প্রকল্পে দেখা গেছে দফায় দফায় পরিবর্তন। মেয়াদ বাড়লেই ডিপিপির পরিবর্তন আসবেই। কারিগরি ইনস্টিটিউটের এই প্রকল্পটি ১ হাজার ৩৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্প। কিন্তু এই প্রকল্পে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। বলা হয়েছে প্রয়োজ্য নয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রকল্প পাস হওয়া মানে টাকা খরচ নয়। আমরা প্রকল্প চলমান সময়েও নজরদারি করছি। প্রকল্প অনুমোদনের পর সেটার বাস্তবায়ন কাজ আইএমইডি দেখবে।


আরো সংবাদ