২৫ অক্টোবর ২০২০

ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতের শর্তে বাজেটে অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক


ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে। সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ তদারকি ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হবে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন। এমন প্রায় ডজন খানেক শর্ত আরোপ করা হচ্ছে বিশ্ব ব্যাংকের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রাক অনলাইন বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে লিখিত প্রস্তাব দেয়ার জন্য বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর যেকোনো অনিয়মের তদারকি করতে পারবে। গুরুতর অনিয়মের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্য তফসিলি ব্যাংকগুলোর চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়ার অংশ হিসেবে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর গুরুতর অনিয়মের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুশাসনের আওতায় থাকে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেবে সরকার। দুই কিস্তিতে তহবিল ছাড় করা হবে বিশ্বব্যাংক থেকে। বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ঋণ অনুমোদনের আগে বিশ্বব্যাংক থেকে কিছু শর্ত দেয়া হচ্ছে। এ শর্তগুলোর মধ্যে কিছু আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে পূরণ করতে হবে। বাকি শর্ত এক বছরের মধ্যে পূরণ করতে হবে।
এ নিয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস ও প্রধান কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। তহবিল জোগানের প্রাক বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অর্পণ করতে হবে। এজন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করতে হবে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ঋণ নেবে সরকার। আবার সরকারি ব্যাংকগুলোর সংস্কারও করতে পারে সরকার। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তেমন কিছুই করার নেই। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।

অপর দিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করতে বলেছে বিশ্বব্যাংক। বলা হয়েছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়াতে। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের লিখিত প্রস্তাব দিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। লিখিত প্রস্তাব পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতায় যতটুকু থাকবে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পূরণ করা হবে। বাকি সরকারের অংশ অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেয়া হবে।

এ দিকে সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘করোনা মহামারী মোকাবেলায় ঋণ ও বিনিয়োগে দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর প্রভাব মোকাবেলায় অর্থের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

উল্লেখ্য, বহুজাতিক সংস্থাগুলো থেকে বাংলাদেশ ২৮০ কোটি ডলারের ঋণ গ্রহণ করেছে। এর একটি অংশ দিয়ে করোনা মোকাবেলায় মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী, হ্যান্ডগ্লাভসসহ নানা ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী আমদানি করা হয়েছে। এসব কেনাকাটায় ইতোমধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্যান্য সংস্থা।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যত দ্রুত পড়েছে, অনেকটা তত দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে। অনেকটা ‘ভি’ আকৃতিতে। অর্থাৎ করোনার কোপে হঠাৎ করেই অর্থনীতি পড়ে গেছে, তেমনি বড় বিনিয়োগ, ঋণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে বাজারে ব্যাপক হারে টাকা ছাড়ার কারণে অর্থনীতি দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে দাতা সংস্থাগুলোর শর্ত বাস্তবায়ন, সরকারের ঋণ, সরকারি সংস্থাগুলোর দায়দেনা এবং বিভিন্ন উপকরণের বিপরীতে ঋণের তথ্যে জনগণের সামনে প্রকাশ করা। এ ছাড়া ঋণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ, অর্থ ব্যবহারের সব ধরনের গোপনীয়তা প্রকাশ, ঋণের বিপরীতে নিজস্ব উদ্যোগে জামানত গ্রহণ এবং তার সঠিক ব্যবহার করলেই সরকারের ঋণ গ্রহণ সীমিত থাকবে।

প্রসঙ্গত, করোনার প্রভাব মোকাবেলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে ১২৬ কোটি ডলারের সহযোগিতা করা হয়েছে।


আরো সংবাদ