৩০ মে ২০২০

তারকা হোটেলগুলোর প্রতিদিন লোকসান কোটি টাকা

করোনোর কারণে রাজধানীসহ সারা দেশের হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায় ধস নেমেছে। অতিথি সঙ্কটে লোকসানের বৃত্তে বন্দী এই খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারকা হোটেলগুলো। জানা গেছে, অবস্থানভেদে হোটেলগুলো প্রতিদিন ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা লোকসান গুনছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় হোটেল মালিকরা। তারা সরকারের সহযোগিতার দাবি জানিয়ে বলেছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ ব্যবসায় টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেলগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যবসায়িক কারণে যেসব বিদেশী বাংলাদেশ ভ্রমণ করে থাকেন, তাদের বড় একটি অংশ পোশাক খাতের ক্রেতা। কারখানাগুলোয় আসন্ন গ্রীষ্মের পোশাকের অর্ডার দিতে এ সময় আসা-যাওয়া করেন তারা। এ জন্য বছরের শুরুতেই হোটেলগুলোয় মার্চ পর্যন্ত ৭০-৮০ শতাংশ অতিথি কক্ষ আগাম বুকিং দেয়া ছিল। বিশেষ কিছু দিনে কোনো কোনো হোটেলে কোনো কক্ষই ফাঁকা ছিল না। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস ইস্যুতে শেষ মুহূর্তে সব বুকিং বাতিল হয়ে যায়।

তারা জানান, অতিথি আগমন ছাড়াও এসব হোটেলের রাজস্ব আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো ভেনু হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেলা-প্রদর্শনী আয়োজন। কিন্তু একই কারণে এসব প্রদর্শনীও বাতিল হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ব্যবসা এখন বন্ধ বললেনই চলে।

ঢাকার বিভিন্ন তারকা হোটেলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই করোনার কারণে অতিথি খরা শুরু হয়। তবে ১৭ মার্চ মুজিববর্ষের আয়োজন ঘিরে বিদেশী প্রচুর নাগরিকের বুকিং ছিল হোটেলগুলোতে। তবে সেটি বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
হোটেল মালিকদের দাবি, অতিথি না থাকায় অনেক হোটেল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

তারা জানান, মহামারী করোনার কারণে ফেব্রুয়ারি থেকেই অতিথি কমতে থাকে হোটেলগুলোতে। গত ১৪ মার্চ দেশে করোনা রোগী শনাক্তের পর সব ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার পর অবস্থা প্রকট আকার ধারণ করে। লোকসান সামাল দিতে ইতোমধ্যে ছোট হোটেলগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। তারকা হোটেলগুলো তাদের ৭০ শতাংশ কর্মকর্তা কর্মচারীকে ছুটিতে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে গত দুই মাসে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মোহসিন হক হিমেল জানান, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি কি দাড়ায় তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা। গ্যাস পানি ও বিদ্যুত বিল ডিসেম্বর পর্যন্ত মওকূপে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরকার সহযোগিতা না করলে হোটেল ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

পাঁচ তারকা বিভিন্ন হোটেলের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর ৪৫টি বিভিন্ন তারকা হোটেলের মধ্যে বর্তমানে প্রায় প্রতিটি হোটেলই অতিথি শূন্য। হোটেলগুলোতে এখন অতিথি নেই। যারাই আছেন তারা হোটেলে অনেক দিন ধরে প্রায় স্থায়ীভাবে আছেন। নতুন তেমন কোনো অতিথি নেই। হোটেলের স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী হোটেল খোলা রাখতে হচ্ছে। এর ফলে ইউটিলিটি, সার্ভিস চার্জ কর্মচারী বেতনসহ প্রতিদিন ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা লোকসান গুনছে হচ্ছে তাদের।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রণোদনা, বিদ্যুৎ বিল মওকুফ এবং স্যালারি অন ট্যাক্সও বাতিলের প্রস্তাব করেছে হোটেল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিহা)। এ প্রসঙ্গে বিহা সচিব মোহসিন হক হিমেল বলেন, ইতোমধ্যেই আমারা ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে সরকারের কাছে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছি। আশা করছি সরকার আমাদের আর্জি মানবে।

তিনি আরো বলেন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে করোনা প্রভাবের কারণে হোটেল ব্যবসায় ক্ষতি শুরু হয়। এই দুই মাসে হোটেল মোটেল খাতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আর প্রতিদিনই ক্ষতির অঙ্ক বাড়ছে।

তারকা হোটেলগুলোর ব্যবসার ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাধারণত স্বাভাবিক সময়ে মাসে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। কিন্তু সেটি এখন কমে নেমে এসেছে পাঁচ কোটির ঘরে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিদেশী কিছু বিশেষজ্ঞের অবস্থানের কারণে কিছুটা ব্যবসা হচ্ছে।

অন্য দিকে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি জানান, ‘অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি এ সময়টা বাংলাদেশে পর্যটন মৌসুম। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর পুরো মৌসুমটি কেটেছে পর্যটক খরায়। আমাদের সদস্যদের কাছে যেসব বুকিং ছিল, সেগুলোর শতভাগই বাতিল হয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে করোনার যে প্রভাব, তাতে আগামী মৌসুমেও পর্যটক পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান।’

তিনি বলেন, ‘আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে টোয়াবের উদ্যোগে একটি পর্যটন মেলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সেই আয়োজন আমাদের স্থগিত করতে হয়েছে।’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পাঁচতারকা হোটেল ১৭টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ৯টি, কক্সবাজারে চারটি, চট্টগ্রাম, যশোর, বগুড়া ও মৌলভীবাজারে একটি করে। আর চার তারকা হোটেল আছে চারটি। যার দু’টি ঢাকায়, দু’টি চট্টগ্রামে।


আরো সংবাদ