২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
৫ মাসে রফতানি কমেছে ৭.৭৪ শতাংশ; মূল সমস্যা নিম্নমুখী দর ও রফতানি আদেশ

পোশাক রফতানির উল্টোযাত্রা

পোশাক রফতানির উল্টোযাত্রা - ছবি : সংগৃহীত

তৈরী পোশাক রফতানি উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করেছে। টানা চার মাস ধারাবাহিকভাবে কমছে পোশাক রফতানি। নভেম্বরে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ, অক্টোবরে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে যায় পোশাক রফতানি। এই খাতটির এমন নেতিবাচক প্রবণতায় হতবাক তৈরী পোশাক এবং এর ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ডে শত শত শিল্পের সাথে যুক্ত লাখ লাখ লোক। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রণোদনার অভাব, অবকাঠামোগত সমস্যা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন না করা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে রফতানি বাণিজ্যে এমন দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস প্রতি বছরই রফতানি প্রবৃদ্ধি ভালো থাকে। গত ১০ বছর ধরে প্রতি অর্থবছরেই প্রথম পাঁচ মাসে গড়ে ৬ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। এবারই প্রথম দেখা গেছে নেতিবাচক চিত্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) তৈরী পোশাক খাতে এক হাজার ৩০৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আয় হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ কম। গত বছর একই সময়ে এই খাতে আয় হয়েছিল এক হাজার ৪১৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আলোচিত সময়ে ওভেন পোশাকে রফতানি আয় কমেছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আর নিট পোশাকে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্য দিকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই দুই খাতে আয় কমেছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ২০ ও ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রফতানিচিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয়ে তৈরী পোশাকের অবদান প্রায় ৮৩ শতাংশ। তবে হোমটেক্স, টেরিটাওয়েলসহ এ খাতে রফতানির অন্যান্য উপখাত হিসাব করলে তৈরী পোশাক খাতের অবদান ৮৫ শতাংশে দাঁড়াবে। পোশাক রফতানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পুরো রফতানিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি খাতে আয় কমেছে সাড়ে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্য দিকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমেছে রফতানি আয়।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, রফতানিতে নেতিবাচক চিত্রের প্রধান কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার অতিমূল্যায়ন। তারা জানান, প্রতিযোগী দেশগুলো ডলারের বিপরীতে নিজেদের মুদ্রা অবমূল্যায়ন করেছে। এতে তাদের মূল্য সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে অনেক ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে না এসে প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। ক্রয়াদেশ ঘাটতিতে পণ্য রফতানি, বিশেষ করে তৈরী পোশাক রফতানি কমছে। আগামী কয়েক মাসও ক্রয়াদেশ কম থাকবে আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা বলেন, ক্রয়াদেশের বেশি অংশ পাচ্ছে ভিয়েতনাম। এ ছাড়া পাকিস্তান এবং ভারতেও ক্রয়াদেশ সরে যাচ্ছে। সবগুলো দেশই এ খাতের রফতানিতে প্রণোদনা ও বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল। বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্স, পৌরকর এবং বন্দর খরচ। কিন্তু পণ্যের দাম সে তুলনায় বাড়েনি, উল্টো কমেছে। কমেছে রফতানির পরিমাণও। অসম এবং অনৈতিক প্রতিযোগিতায় রফতানিমূল্যও প্রতিনিয়ত কমছে। এসব কারণে রফতানি বাণিজ্যে ৮৪ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী সম্ভাবনাময় তৈরী পোশাক শিল্প খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন কারখানা। গত পাঁচ বছরে বন্ধ হয়েছে অন্তত ১৩০০ কারখানা। বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাই এবং অসন্তোষ। স্বল্পসংখ্যক বড় কারখানার কথা বাদ দিলে অধিকাংশ কারখানার জন্য কোনো সুসংবাদ নেই আগামী দিনের রফতানি আদেশে।

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, আমরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছি। গত চার বছরে ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের মুদ্রা অবমূল্যায়ন করলেও আমাদের মুদ্রা এখনো শক্তিশালী। নীতিনির্ধারকরা বসে যদি কৌশল নির্ধারণ না করেন, তাহলে খাতটিকে গভীর সমস্যায় পড়তে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য শুধু নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প টিকিয়ে রাখার স্বার্থেও কৌশল নির্ধারণ জরুরি মন্তব্য করে তিনি বলেন, এত বিপুল পরিমাণ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট নিয়ে আমরা কম রফতানির ঝুঁকি নিতে পারি না। তাই আমাদের বিকল্প ও সৃজনশীল সমাধানে আসতে হবে।

বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, দেশের রফতানি আয় তৈরী পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব বাজারে বর্তমানে পোশাকের চাহিদা কম। বছরের শুরু থেকেই অর্ডার কমছে। সাথে পণ্যের মূল্যও কমেছে। এ ছাড়া অবকাঠামোগত সমস্যা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন না করা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে রফতানি বাণিজ্যে চলছে নি¤œগতি। রফতানি বাণিজ্য বাড়াতে প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে তালমিলিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তা না হলে আগামীতে রফতানি আয় আরো কমে যাবে। পাশাপাশি একক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে।

অভিযোগ রয়েছে, পোশাক খাতে রফতানির এমন নেতিবাচক অবস্থার জন্য দায়ী সরকারের একটি সিদ্ধান্ত। চলতি অর্থবছরের বাজেটে পোশাকসহ সবখাতের উৎসে কর ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এতে হোঁচট খায় শিল্প। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত নিজ অবস্থান থেকে ফিরে আসে। এক শতাংশ থেকে কমিয়ে উৎসে কর দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকেই তা কার্যকর করা হয়। যদিও বিজিএমইএ চায়, সুবিধাটি যেন ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়। তৈরী পোশাক খাতের চলমান দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) লেখা এক চিঠিতে বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক এ দাবি জানান। বিজিএমইএর ওই চিঠিতে রফতানি পোশাক খাতের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ রফতানি আয় অর্জনকারী এই শিল্পটি বর্তমানে দেশ-বিদেশে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বর্তমানে পোশাক শিল্প ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অব্যাহত দরপতন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। তাই এই খাতকে সহায়তা দেয়ার অংশ হিসেবে উৎসে কর কমানো হয়েছে।

বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের রফতানি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট রফতানি হয়েছে চার হাজার ৫৩ কোটি ডলারের পণ্য। এই আয় আগের অর্থবছরে রফতানি হওয়া তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ডলারের চেয়ে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। তা ছাড়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ রফতানি বেশি হয়েছে বিদায়ী অর্থবছরে। এ বছর রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশ পোশাক খাত থেকে এসেছে। সব মিলিয়ে বছরটিতে তিন হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের তৈরী পোশাক রফতানি হয়েছে। এই আয় ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। আর বিদায়ী অর্থবছরের পোশাক রফতানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। আবার পোশাক শিল্পের মধ্যে ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে এক হাজার ৭২৪ কোটি ডলারের। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্য দিকে নিট পোশাক রফতানি হয়েছে এক হাজার ৬৮৮ কোটি ডলারের। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ।

সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের সামনে সম্ভাবনা যেমন আছে তেমনি অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। আমরা এখন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে পণ্যের দাম কমাচ্ছি। অনৈতিক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে সবারই ক্ষতি করছি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, পোশাক খাত ৩০ লাখ নারী শ্রমিকের ক্ষমতায়ন করেছে। শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের সাথে যুক্ত ছোট ছোট দর্জি, মুদি দোকানি, ফ্ল্যাক্সি লোডের দোকানদার, লিপিস্টিক বিক্রেতা, লেইস ফিতার হকার থেকে শুরু করে অর্থনীতির অনেক খাতে এর প্রভাব পড়বে। আর আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর তো টিকে আছে পোশাক শিল্পের ওপরই। এ শিল্পের কিছু হলে আর্থিক খাতে চরম দুর্গতি নেমে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


আরো সংবাদ