১২ আগস্ট ২০২০

‘সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকারকারী দাম্ভিক মানুষটিও আজ তার করুণা প্রার্থনা করছে’

-
24tkt

‘কোভিড ১৯ : আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক অনলাইন সেমিনারে বক্তারা বলেন, মহান সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকারকারী দাম্ভিক মানুষটিও আজ সৃষ্টিকর্তার করুণা প্রার্থনা করছে। অণুজীবের আক্রমণে পর্যুদস্ত বিশ্ব মোড়লরা। আজ সর্বশক্তিমানের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিচ্ছে। মহান সৃষ্টিকর্তাকেই তারা শেষ ভরসা হিসেবে মেনে নিচ্ছে। তারা এখন বুঝতে পারছে; সর্বশক্তিমানের করুণা ছাড়া বিপদমুক্তির কোনো পথ নেই।

তা’মীরুল মিল্লাত ট্রাস্ট এই অনলাইন সেমিনারের আয়োজন করে। বাংলাদেশ থেকে তা’মীরুল মিল্লাত ট্রাস্ট্রের সভাপতি প্রফেসর ড. কোরবান আলীর সভাপতিত্বে ও ইউকে থেকে ড. আব্দুস সালাম আজাদীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আলোচনা রাখেন, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান।

অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন, তা‘মীরুল মিল্লাত ট্রাস্টের সেক্রেটারী অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন। এর পর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. নিজাম উদ্দীন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে মাওলানা যাইনুল আবেদীন বলেন, এমন সর্বব্যাপী মহামারি এর আগে পৃথিবীবাসী কখনো দেখেনি। মানব জীবনের সর্ব অঙ্গনে এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে। সঙ্কুচিত হয়েছে জীবন চলার পথ। আর্থ-সামাজিক অঙ্গনে এর প্রভাব যেমন সুদূর প্রসারী, তেমনি ধর্মীয় জীবনের স্বাভাবিক গতিও বাধাগ্রস্থ হয়েছে। এ বিপদ নিঃসন্দেহে কারোর জন্য শাস্তি, আবার কারোর জন্য পরীক্ষা। বহু যুগ পরে এবার সীমিত পরিসরে হজ্জের আয়োজন করতে হচ্ছে। বিপর্যস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি সমূহ ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। এহেন প্রেক্ষাপটে প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান তা‘মীরুল মিল্লাত ট্রাস্ট জাতিকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য বহমান পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে বিজ্ঞজনের পরামর্শ নিতে এই সেমিনারের আয়োজন করেছে।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসজনিত প্রভাবে গোটা দুনিয়ায় মানব জীবনে যে অচলাবস্থা ও দূরবস্থা তৈরি হয়েছে তা থেকে নিস্তার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ এ যাবত প্রায় সোয়া কোটি মানুষ আক্রান্ত হওয়া, প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ মৃত্যু বরণ করার চেয়ে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনাকালীন সময়ের চেয়ে করোনা পরবর্তী সময়ে মানুষের জীবনে এর প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী; যার আলামত ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তাই এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমাদের এই বিশ্বাসকে অটুট করতে হবে যে, তার সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে আমাদের উপর এ মুসিবত আপতিত হওয়ার ছিলো না। আবার তার ইচ্ছা ছাড়া এ বিপদ কাটবেও না। তাই সর্বাবস্থায় আমাদেরকে তার প্রতি অনুগামী হতে হবে। আমাদের সকল অভাব দূরিকরণে তার কাছেই আমাদেরকে হাত পাততে হবে। আপতিত এ বিপদে আমাদের সবরের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। যখনি যতটুকুন নেয়ামাত নিয়ে আমরা জীবন কাটানোর সুযোগ পাবো, সে জন্য আমাদেরকে আল্লাহর শোকর করতে হবে। সবর ও শোকরের সমন্বিত জিন্দেগীই প্রকৃত মুমিনের জিন্দেগী। হাদীসে রাসুলে (স.)এমন বার্তাই আমাদের জন্য রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পরিকল্পিত জীবনাচার, মানবিক শিষ্টাচার, ইসলামী শরীয়ত বিরুদ্ধ নয় এমন সব চিকিৎসা নির্দেশনা অনুসরণের ও পরিপালনের পাশাপাশি আমাদেরকে কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালার উপরই নির্ভর করে তার বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। এটাই তাকওয়ার জিন্দেগীর দাবি। জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনে যে অচলাবস্থা, শিক্ষাঙ্গনে যে অনিশ্চয়তা তা থেকে উত্তোরণের জন্য সম্ভাব্য সকল বৈধ সুযোগ ব্যবহার করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। এ দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট কাটিয়ে একটি দেশের সরকারের যেমন স্বচ্ছতার সাথে পরিকল্পিত উপায়ে সাহসী সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি জনগণকেও বিদ্যমান সামর্থকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। সর্বাবস্থায় আমাদেরকে আরো বেশি মানবিক হতে হবে। মানবতার এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সামর্থবান সবাইকে দু’হাত প্রসারিত রাখতে হবে।

মূল প্রবন্ধে প্রফেসর ড. মোঃ নিজাম উদ্দীন বলেন, কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস নামের এক সংক্রমক ব্যাধির শঙ্কায় আতঙ্কিত সবাই। এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা সর্বত্রই আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে নিত্যদিন পার করছে প্রতিটি জনপদ। সমগ্র পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোও আজ অসহায় এই অণুজীবের কাছে। উন্নতির চরম উৎকর্ষের দাবিদার চিকিৎসাবিজ্ঞান মুখ থুবড়ে পড়েছে এই সংক্রামক ব্যাধির সামনে। ভেঙে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা আর ধ্বংস প্রায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। নীরব নিস্তব্ধ হয়ে এক ভয়ার্ত পরিবেশ বিরাজ করছে সমগ্র বিশ্বের জনবহুল সব বিপণিবিতান, বিনোদনকেন্দ্র আর অবকাশযাপন স্থাপনাগুলোতে। সর্বত্রই একচ্ছত্র ক্ষমতার আঁধার আল্লাহর তা‘আলার দাপট। সারা জীবন মহান সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকারকারী দাম্ভিক মানুষটিও আজ নীরবে সেই মহান সৃষ্টিকর্তাকে বিপদমুক্তির শেষ ভরসা জ্ঞান করে মিনতিভরে মুক্তি প্রার্থনা করছে। শহরের পর শহরজুড়ে বিরাজ করছে এক ভূতুড়ে পরিবেশ। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা সব কিছুতেই সুনসান ভৌতিক নীরবতা। করোনার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ধনী-গরিব, জালিম-মাজলুম, মুসলিম-অমুসলিম কেউই। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের প্রভাবে পুরো বিশ্ব আজ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় সঙ্কটে জর্জরিত। সামাজিক বন্ধন, এমনকি পারিবারিক বন্ধনেও পরিলক্ষিত হচ্ছে একধরনের বিপরীতমুখী আচরণ। কেউ কারো কাছে ঘেঁষতে সাহস পাচ্ছে না। এখন আর কাছে আসার গল্প শোনা যায় না। এখন গুঞ্জরিত হচ্ছে দূরে যাওয়ার পাঁজরভাঙা আর্তনাদ।

আলোচ্য প্রবন্ধে তিনি কোভিড-১৯ এর প্রভাবে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কিত সাতটি বিষয়ের ওপর বিস্তর আলোচনা উপস্থাপন করেন। আলোচনার প্রথমেই তিনি মহামারীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেন। এরপর একে একে কোভিড ১৯ বা করোনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, করোনা ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, করোনায় বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিস্থিতি, কোভিড ১৯ এর অর্থনৈতিক প্রভাব, কোভিড ১৯ এর সামাজিক প্রভাব এবং কোভিড ১৯ এর ধর্মীয় প্রভাব বিষয়ে সুবিস্তর আলোচনা রাখেন।

সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান, মাওলানা মুহাম্মাদ লুৎফুর রহমান, ড. মুহাম্মাদ নূরুল্লাহ, প্রফেসর ড. কামরুল হাসান, অধ্যাপক ড. শফীউল আলম ভুঁইয়া, মুফতী মাওলানা মিজানুর রহমান, মাওলানা মো: মিজানুর রহমান, ড. মুফতী আবূ ইউসুফ খান প্রমুখ।


আরো সংবাদ