০৩ জুন ২০২০

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কম দামের ও বিনামূল্যের পণ্য

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কম দামের ও বিনামূল্যের পণ্য - সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকায় অপেক্ষাকৃত কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী বিক্রি করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বিলি করো হচ্ছে শুকনো খাবার। সঙ্গত কারণেই জীবনের তাগিদে দ্ররিদ্র মানুষগুলো দলে দলে এসব স্থানে ভিড় করছেন। তাদের বেশির ভাগেরই শরীরেই সুরক্ষাসামগ্রী নেই। বিপর্যয় এড়াতে ঘরে থাকার নির্দেশনা তো নয়ই; প্রয়োজনীয় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ক্ষেত্রেও চরম উদাসিন তারা। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ জাতীয় অবহেলা বা খামখেয়ালির কারণে চরম মূল্য দিতে হতে পারে পুরো জাতিকেই। এ কারণে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষও।

আতঙ্কের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সবুজবাগের ব্যবসায়ী জাফর ইকবাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বিশ্বব্যাপী চলমান বিপর্যয় এড়াতে আমি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে বাসায় বসে আছি, কোয়ারেন্টিন করছি। অথচ যে মহিলাটি আমার বাসায় ছুটা কাজ করে, সে এক বেলায় আমার বাসায় আসছে আর অন্য বেলায় রাস্তায় রাস্তায় ত্রাণ খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার শরীরে ভাইরাস না থাকলেও বিভিন্ন মানুষের সাথে মেলামেশার কারণে তার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর স্বাভাবিক কারণেই বাইরে না গিয়েও আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জাফর ইকবালকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি তো সামর্থবান। আপনার বুয়ার আর্থিক চাহিদা পূরণ করার জন্য তো আপনিই যথেষ্ট। তাকে এক বেলা ত্রাণ কুড়াতে যেতে হচ্ছে কেন? জবাবে তিনি বলেন, পৃথিবীর সব গরিব মানুষের স্বভাবই গরিব। তারা আজীবন গরিবই থাকতে চায়। এদের সারা দুনিয়ার সব দিয়েও সন্তুষ্ট করা যাবে না। অভাবে নয়; স্বভাবগত কারণেই তারা রাস্তায় যায়। আমার জানামতে তার ঘরে প্রচুর পরিমাণে খাবার মজুদ আছে। ভিক্ষা করা খাবার বাইরে বিক্রিও করছে। কিন্তু যেতে তাকে হবেই। কারণ এদেশে সবচেয়ে সহজ কাজ ভিক্ষা করা। প্রয়োজনে আমার বাসায় কাজ ছেড়ে দেবে কিন্তু ফ্রি পাওয়া যায় এমন কোনো সুযোগই তারা ছাড়বে না।

টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির জানান, ঢাকায় ৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছে সংস্থাটি। ঢাকার বাইরে রয়েছে আরো ৩০০টি ট্রাক। এসব ট্রাকে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করা হচ্ছে ৫০ টাকা দরে। মসুর ডালও বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। এ ছাড়া সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৮০ টাকা, প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩৫ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। স্বল্প আয়ের মানুষ বাজারদরের চেয়ে কিছুটা কমে এসব পণ্য পেয়ে খুশি বলে জানান তিনি। কম দামে পণ্য কিনতে এসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষ যাতে সমাগম করে পণ্য সংগ্রহ না করে সে জন্য তিন ফুট দূরত্বে বৃত্ত করে দেয়া হচ্ছে। এতে স্থানীয় প্রশাসন সহায়তা করছে। আর ঢাকায় পরিবেশকদের বলে দেয়া হয়েছে, তারা যেন ক্রেতাদের লাইনের দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করে।
সরেজমিন রাজধানী ঢাকার কয়েকটি বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ট্রাকের সামনে ক্রেতাদের প্রচণ্ড ভিড়। ভিড়ের কারণে দূরত্ব নিশ্চিত করা দূরের কথা, ক্রেতাদের লাইনে রাখতেই হিমসিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে দূরত্ব রক্ষা করার কোনো প্রচেষ্টাই চোখে পড়েনি। বরং যে যার মতো করে পণ্য কিনছেন। এদের অনেকে কম দামে কেনা পণ্য নিজ নিজ মহল্লায় নিয়ে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, টিসিবির ট্রাকে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করা হচ্ছে ৮০ টাকায়। মহল্লার মুদি দোকানে একই তেল বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকাদরে। দোকানে এক কেজি মসুর ডাল ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও টিসিবি বিক্রি করছে ৫০ টাকা দরে। দাম কম থাকায় নগরীর কর্মহীন নিম্নবিত্ত অনেক নারী-পুরুষ টিসিবির পণ্য কিনে বাইরে বিক্রি করার কাজে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার অনেকে পারিবারিক প্রয়োজনেই লাইন ধরে টিসিবির পণ্য কিনছেন বলে জানান। এ দিকে করোনাজনিত সাধারণ ছুটির কারণে বেকার হয়ে পড়া নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য খাদ্যসাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। কিন্তু এসব খাদ্যপণ্য বিতরণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা পড়ছেন মহাবিপদে। সাহায্যবোঝাই গাড়ি নিয়ে কোনো এলাকায় থামতে দেখলেই মুহূর্তে জমায়েত হয়ে যাচ্ছে শত শত মানুষ। বিশৃঙ্খলা এবং হুড়োহুড়ির কারণে কেউ তিনবার নিতে পারছেন, আবার কেউ একবারও না। এসব ঘটনায় ত্রাণবাহী গাড়ির ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এ দিকে নগরবাসীকে করোনার আঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে গতকাল থেকে পণ্য বিক্রির পাশাপাশি ক্রেতাদের বিনামূল্যে মাস্ক দিচ্ছে টিসিবি। আজ বা আগামীকাল থেকে ঢাকার বাইরেও মাস্ক বিতরণ শুরু হবে। সংস্থাটির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির জানান, প্রত্যেক ক্রেতাকে একটি করে মাস্ক বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক লাখ মাস্ক দেয়ার কথা জানিয়েছে। আমরা তিন হাজার দিয়ে শুরু করেছি। এর মাধ্যমে দরিদ্র মানুষরা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


আরো সংবাদ