০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

কাটছে না ভিসা সঙ্কট : হতাশায় জার্মানগামী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা

কাটছে না ভিসা সঙ্কট : হতাশায় জার্মানগামী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা - ছবি : সংগ্রহ

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের অন্যতম শিক্ষাবান্ধব দেশ জার্মানিতে পাড়ি জমিয়ে থাকেন। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম শেষে তারা দেশসেবার মহান ব্রত নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং উদ্ভাবনের আলো নিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখেন।

কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের শুরু থেকে প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে সহস্রাধিক বাংলাদেশী শিক্ষার্থী জার্মানির বিভিন্ন পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়ে ভিসার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। ১৪ থেকে ১৫ মাস অপেক্ষায় থাকার পরও বাংলাদেশস্থ জার্মান দূতাবাস থেকে মিলছে না ভাইবার তারিখ। বার বার জার্মান দূতাবাস থেকে আশ্বাস দিলেও তা রক্ষা করতে পারেনি; যার জন্য অসংখ্য শিক্ষার্থী উদ্বিগ্ন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

সরকারপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে একাধিকবার বৈঠক করার পরও কোনো আশার আলো দেখতে না পেয়ে অপেক্ষমান শিক্ষার্থীরা এর আগে ‘জার্মান ভিসা ও হায়ার স্টাডিজ সল্যুশন ফর বাংলাদেশি স্টুডেন্টস’ ( https://www.facebook.com/groups/196194545331444/?ref=share) গ্রুপের উদ্যোগে কয়েক দফায় সংবাদ সম্মেলন ও মিডিয়ায় সরব হয় শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলনের দাবি নিয়ে।

ভিসার দাবিতে অনলাইন প্রতিবাদের আওতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে #speedupstudentvisa ক্যাম্পেইন। কয়েক দিনের এই টুইটার ক্যাম্পেইনে ইতোমধ্যে ৬৫ হাজারের বেশি টুইট করা হয়েছে। যা টুইটের সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ ট্রেন্ডের অধীনে ক্যাম্পেইনটি প্রথম স্থান দখল করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, কোরিয়া, জাপান এবং অন্যান্য দূতাবাস কোনো সমস্যা ছাড়াই ছাত্র ভিসায় কাজ করছে। এমনকি ভিএফএস গ্লোবাল পুরোপুরি চলছে। এসব দূতাবাসের কোনোটিতেই জার্মান দূতাবাসের মতো গত বছর থেকে হাজারো শিক্ষার্থী সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।

২০২১-২০২২ উইন্টার স্টেশনে ভর্তি হওয়া (মে মাসের ছাত্র-ছাত্রীরা) প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেন। তত দিনে ছাত্র-ছাত্রীরা অনলাইনে দুটি সেমিস্টার শেষ করেছেন, ব্লক মানি (থাকার খরচ) এবং টিউশন ফি পাঠিয়েছেন। এখন তারা ২০২২ সালের মে মাস এসেও তাদের সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পাচ্ছে না এবং ইউনিভার্সিটি থেকে এই সেমিস্টারের মধ্যে ক্যাম্পাসে সরাসরি থাকতে বলা হয়েছে। উপস্থিত হতে না পারলে তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়ে যেতে পারে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে (যেমন ইরান, নাইজেরিয়া) মহামারীর শুরুতে সব জার্মান মিশনই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। ভারতের দিল্লিতে করোনার প্রভাব মাত্রা অতিরিক্ত থাকার পরেও তারা সমস্যা কাটিয়ে ওঠে এবং তাদের সরকার ছাত্র ভিসা দ্রুততর করার জন্য সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে।

পূর্বে বাংলাদেশর জার্মান দূতাবাস করোনার প্রাদুর্ভাবের কথা বললেও বর্তমানে তা বাংলাদেশ অনেকাংশে কমে গেছে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থী ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন করেছে তারপরও দূতাবাস থেকে আশাজনক কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাদের কাজের মান আগের মতো ধীর থেকে আরো ধীরগতি হচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অফ জিগেনের শিক্ষার্থী তামান্না তাহমিন খান জানান, ইতোমধ্যে প্রায় প্রত্যেকেই ব্লক একাউন্টের ১১ লাখ টাকা জমা রেখেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে অনেকেই কয়েক লাখ টাকা টিউশন ফিও জমা দিয়েছে। তাই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ভিসা সাক্ষাৎকার ও ভিসা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় থাকলেও দূতাবাসের হঠাৎ ধীরগতির কারণে (গত দুই মাসে নতুন কোনো ডকুমেন্ট সাবমিশনের মেইল না দেয়ায়) শিক্ষার্থীদের বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

টেকনিশিয়া হোকশুলে ইঙ্গলসস্ট্যাডের ব্যাচেলরের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিলানী হোসেন জানান, আগে দূতাবাস ১২ মাসের ওয়েটিং পিরিয়ডের কথা জানালেও বর্তমানে তা দিন দিন বাড়ছে।

বিটিউ কটবোস ইউনিভার্সিটির মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মনিরা আক্তার জানান, বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটি এখন আর অনলাইনে ক্লাস কিংবা অনলাইনে পরীক্ষা নিতে ইচ্ছুক না। যার ফলে এখন আর অপেক্ষা করার কোনো উপায় নাই শিক্ষার্থীদের কাছে।

টেকনিশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখের ব্যাচেলরের শিক্ষার্থী কে এম খালিদ সাইফুল্লাহ জানান, চলতি সামার সেমিস্টার থেকে ইউনিভার্সিটি সরাসরি ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং পরীক্ষা দিতে না পারলে তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে এবং ক্লাসে অংশগ্রহণ না করার ফলে সঠিকভাবে তাদের মেধা কাজে লাগাতে পারছেন না। কারণ তারা ল্যাব ও ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জার্মানিতে শিক্ষাব্যবস্থা তত্ত্বীয়, ব্যবহারিক ও ইন্টার্নশিপের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। যদিও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বীয় ক্লাস অনলাইনে পরিচালিত হয় এবং ব্যবহারিক ক্লাস ও কর্মশালা ক্যাম্পাসগুলোয় পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।

লাইব্রেরিতে প্রবেশ ও প্রফেসরদের সান্নিধ্যে না থাকার ফলে রিসার্চভিত্তিক অধ্যয়ন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র ভিসা জটিলতার কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় মেধাবী শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা এখনো দৃঢ়ভাবে সরকার ও জার্মান দূতাবাসের ওপর বিশ্বাস করে সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।


আরো সংবাদ


premium cement