১৩ মে ২০২১
`

বিজেপির নির্বাচনী গানে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ছবি

বিজেপির নির্বাচনী গানে বাংলাদেশে হিন্দু কিশোরীকে ধর্ষণ ও ইসলামপন্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ছবি - ছবি- সংগৃহীত

ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য বিজেপি একটি গানের ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশে এক হিন্দু কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনা, বাংলাদেশের টিভি থেকে নেয়া- ইসলামপন্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ইসলাম বিদ্বেষ ও ধর্মীয় উস্কানি দেয়া হয়েছে খুব পরিকল্পিতভাবে। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

সম্প্রতি কলকাতার কিছু নামকরা গায়ক-অভিনেতা বিজেপির চিন্তাভাবনার বিরোধিতা করে একটি গানের ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। মনে করা হচ্ছে, বিজেপির প্রকাশিত ভিডিওটি তারই পাল্টা উদ্যোগ।

বিজেপি বলছে, তারা ’৪৭-এর দেশভাগ থেকে শুরু করে ইসলামপন্থীদের কার্যকলাপ মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের। এজন্য বাংলাদেশের কয়েকটি ঘটনার প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের অনেকে মনে করছেন প্রতিবেশী দেশের নির্বাচনে বিতর্কিতভাবে বাংলাদেশের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

ভারতে নরেন্দ মোদি ও অমিত শাহদের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল। পশ্চিমবঙ্গে তাদের নির্বাচনী প্রচারের অঙ্গ হিসেবে বুধবার যে গানের ভিডিও প্রকাশ করেছে, এর শুরুতেই আছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও গায়ক বাবুল সুপ্রিয়। তিনি কলকাতার একটি কেন্দ্র থেকে এবারের ভোটে লড়ছেন।

আরো বেশ কয়েকজন অভিনেতাকে দেখা যাচ্ছে ভিডিওটিতে। তারাও বিজেপি থেকে প্রার্থী।

ভিডিওটি দেখতে দেখতে যেটা চোখে পড়ছে, তা হলো বাংলাদেশের এক হিন্দু কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ছবিও রয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপরে হামলাসংক্রান্ত খবরের কাগজের কাটিং দেখানো হয়েছে বিজেপির নির্বাচনী গানের ভিডিওতে।

তুলে আনা হয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে আরব গেরিলাদের প্রসঙ্গ, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর একটি পতাকার ছবিও। ভিডিওতে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের একটি টিভি স্টেশনের লোগোসহ ছবিও ব্যবহার করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, যেসব ছবি ব্যবহার বা ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করা হয়নি। তার ভাষ্য, ‘ওই ভিডিওতে কিন্তু বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কিছু নেই। ভারত বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খুবই ভালো। আমাদের অবস্থান একটা নির্দিষ্ট মানসিকতার বিরুদ্ধে। আমরা চাই না, জামাতি চিন্তাধারা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে লালিত পালিত হোক। সীমান্তের ওদিক থেকে কিছু মানুষ যে ধরনের মগজ ধোলাই চালাচ্ছেন, আমরা ওই মানসিকতার বিরোধী।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা এই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বসেই তো হয়েছিল। খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণ তো ওই চক্রান্তেরই অংশ ছিল। এসব তো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও তো এসব উগ্রবাদীরা সক্রিয়। উত্তর আর দক্ষিণ ২৪ পরগণায় একটা গান খুব শোনা যায়, এগিয়ে চলো এগিয়ে চলো; ঝাঁপিয়ে পড়ো ঝাঁপিয়ে পড়ো, বাংলাদেশে ঝাঁপিয়ে পড়ো; শেখ হাসিনার গলায় দড়ি টানো, শেখ হাসিনাকে ফাঁসিতে তোলো। এ ধরনের গান যারা গায়, আমরা তাদের বিরুদ্ধে।’

সামাজিক মাধ্যমে এই ভিডিওটি চোখে পড়েছে বাংলাদেশের অনেক মানুষের। তারা বলছেন, হিন্দুদের ওপরে নির্যাতন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এতে সরকার নিজের মতো করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ সব ঘটনাপ্রবাহ কেন প্রতিবেশী দেশের একটি রাজ্যের নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে? এটাকে জাতিগত বিভেদ উস্কে দেয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন বাংলাদেশের কেউ কেউ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজীব নন্দী ভারতের রাজনীতির ওপরে নিয়মিত নজর রাখেন। তিনিও দেখেছেন ভিডিওটি। রাজীব নন্দী বলেন, ‘গানটি পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনের দৃষ্টি থেকে বেশ আপত্তিকর। পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত এই গানের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাংলাদেশের কিছু ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে খুব সচেতনভাবে। ওই সব ছবি ও ভিডিওর সাথে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। একটা উদ্দেশ্য নিয়ে খণ্ডিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে গানটিতে।’

তার প্রশ্ন, ‘পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের জনজীবনের সমস্যার চাইতেও পাশের দেশের ইসলাম ফোবিয়াই (বিদ্বেষ) কি বিজেপির কাছে বেশি প্রাধান্য পেল?’

রাজীব নন্দী বলেন, ‘দেখুন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপরে সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িক হামলাকে আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু হামলার খবর আরেকটি দেশের ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলের রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহৃত হলে এতে আমার আপত্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়।’

বিজেপির ওই গানের ভিডিওটিতে ইতিহাসচর্চা বা হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের প্রসঙ্গ ও ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের মতো এমন বেশ কিছু প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো তুলে ধরা হয়েছিল কিছু দিন আগে প্রকাশিত আরেকটি গানের ভিডিওতে। ওই ভিডিওটিতে এমন কয়েকজন শিল্পী, অভিনেতা ও গায়ককে দেখা গেছে, যারা সরাসরি বিজেপির রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিরোধিতা করেন। মনে করা হচ্ছে, ওই ভিডিওটির পাল্টা হিসেবেই বিজেপি তাদের সাম্প্রতিক ভিডিওটি তৈরি করেছে।

বিজেপিবিরোধী ওই ভিডিওতে অংশ নিয়েছেন অভিনেতা কৌশিক সেন। তিনি বলেন, ‘বিজেপি যে গানটা প্রকাশ করেছে, তার বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে একটা কথা বলি, এটা ভীষণ খারাপভাবে নির্মিত হয়েছে।’ তার ভাষায়, মনে হচ্ছে যেন আমাদের গানটার পাল্টা একটা কিছু করতে হবে বলে তাড়াহুড়ো করে যা হোক একটা কিছু করে দিয়েছে। এবারে যদি বিষয়বস্তুতে আসা যায়, তাহলে সেখানেও বলতে গেলে কিছুই নেই। শুধুমাত্র বাংলাদেশের কিছু ঘটনাবলী তুলে এনে মুসলিম-বিদ্বেষটাকে উস্কিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে।’

অভিনেতা কৌশিক সেন বলেন, ‘আমার তো মনে হয় এই বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের নজরে আনা উচিত। কারণ ভোটের মধ্যে এ ধরনের প্রচার তো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে যথেষ্ট হানিকর।’

বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য বুদ্ধিজীবীদের প্রকাশিত গানের ভিডিওটি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, এ ধরনের বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদগুলো হয় খুব বাছাই করা। তারাই আসলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে একটা ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করেন।

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ