০৯ মে ২০২১
`

ভারত চায় কানেকটিভিটি ঢাকার গুরুত্ব তিস্তায়

নরেন্দ্র মোদি কাল আসছেন
শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি - ফাইল ছবি

চুক্তি হোক বা না হোক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ঢাকা সফরে তিস্তার পানিবণ্টনই বাংলাদেশের অগ্রাধিকারে থাকবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তাই তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনকে আলোচ্যসূচির শীর্ষে রেখেছে বাংলাদেশ। অন্য দিকে বাংলাদেশের সাথে কানেকটিভিটি বাড়ানোর জন্য নেয়া উদ্যোগগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেবে ভারত।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামীকাল শুক্রবার দু’দিনের সফরে ঢাকা আসছেন। এই সফরকে নিরাপদ, আনন্দময় ও সফল করে তুলতে দুই দেশই সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোদির সফরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অবদান ও ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে আশুগঞ্জে সমাধিসৌধ উদ্বোধন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথগ্রহণের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর (বৈদ্যনাথতলা) থেকে নদীয়া হয়ে কলকাতা পর্যন্ত চলে যাওয়া ‘স্বাধীনতা সড়ক’ উদ্বোধন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী অহিংস আন্দোলনের নেতা এম কে গান্ধীর স্মরণে বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন এবং বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ঢাকা-জলপাইগুড়ি যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস উদ্বোধন করা হবে। এ ছাড়া দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যৌথ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হবে, উন্মোচন করা হবে স্মারক ডাকটিকিট। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ের এই সফরে দুই দেশের অগ্রাধিকারে থাকা ইস্যুগুলোর অগ্রগতির ওপরও গুরুত্ব দেয়া হবে।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তিস্তা বাংলাদেশের জন্য এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা ভারতের সাথে আলোচনায় সব সময়ই তোলা হয়। আর যত দিন পর্যন্ত এর সমাধান না হচ্ছে, তত দিনই তোলা হবে। এবারো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচ্যসূচির শীর্ষে এই ইস্যুটি রাখা হয়েছে।

গত ১৬ মার্চ দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত পানিসম্পদ সচিব পর্যায়ের বৈঠকে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনের পাশাপাশি তিস্তা ইস্যুটি তোলা হয়েছিল। বৈঠক শেষে ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দরে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ঢাকা সফরে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি হচ্ছে না। তবে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচনের পরে পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের আশ্বাস দিয়েছে ভারত। তবে পশ্চিমবঙ্গ নির্র্বাচনের পরও তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুর সমাধান কতটা হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি যদি রাজ্যের ক্ষমতায় আসতেও পারে, তারপরও মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। তাই নির্বাচনে হারলে তিস্তা নিয়ে মমতার মনোভাব কতটা পাল্টাবে তা সময়ই বলতে পারে। বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারণায় মমতা জোর গলায় বলছেন, তিস্তা রাজ্যের হিস্যা।

২০১১ সালে ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালেই তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে শেষ মুহূর্তে তা হয়নি। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ার সম্মতিপত্র সই থেকে বিরত থাকে বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসসহ বিজেপি সরকার বাংলাদেশকে জানিয়েছে, ভারতে পানিসম্পদের ওপর রাজ্যের কর্তৃত্ব রয়েছে, যার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই এ ক্ষেত্রে রাজ্যকে সাথে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে তিস্তা ছাড়া মনু, ধরলা, গোমতি, খোয়াই, দুধকুমার ও মুহুরি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। এই নদীগুলোর পানিপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের প্রায় ৮০ শতাংশই ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানান।

এ দিকে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ বা কানেকটিভিটিকেই যে ভারত বড় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে, তা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রস্তুতি নিতে গত ৪ মার্চ ঢাকা এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের সাথে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জয়শঙ্কর বলেন, ভারত-বাংলাদেশ পঞ্চাশ বছরের সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কানেকটিভিটিকে বড় পরিসরে গুরুত্ব দেয়া দরকার। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে আমরা একসাথে কাজ করছি না। যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন ৫০ বছর পার হয়ে গেছে এবং পরের ২০ বছর কী করা যেতে পারে? আমি বলব কানেকটিভিটি।
ড. আব্দুল মোমেনের সাথে আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে কানেকটিভিটি ইস্যুটি ছিল বলে উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কানেকটিভিটি হচ্ছে উৎপাদনশীলতা। যদি আমরা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কানেকটিভিটি ঠিক রাখতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ভারত ও বাংলাদেশ যদি কানেকটিভিটির জায়গায় ঠিকমতো কাজ করতে পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলই বদলে যাবে। বঙ্গোপসাগরীয় এলাকাকে তখন অন্যরকম মনে হবে।

২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের সময় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। বন্দর ব্যবহারের এসওপি ২০১৯ সালে চূড়ান্ত হয়। গত ৯ মার্চ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি ফেনী নদীর ওপর সেতু উদ্বোধন করেন, যার নাম দেয়া হয়েছে মৈত্রী সেতু। এক দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি খাগড়াছড়ির রামগড়ের সাথে ত্রিপুরার সাবরুমকে সংযুক্ত করেছে।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে ভূমিবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সমুদ্রপথে আমদানি-রফতানির জন্য বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে চাচ্ছে। বর্তমানে এই রাজ্যগুলোকে অনেক ঘুরপথে এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল পাড়ি দিয়ে কলকাতার হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে হয়। সড়কপথে কলকাতা থেকে আসাম হয়ে ত্রিপুরার দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। অথচ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রামগড় হয়ে ত্রিপুরার সাবরুম পৌঁছাতে মাত্র ৭২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু ব্যবহার করে এই রুট চালু হলে ত্রিপুরা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের প্রবেশদ্বারে পরিণত হবে।

এ ব্যাপারে সম্প্রতি বাংলাদেশ কূটনৈতিক সংবাদদাতা সমিতির (ডিকাব) সাথে মতবিনিময়ে ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেছেন, আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি শেষ। এখন আমরা মূলত দু’টি পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করছি। একটি হলো ভারতের পণ্য নিয়মিতভাবে পরিবহনের জন্য এসআরও জারি। অন্যটি হলো ভারতীয় পণ্য পরিবহনের চার্জ নির্ধারণ। এই চার্জ বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ের জন্যই লাভজনক হতে হবে। অর্থ সাশ্রয় করতে না পারলে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন আমরা কেন করব? এই দর নির্ধারণের কাজ এখনো চলছে। তিনি বলেন, ভারত পণ্য পরিবহন করলে বাংলাদেশের বন্দর, ট্রাক, লোকবল ও বীমা কোম্পানির সেবা গ্রহণ করবে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই পণ্য পরিবহনের চার্জ নির্ধারণ করা উচিত। আর তা নির্ধারিত হয়ে গেলে আমরা খুব দ্রুতই কাজ শুরু করব।

এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসআরও জারির ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি পদ্ধতি অবলম্বন করে। তারা প্রতি দুই বছর পর্যালোচনা সভা করে এসআরও জারি করে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে আগামী জুলাইয়ের আগে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত এসআরও জারির সম্ভাবনা নেই। আর ভারতীয় পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাথে টনপ্রতি দুই টাকা হিসাবে চার্জ নেয়ার কথাবার্তা চলছিল। এটা নিয়ে দরকষাকষি চলছে। চার্জ নির্ধারণ চূড়ান্ত হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

কর্মকর্তারা জানান, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেও রামগড়ের দিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। সেখানে কাস্টমস স্টেশন, ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কোনো স্থাপনা নেই। এই সব স্থাপনা নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিয়ে সব কিছু অপারেশনালাইজ করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। অবশ্য উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা এলে এই কাজে গতি সঞ্চার হতে পারে।

র্যাবের নিরাপত্তা তল্লাশি
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, আগামী ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাতক্ষীরা শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে আগমনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন বাটালিয়ন (র্যাব-৬)। র্যাব-৬ এর পক্ষ থেকে বিশেষ তল্লাশি ও টহল শুরু করা হয়েছে।

র্যাব-৬ সাতক্ষীরা অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী পরিচালক মো: জিয়াউল ইসলামের নেতৃত্বে সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়কের আলীপুর চেকপোস্ট ও শ্যামনগরের তিনটি স্থানে এ তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়েছে।



আরো সংবাদ