২৮ অক্টোবর ২০২০

টিকেট, করোনা টেস্ট আর ভিসার মেয়াদ নিয়ে সৌদি প্রবাসীদের নাজেহাল

টিকেট, করোনা টেস্ট আর ভিসার মেয়াদ নিয়ে সৌদি প্রবাসীদের নাজেহাল - ছবি : সংগৃহীত

সৌদি প্রবাসীদের বহুমাত্রিক সমস্যা যেন কাটছেই না। ৩০ তারিখের মধ্যে সৌদি আরবে প্রবেশ করতে হবে এমন ঘোষণার পর থেকে যে সঙ্কটের সূত্রপাত।

শুরুতে ছিল ফ্লাইট ও টিকেট নিয়ে চরম দুর্ভোগ। সে সঙ্কট অনেকের জন্য সমাধান হলেও ফ্লাইট ও টিকেট সীমিত হওয়ায় প্রতিদিন শত শত সৌদি প্রবাসীকে এখনো টিকেটের জন্য রোজ সৌদি এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশ বিমানের কার্যালয়ে ভিড় করতে হচ্ছে।

যাদের টিকেট হয়েছে তারা এখন ধুঁকছেন কোভিড-১৯ পরীক্ষার সনদের জন্য। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ বা শেষ হতে চলেছে তারা বিপাকে পড়েছেন ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে সৌদি আরবের দেয়া পাঁচটি শর্তের কারণে।

এসব শর্তের কথা রোববার অভিবাসীদের জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে মারাত্মক লেজেগোবরে অবস্থা আর তাতে চরম নাজেহাল হচ্ছেন সৌদি প্রবাসীরা।

সৌদি আরবের দেয়া পাঁচটি শর্ত

রোববার ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের সামনে। সেখানে গেলে সৌদি প্রবাসীদের জানানো হয় শুধুমাত্র দূতাবাসের অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হবে।

অনুমোদিত এজেন্সির সংখ্যা ১৮টি এবং সেই তালিকাও তাদের ধরিয়ে দেয়া হয়। সেই সাথে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে পাঁচটি শর্ত সম্বলিত কাগজ। শর্তের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবে নিয়োগকর্তার আনুষ্ঠানিক চিঠি যা সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত হতে হবে।

আরো লাগবে সৌদি আরবের পাসপোর্ট অফিসের অনুমতিপত্রের কপি, রি-এন্ট্রি ভিসার মূল কপি, মেয়াদ সহ নিয়োগপত্রের কপি, সৌদি আরব থেকে বের হওয়ার তারিখ সহ পাসপোর্টের পাতার প্রিন্টের মূল কপি।

যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে কয়েক দিন হাতে রয়েছে এই শর্তগুলো তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে। এসব কাগজ যোগাড় করার ক্ষেত্রে সৌদি আরবে নিয়োগদাতাদের বড় ধরণের ভূমিকা রয়েছে।

রিয়াদে গাড়িচালক মোহাম্মদ খোকন বলছেন, এ মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত তার ভিসার মেয়াদ আর আগামী মাসের ১৮তারিখ তার চাকরির নিয়োগপত্রের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পাসপোর্ট অফিস এসব কার্যালয় থেকে এত অল্প সময়ে তিনি কীভাবে এইসব কাগজ যোগাড় করবেন সেনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোহাম্মদ খোকন বলছেন, ‘আমি আমার কফিলকে (মালিককে) বলছি আমার আকামা (নিয়োগপত্র) রিনিউ করার জন্য। সে আমাকে বলছে, আকামা যে ওয়েবসাইটে গিয়ে রিনিউ করতে হয়, সেটি খোলা যাচ্ছে না। সে আমাকে বলছে ওয়েবসাইট সৌদি সরকার বন্ধ করে রাখছে। আকামার কপি না পাইলে ভিসা করবো কীভাবে?’

‘ভিসা যদি না হয় আমরা প্রবাসীরা কোথায় যাবো? আমাদের কর্মস্থান কোথায়? আমাদের পরিবার চলবে কীভাবে? যদি আমাদের সরকার ওদের সরকারের সাথে না বসে তাহলে কোনদিন সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না,’ মন্তব্য করেন তিনি।

টিকেট পেয়েও যাওয়া হল না
সপ্তাহখানেক ঘুরে সৌদি আরব যাওয়ার টিকেট পেয়েছিলেন কেরানীগঞ্জের নুর ইসলাম। কিন্তু তারপরও তার যাওয়া হল না।

তিনি বলছেন, ‘গত ১৫ তারিখ থেকে আমি ছিলাম এয়ারলাইন্স অফিসের সামনে। প্রতিদিন কেরানীগঞ্জ থেকে আসতাম, আবার সন্ধ্যায় ফিরে যেতাম। এক সপ্তাহ ঘোরার পর গত বৃহস্পতিবার আমি শনিবার সন্ধ্যার টিকেট পেয়েছি। টিকেট দেয়ার সময় ওরা বলেছে যেকোনো হাসপাতাল ক্লিনিক থেকে করোনার টেস্ট করালে হবে। টেস্টের রেজাল্ট নিয়ে যখন বিমানবন্দরে যাই, শেষ মুহূর্তে বলা হল এই রেজাল্ট চলবে না।’

তিনি সহ ৩২ জন শনিবার এভাবে বিমানবন্দর থেকে ফিরে এসেছেন, কারণ তারা সবাই বেসরকারি হাসপাতাল থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করিয়ে সনদ নিয়েছেন। কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন তার গলার স্বরে কাঁপুনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

তিনি প্রশ্ন তুলছেন, সরকারি ব্যবস্থা থেকেই যদি সনদ নিতে হবে তবে তাহলে এমন তথ্য কেন দেয়া হল।

আর বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিলে কেন তা গ্রহণযোগ্য হবে না? সেই প্রশ্নও তারা করেছেন।

শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানেই যে কারণে নমুনা পরীক্ষা
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এ মফিদুর রহমান বলছেন আন্তর্জাতিক নিয়মবিধির কারণে রাষ্ট্রের যোগ্য কর্তৃপক্ষেরই শুধু এই সনদ দেবার যোগ্যতা আছে।

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে নিয়মকানুন আছে তাতে যেকোনো বন্দরে স্বাস্থ্যের বিষয়টি যারা দেখবে তাদের রাষ্ট্রের যোগ্য কোনো কর্তৃপক্ষ হতে হবে। সেটি বাংলাদেশে হেলথ ডিপার্টমেন্ট। আপনারা জানেন যে বাংলাদেশে ভুয়া কোভিড সার্টিফিকেটের কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমাদের দেশের ইমেজের জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে সরকারের অনুমোদিত জায়গা থেকেই এই পরীক্ষা করতে হবে।’

কিন্তু সেই পরীক্ষার জায়গা খুবই সীমিত। কিছু জেলায় সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের প্রবাসীদের জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলেও টিকেটের জন্য সবাই যখন ঢাকায় ছুটেছেন তখন ভিড় বেড়েছে ঢাকার একমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্রটিতে।

সেখানে সৌদি প্রবাসীদের নমুনা সংগ্রহ করে তাদের ফ্লাইটের আগে সনদ দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কারণ তাদের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে পরীক্ষা করে সনদ প্রস্তুত করতে। অন্যদিকে এমন অনেক সৌদি প্রবাসী পাওয়া গেছে যারা মহাখালীর সেই কেন্দ্র থেকে সনদ নিয়ে সরাসরি বিমানবন্দর গেছেন।

টিকেটের জন্য টানা ৭২ ঘণ্টা রাস্তায়
বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স সৌদি আরবে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি না পাওয়ায় শুধু সৌদি এয়ারলাইন্স ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

বিষয়টি আংশিক সুরাহা হয় যখন সৌদি আরব বিমানকে অক্টোবরের এক তারিখ থেকে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেয়।

আংশিক সুরাহা বলা হচ্ছে এই কারণে যে ৩০ তারিখের মধ্যে সৌদি আরবে পৌছাতে প্লেনের টিকেটের জন্য শ্রমিকরা যখন ভিড় করতে থাকেন তখন নতুন টিকেট নয় ফিরতি টিকেট ‘রি-কনফার্ম’ অগ্রাধিকার পাবে বলে জানানো হয়।

গত এক সপ্তাহের মত সময়জুড়ে ঢাকায় দুই এয়ারলাইন্সের বিক্রয় কেন্দ্রের সামনে সৌদি প্রবাসী হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের খবর দেখা যাচ্ছে।

আজও ছিল একই দৃশ্য। সৌদি আরব যাওয়ার টিকেট যেন সোনার হরিণ। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।

কুমিল্লার মকবুল হোসেন বলছেন, ‘প্রতিদিন কুমিল্লা থেকে আসতেছি আর যাচ্ছি। দিন-রাত, বৃষ্টি, রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা সৌদি এয়ারলাইন্সের টিকেট বিক্রয় কেন্দ্র যেখানে অবস্থিত সেই হোটেল সোনারগাঁয়ের বাইরে ছিলাম। টিকেট না পেয়ে আজ (রোববার) বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। একেবারে ক্লান্ত হয়ে গেছি।’

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ