১৫ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১, ৮ মহররম ১৪৪৬
`
বুকার ইন্টারন্যাশনাল জয়ী

গসপদিনভ ও তার উপন্যাস

-

এ বছর আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লাভ করেছেন বুলগেরিয়ার লেখক গিওর্গি গসপদিনভ। বইটির অনুবাদক অ্যাঞ্জেলা রোডেল। গত ২৩ মে লন্ডনে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ‘টাইম শেল্টার’ উপন্যাসের জন্য এ পুরস্কার লাভ করেন গিওর্গি। বুকার পুরস্কার বিশে^র একটি মর্যাদাবান সাহিত্য পুরস্কার। নোবেল পুরস্কারের পরই তার স্থান। বুকারের পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজও একই গুরুত্ব বহন করে। প্রতি বছর বুকার আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার দেয়া হয়। যুক্তরাজ্য বা আয়ারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ইংরেজিতে লেখা বা অনূদিত উপন্যাস এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়। আর এই প্রথম বুলগেরিয়ার কোনো লেখক এ পুরস্কার পেলেন। টাইম শেল্টার বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড (৬২ হাজার ডলার) লেখক ও অনুবাদকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। শর্ট লিস্ট ভুক্ত প্রতিটি বই পেয়েছে ৫ হাজার পাউন্ড। আরো আড়াই হাজার পাউন্ড করে তারা দু’জনও পেয়েছেন। ১৩টি বইয়ের লংলিস্ট থেকে ৬টি বইয়ের শর্ট লিস্ট ঘোষণা করা হয় ১৮ এপ্রিল। সে বইগুলোর পরিচয় খানিকটা দেয়া যাক, যাদেরকে হারিয়ে গিওর্গির বই জিতে নিলো এ পুরস্কার। স্মরণযোগ্য গত বছর এই পুরস্কার জিতেছিলেন ভারতের গীতাঞ্জলি শ্রী। ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার হলো অনূদিত কথাসাহিত্যের জন্য যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার এর আগে হান কাং এবং ওলগা টোকারজুক পেয়েছেন এ পুরস্কার। এ বছর শর্টলিস্টে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার চিওন মিয়ং-কোয়ানের ‘হোয়েল’ (অনুবাদক চিইয়ং কিম), আইভরিকোস্টের লেখক গাউজের ‘স্ট্যান্ডিং হেভি’ (অনুবাদে ফ্রাংক ওয়েন), কাতালান লেখিকা ইভা বান্টসারের ‘বোল্ডার’ (অনুবাদে জুলিয়া সানচেজ), ফরাসি-মেক্সিকান ঔপন্যাসিক গুয়াডালোপে নেটেলের ‘স্টিল বর্ন ’ (অনুবাদে রোজালিন্ড হার্ভে) এবং ফরাসি লেখক মারিসি কন্ডের ‘দি গসপেল একর্ডিং টু দি নিউ ওয়ার্লড’ (অনুবাদে রিচার্ড ফিলকক্স)। মারিসি পুরস্কারের শর্টলিস্টে স্থান পাওয়া সবচেয়ে বয়স্ক লেখক।

২.
কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার গিওর্গি গসপদিনভ ১৯৬৮ সালের ৭ জানুয়ারি বুলগেরিয়ার ইয়াম্বলে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত আধুনিক বুলগেরিয়ান লেখক মনে করা হয়। তার লেখা বই ২৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। টাইম শেল্টার ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হওয়া তার চতুর্থ বই। গিওর্গির লেখকজীবন শুরু হয় কবিতা দিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ‘ন্যাচারাল নভেল’, যা প্রকাশের পরপরই ২১টি ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য ফিজিক্স অব সরো’। ‘অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ নামে একটি ছোটগল্প সঙ্কলনও আছে তার। ‘ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ’ জেতার আগে তিনি পেয়েছেন আরও সতেরোটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে স্ট্রেগা ইউরোপিয়ান প্রাইজ, জান মিশালস্কি প্রাইজ ্ অ্যাংগেলাস অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি।

৩.
আলঝেইমার আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয় এমন একটি ক্লিনিককে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। রোগীদের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে এবং বিগত কয়েক দশকের স্মৃতির জগৎকে অসাধারণ বর্ণনায় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে। বুলগেরিয়ান ভাষায় লেখা ‘টাইম শেল্টার’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাঞ্জেলা রোডেল। রোডেল যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। তবে তিনি বুলগেরিয়াতে থাকেন। তার কবিতা ও গদ্য অনুবাদ অনেক সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বুলগেরিয়ান সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ওই নারীকে ২০১৪ সালে বুলগেরিয়ার নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে।
‘টাইম শেল্টার’ উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস কি রকম তা একটু বলা যাক। এটা লেখকের তৃতীয় উপন্যাস। তিনশো পৃষ্ঠার উপন্যাসটি নিজস্ব ভাষা বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল বলে সমালোচকরা মত দিয়েছেন। ‘টাইম শেল্টার’ সম্পর্কে নোবেলজয়ী ওলগা তোকারজুক বলেন, ‘আমাদের কালদর্শন ও কালযাপন প্রণালি নিয়ে লেখা নিগূঢ়তম সাহিত্যিক সৌন্দর্যের নিদর্শন এটি। রচিত হয়েছে পুরোমাত্রায় অচিন্তনীয় ও নৈপুণ্যনিখুঁত কারুকর্মের সাথে।’ সমালোচক ডেভ এগার্স চিহ্নিত করেছেন ‘ইউরোপের সবচেয়ে মনোরম ও অতুলনীয় উপন্যাসগুলোর একটি’ বলে। এ বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র অগাস্টিন গ্যারিবাল্ডি নামের একজন মনোচিকিৎসক, যার ডাকনাম গস্টিন, যিনি সমসাময়িক বাস্তবতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে ভালোবাসেন। তিনি জীর্ণ পোশাক পরেন। পাঠ করেন পুরোনো সব খবর। ঘুরে বেড়ান বিশ শতকের হারিয়ে-যাওয়া রাস্তাগুলোতে। আলঝেইমার বা স্মৃতিভ্রষ্ট লোকদের চিকিৎসার জন্য তিনি জুরিখে একটি ক্লিনিক খুলেছেন। এর প্রতিটি তলাকে সাজানো হয়েছে পুরোনো একেকটি দশকের বস্তু ও দৃশ্যমালা দিয়ে- যেন বিশেষ সেই দশকগুলো সেই সময়ের অবয়ব নিয়ে উপস্থিত হয়। উত্তম পুরুষে বর্ণিত এর কাহিনী। বর্ণনা করছেন গস্টিনের এক সহকারী । তার কাজ হলো অতীতের সব নিদর্শন, হারানো কালের সব স্মারকচিহ্ন এনে প্রতিটি তলায় জড়ো করা। ষাট দশকের আসবাবপত্র। চল্লিশ দশকে ব্যবহৃত জামার বোতাম, পারফিউম, এমনকি হারানো দিনের বৈকালিক আলোর সঙ্গে দৃশ্যমান সব ছবি ও তাদের রং এবং এ রকমের আরো কিছু। এই চিকিৎসা বেশ সাড়া জাগায়। বর্তমান থেকে পালিয়ে অতীতের ভেতর আশ্রয় নেবার উদ্দেশ্যে ক্রমবর্ধমান হারে সুস্থ লোকেরাও আসতে শুরু করে তার ক্লিনিকে। সমস্ত ইউরোপ জুড়ে এই ‘আদর্শ’ ক্লিনিক স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়। সময়ের অগ্রগতিকে থামিয়ে একটা কল্পিত নিরাপত্তার বেষ্টনীর ভেতর আশ্রিত লোকেরা মানসিক সুখের সন্ধান করে। এদিকে ক্লিনিকে অতীতে আশ্রয়-খোঁজা মানুষের জীবনে নেমে আসে বিমূঢ় বিভ্রান্তি, প্রহেলিকা, যেখানে বর্তমানে এসে হানা দেয় অতীত। ভবিষ্যৎকে স্থগিত করে দেয়ার এই আকাক্সক্ষা ক্রমে বিস্তৃত হলে অতীত ও বর্তমানের সীমারেখা ঝাপসা হতে শুরু করে। ইউরোপের সব জাতি ‘গৌরবময় অতীতের জন্য ভোট’ দেয়ার প্রস্তুতি নেয়। তারা অতীতকে এনে ভবিষ্যতের গর্ভে স্থাপন করতে ব্যগ্র হয়ে ওঠে। একজন সমালোচক বলেন, ‘লেখক এইভাবে পূর্ব ইউরোপ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অতীত ও বর্তমান রাজনীতির বৈশিষ্ট্যকে উপন্যাসের ফর্মে নিজস্ব ভঙ্গিতে তুলে এনেছেন। আঙুল নির্দেশ করেছেন ব্রেক্সিট এবং পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের দিকেও। এই রাজনীতি, চলমান এই কর্মকাণ্ড যেন গড়ে তুলতে চাইছে সময়ের একটা নিখুঁত মানচিত্র, যেখানে কালরেখা অবশেষে একটি আরেকটির সাথে মিলেমিশে যাবে। অবশ্য আদৌ তা যদি ঘটে। কিন্তু শেষাবধি পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। গস্টিন লাপাত্তা হয়ে যায়। উপন্যাসের কথকের নিজেরই স্মৃতি কেমন গোলমেলে হয়ে ওঠে। -পাঠকের মনে তখন এই প্রশ্ন জাগে, গস্টিন নামে আদৌ কি কেউ ছিল, নাকি সে কথকের কল্পনামাত্র? তার ভাষায়, সব মিলিয়ে ‘টাইম শেল্টার’ একটি জটিল, চিন্তামূলক আখ্যান। মাঝে মাঝে তা ভীতি-জাগানিয়াও। এবং এসবের মধ্য দিয়েই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে নিমগ্ন রাখে।’ উপন্যাসটি পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। স্মৃতিভ্রষ্টতা, পলায়ন, কালের গতি নিয়ন্ত্রণ ও তাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা, এবং সম্মুখগতির বদলে অতীতে বসবাসের পরিণতি। কৌতুক-আবহের ভেতর স্মৃতিকাতরতার বর্ণনা দিয়ে উপন্যাস শুরু, তারপর শেষে এসে হাজির অরাজকতা আর গভীর দুর্ভোগ। উপন্যাসটি পাঠশেষে মনে হবে আসলে অতীতকে ফিরিয়ে আনা যায় না। কারণ ভবিষ্যতকে কখনও অতীতের একটা সংস্করণ হিসেবে নির্মাণ করা যায় না। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এক নিবন্ধে গিওর্গি বলেন, ‘আমার সাম্প্রতিকতম উপন্যাসে আমি অতীতের ভূতগুলোর কথা বলেছি। বলেছি ১৯৩৯ সালের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর একটা ঘটনাদৃশ্য দিয়ে আমি শেষ করেছি উপন্যাস।...আমরা কি চিরকাল ১৯৩৯ সালের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে থাকব? এতসব কিছু ঘটে যাবার পরও আমরা কি ফিরে যাব ইতিহাসের সেই বিপজ্জনক সময়টিতে? কেন?’ গিওর্গি মূলত কবি। ফলে তার উপন্যাসও কাব্যাক্রান্ত। তিনিও যুদ্ধবিরোধী, অন্য কবিরা যেমনটা হয়ে থাকেন। ‘টাইম শেল্টার’ তার এই যুদ্ধবিরোধী চিন্তাজাত একটা কিছু। পাঠক কি এখানে নিজেকে খুঁজে পাবেন?


আরো সংবাদ



premium cement