০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`

সফলতার সৌন্দর্য ও জীবনের উন্নতি

-

[ গত সংখ্যার পর ]

সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতার শেষ ছত্রে -
‘বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর,/সবার আমি ছাত্র,/নানান ভাবে নতুন জিনিস, /শিখছি দিবারাত্র;/এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়/পাঠ্য যে-সব পাতায় পাতায়,/শিখছি সে-সব কৌতূহলে/সন্দেহ নাই মাত্র॥’

আত্মবিশ্বাসের চাবিকাঠি হচ্ছে প্রস্তুতি। তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি নিলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ও বড়ো পর্যায়ের সফলতা অর্জন করতে হলে, বড়ো কাজকে/বড়ো পরিকল্পনাকে ভেঙে ছোট ছোট করতে হবে। তারপর ছোট ছোট কাজে সাফল্য লাভের চেষ্টা করতে হবে। ছোট কাজে সফল হওয়া সহজ। এভাবে ছোট ছোট সফলতা মিলে বড়ো সফলতা তৈরি করে।
গন্তব্য ঠিক না করে যেমন কেউ বাসে বা ট্রেনে উঠে না, তেমনি গন্তব্য/লক্ষ্য ঠিক না করে কোনো কাজ শুরু করা উচিত নয়। ছোট বড়ো সকল কাজের শুরুতে আগে লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ শুরু করার অভ্যাস করতে হবে।
অভ্যাস : সাধারণভাবে একজন মানুষ সারাদিন যা কাজ করে তার ৪০ শতাংশ হলো অভ্যাস। চীনা প্রবাদে রয়েছে, ‘অভ্যাস প্রথমে মাকড়সার জাল শেষে মোটা রশি।’ চিন্তা ও কাজের গুণগত মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলমান রাখার জন্য ছোট-বড়ো সকল কাজের ক্ষেত্রে গঠণমূলক ও উপকারী অভ্যাসগুলো জীবনকে সাবলীল করে ও অবচেতনভাবে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে ভালো অভ্যাসগুলো আমাদেরকে শক্তিশালী মানুষে পরিণত করে। তাড়াতাড়ি শোয়া ও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানো, পারিবারিক ও সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা, প্রয়োজনে বিনয়ের সাথে ‘না’ বলা, নেতিবাচক কাজ/ব্যক্তি থেকে কৌশলে দূরে থাকা, ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা, দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করা, সামান্য কিছুতে বিরক্ত না হওয়া/ধৈর্যচ্যুত না হওয়া হওয়া/মন খারাপ না করা, উগ্রতা পরিহার করে ধীরস্থির ও শান্তচিত্তে চলা ইত্যাদি উপকারী বিষয় চর্চার মাধ্যমে অভ্যাসে পরিণত করা উন্নতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার (Emotional Intelligence) উন্নয়ন : আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে আবেগ বোঝার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মূল্যায়ন ও প্রকাশ করার ক্ষমতা। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সাথে জড়িত, যেমন- আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব গঠন, অন্যদের সাথে ফলপ্রসূ সংযোগ এবং আলোচনা, কোনো বিষয়ে আপস করার পারদর্শিতা, প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এর উন্নয়নের মধ্য দিয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও কথা বলার মাধুর্য অর্জিত হয় যা ব্যক্তিজীবনে ও কর্মপরিবেশে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। জীবনে উন্নতির জন্য আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বিভিন্ন দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাধাকে সুযোগ হিসেবে দেখা বা সফলতার নতুন রাস্তা হিসেবে দেখা। বাধাকে না এড়িয়ে তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। বিখ্যাত বৈরাগ্যবাদী দার্শনিক ও রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস বলেন, ‘যা পথকে রুদ্ধ করে তাই নতুন পথের সন্ধান দেয়, যা কাজের গতিকে থামিয়ে দেয় তাই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়।’ ‘স্ফুলিঙ্গ’ কাব্যগ্রন্থে রবিঠাকুর বলেন-
‘প্রতিকূল ভাগ্য আসে/হিংস্র বিভীষিকার আকারে-/
তখনি সে অকল্যাণ/যখনি তাহারে করি ভয়।’
মনের অন্ধত্ব, ভুল সংস্কার, ক্ষতিকর অভ্যাস ও নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে খুঁজে বের করা ও সুকৌশলে তার দিক পরিবর্তন করে ইতিবাচক দিকে নিয়ে আসা। এভাবে অতীতের ভুলকে দীক্ষায় ও মনের ব্যথাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়।
নিজের ভিতরকার ভয়কে চিহ্নিত করা ও তা সামনে এনে পর্যালোচনা করা। ভয় মনের কোণে গোপনে বাসা বাঁধে, না তাড়ালে নিজের ইচ্ছায় যেতে চায় না। অজ্ঞতা থেকে ভয়ের জন্ম হয় এবং ভয় এড়িয়ে চললে পরে তা সীমাবদ্ধতারূপে দেখা দেয়। তাই ভয় মোকাবেলা করা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করা ও প্রয়োজনে অভিজ্ঞ পেশাগত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেয়া উচিত। ভয়কে জয় করতে পারলে তা সাহস ও বিচক্ষণতায় পরিণত হয় এবং মনের শক্তি বাড়ে।
ঝড়-ঝাপটা, বিপদ-আপদে ইতিবাচক থাকলে তা আমাদেরকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে ও সহিষ্ণু করে তোলে। বিপদকালীন সময়ে জ্ঞানী-গুণীজনদের সাথে পরামর্শ করে চললে ধৈর্যধারণ করা সহজ হয় ও সমস্যা থেকে বের হওয়ার বিভিন্ন রাস্তা পাওয়া যায়। আসলে জীবনের সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবানদের সংস্পর্শে থাকলে জীবনে সার্বিক সমস্যা অনেক কমে আসে।

নিজের চিন্তা-চেতনার বাইরে গিয়ে কোনো বিষয়কে নিরপেক্ষভাবে দেখার ক্ষমতা একটি বড়োমাপের গুণ যা আমাদেরকে প্রজ্ঞাবান করে তোলে। অন্যের সমস্যা উপলব্ধির ক্ষেত্রে এই গুণ সহায়তা করে বলে পরমতসহিষ্ণু হওয়া সহজ হয়। এ বিষয়ে রবিঠাকুর গেয়ে ওঠেন, ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’
আরামদায়ক বলয় (Comfort Zone) : মাত্রাতিরিক্ত আরাম হচ্ছে উন্নয়নের বড়ো শত্রু। কারণ তা অলসতার জন্ম দেয়। আরামদায়ক বলয় ভেঙে উন্নতির কাছে যেতে হয়। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সৌভাগ্য তার নিজস্ব ধরনে নিজের মতো করে আসে বা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকে। তাকে ধরার জন্য নিজের গণ্ডির বাইরে পা দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উঁচু পর্যায়ের সম্মান ও অর্থ উপার্জন জন্মস্থান/নিজের এলাকা ত্যাগের ওপর নির্ভর করে।
ইচ্ছাকে উদ্যোগে রূপান্তরিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নইলে কোনো ভালো ধারণা কাজের রূপ পায় না। এ জন্য বাইরের জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য রেখে চলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জগতের (চিন্তা/কল্পনা/ইচ্ছা/আবেগ/চরিত্র ইত্যাদি) মধ্যেও সঙ্গতি রেখে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
পড়াশোনা-দেখা ও লেখা : ভালো বই পড়া, ভালো গান শোনা ও ভালো মুভি দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব ধরনের জ্ঞান/তথ্য অথেন্টিক কি না তা যাচাই করে নিতে হবে। প্রতিদিন/প্রতি সপ্তাহে কিছু না কিছু লেখার অভ্যাস করা। লেখার বিষয়বস্তু যেকোনো কিছু হতে পারে-দৈনন্দিন বিষয়; কোনো বিশেষ আবেগ; পঠিত গল্প বা কবিতার পর্যালোচনা/সমালোচনা; নতুন গল্প, কবিতা, গান ইত্যাদি। আমাদের মনের কথাগুলোকে লেখনীর মধ্য দিয়ে বের করে আনলে তা প্রকাশ দক্ষতা বাড়ায় ও চিন্তার রাজ্যে সমৃদ্ধি আনে। পাশাপাশি লেখার অভ্যাস ধীরে ধীরে নিজেকে চিনতেও সাহায্য করে।
বর্তমান সময় ও বর্তমান কাজের ওপর পুরোপুরি মনোযোগ দেয়া, গুছিয়ে কাজ করা, কাজের তালিকা করে চলা, সম্পাদিত কাজের রেকর্ড রাখা, একটি কাজ ভালোভাবে শেষ করে অপরটিতে হাত দেয়া- এসব বিষয়গু কাজের মান ও সৌন্দর্য নিশ্চিত করে এবং সময়, সম্পদ ও শ্রমের অপচয় কমায়।
মেধা (সুপ্ত মেধা) বিকাশে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করতে হবে ও বিভিন্ন সৃজনশীল শিল্পচর্চা করতে হবে। প্রয়োজনে একাডেমিক কোর্স/প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজের পছন্দের বিষয়টিকে সামনে এনে বাস্তবতার আলোকে যাচাই করে তার উন্নয়ন ঘটালে তার থেকে বেশি ফল লাভ করা যায়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে রূপ নিয়েছে। এর থেকে ইতিবাচক ফল লাভ করার জন্য এর ওপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত সম্পর্কগুলোকে যোগাযোগের মাধ্যমে সজীব রাখা, সময় বাঁচানো, বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, পণ্য উৎপাদন, দূরবর্তী অঞ্চলে সাহায্য-সহযোগিতা প্রেরণ, নির্মল ও সুস্থ বিনোদন গ্রহণ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে প্রযুক্তি আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণভাবে সহায়তা করতে পারে।

সহযোগিতা ও সহমর্মিতাবোধ নিয়ে অন্যের উপকার করা, যাতে কারো ক্ষতি না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা, অন্যের আনন্দে আনন্দিত হওয়া, দুঃখে দুঃখী হওয়া, ছোট বড়ো সব শ্রেণীর মানুষকে মূল্যায়ন করা ও তাদের ইতিবাচক আবেগের মূল্য দেয়া, ঝগড়াঝাটি মিটিয়ে দেয়া, সম্পর্ক রক্ষায় এগিয়ে আসা, মানুষে মানুষে পার্থক্য দূর করা ইত্যাদি সব ধরনের নিঃস্বার্থ পরোপকার মনকে বড়ো করে এবং জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলে।
মানুষকে মানবিক করার জন্যই ধর্মের আগমন। নৈতিকতা, সততা, সরলতা, চরিত্র গঠন, মূল্যবোধের উন্নয়ন ও সামাজিকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে সত্যিকারের ধর্ম আমাদেরকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সমানুভূতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্প্রীতিভিত্তিক জীবন উপহার দেয়। তা ছাড়া ধর্ম সংযম শিক্ষা দেয় যা মানসিকও আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
কোনো নির্ধারিত লক্ষ্যে সফল না হলে বা আংশিক সফল হলে আমরা কী করব? লক্ষ্য থাকবে কিন্তু এর বিকল্পও থাকা উচিত-বিকল্প প্ল্যান A/B/C ইত্যাদি। আগে থেকেই সফলতার তারতম্যে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করে রাখলে আমাদেরকে আর হতাশায় পড়তে হয় না। এ জন্য প্রি-মাইন্ডসেট বা পূর্বনির্ধারিত মনোভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মাইন্ডসেট আমাদেরকে নেতিবাচকতা হতে বর্মের মতো রক্ষা করে।
উপরোল্লিখিত গুণাবলিসমূহ অল্প সময়ে অর্জন করা সম্ভব হয় না। তাই মাইন্ডসেট করে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মূলত সফলতা কোনো গন্তব্য নয়, সারা জীবনের যাত্রা। গুণাবলি অর্জনের চেষ্টার পাশাপাশি আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে সফলতার চেয়ে জীবন বড়ো। শুধু জাগতিক সফলতার পেছনে ছুটলে তা আমাদের মানবিক জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি করে। যে ক্ষতি জীবনে আর কখনো পূরণ করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে আমার জানা কতগুলো সত্য ঘটনার মধ্যে একটি : একজন উঁচু স্তরের মেধাবী ব্যক্তি একটি উন্নত দেশে বড়ো পর্যায়ে চাকরি করেন। তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিত ও সন্তানরাও অনেক মেধাবী, নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত পর্যায়ে তিনি একজন উঁচু পর্যায়ের সফল ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু একমাত্র ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেশে তার বৃদ্ধ মা-বাবা ছেলে, বৌমা ও নাতিদের আশায় পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তিনি কয়েক বছর পরপর দেশে আসেন। এর মধ্যে হঠাৎ তার মা মারা গেলে, জরুরি কাজে আটকে পড়ে উনি দেশে আসতে পারলেন না। এ দিকে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবার কাছে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়ার মতোও কেউ ছিল না। মায়ের মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস পরে, তার বাবাও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাঝে মধ্যে তার আত্মীয়রা এসে দেখে যেতে থাকে। আত্মীয়দের আসার বিরতিতে, টানা কয়েক দিন বাসার ভেতর থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে বাসায় ঢুকে তার বাবার লাশ পাওয়া যায়। অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিদায়! বিদেশে অবস্থানরত এ ব্যক্তিটির সফলতা আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করব? বস্তুজগতে উনি সফল বিবেচিত হলেও মানবিক দিক থেকে উনার অবস্থান কোথায়?

সফলতা জীবনকে সুখের দিকে নিয়ে যায় ঠিক। কিন্তু সফলতাই সুখের একমাত্র চাবিকাঠি নয়। বরং সুখই হল সফলতার চাবিকাঠি। সফলতা যাচাই করে বাইরে দুনিয়ার লোকেরা। আর সুখ উপলব্ধি হয় অন্তর্জগতে। তাই অভ্যন্তরীণভাবে সুখী মানুষ তার চিন্তা, গুণাবলি ও সম্পদকে অধিকতর ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগাতে পারে। মূলত সবাই সফল হওয়ার চেষ্টা করবে। তবে তা জীবনের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রেখে।
মানুষের জীবনে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা অন্য কেউ বা অন্য কিছু দিতে পারে না। গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায় যে ব্যর্থতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সাফল্যের চাবিকাঠি। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বিখ্যাত লেখিকা জে কে রোওলিং বলেন, ‘বাধাবিপত্তি ও বিফলতা থেকে যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও মানসিক শক্তি অর্জিত হয়, তা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নিরাপত্তা দান করে। প্রতিকূলতার দ্বারা পরীক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ নিজের শক্তি ও সংশ্লিষ্ট সম্পর্কগুলো সম্পর্কে জানতেই পারে না। প্রতিকূলতা/ব্যর্থতার দেয়া জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হচ্ছে একটি সত্যিকারের উপহার যা জীবনে অর্জিত যে কোনো যোগ্যতার বেশি মূল্যবান।’ তিনি আরো বলেন, ‘অভ্যন্তরীণভাবে আমরা যা অর্জন করি তাই আমাদের বাস্তবতাকে রূপ দেয়।’
আবার অনেক জ্ঞানী-গুণীজনদের মতে প্রাপ্তি নয়, নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই রয়েছে সফলতা ও সুখ। ‘স্ফুলিঙ্গ’ কাব্যগ্রন্থে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন-
‘মৌমাছি সে মধু খোঁজে মাধবীর ঝোপে,
জমা করে ফোঁটা ফোঁটা মৌচাকের খোপে।
ক্ষুধা ভোলে, স্বার্থ ভোলে, লোভ নাহি করে-
যাহা জোটে দেয় তাহা সকলের তরে।’
‘অমৃত’ কাব্যগ্রন্থের ‘পরোপকার’- কবিতায় কবি রজনীকান্ত-
‘নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল,
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ, দগ্ধ হ’য়ে করে পরে অন্নদান,
স্বর্ণ করে নিজ রূপে অপরে শোভিত,
বংশী করে নিজ স্বরে অপরে মোহিত,
শস্য জন্মাইয়া নাহি খায় জলধরে,
সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।’

ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন দ্বিমাত্রিক- জীবদ্দশায় স্রষ্টার অস্তিত্ব ও একত্বে বিশ্বাস রেখে সৎ, সরল, জাগতিক স্বার্থহীন, অন্যায়মুক্ত জীবনযাপন করা এবং জীবনোত্তর অসীম ফল লাভ। এ জীবন ধারা মানুষকে সত্যিকার অর্থে উভয় জগতেই সুখী করে। পবিত্র আল কুরআনে ‘সূরা নহল’ এর ৩০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা এ জগতে সৎকাজ করে-তাদের জন্য আছে এ জগতে মঙ্গল এবং পরজগতে আরো মঙ্গল।’
পার্থিব জীবন হচ্ছে কিছু সময়ের সমষ্টি যা না চাইলেও শেষ হয়ে যায়। এই অস্থায়ী ভিত্তিহীন আবাসে অন্ধজনেরা মৃত্যুর কথা ভুলে জাগতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে মেতে থাকে। ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন সম্পর্কে আল কুরআনের ‘সূরা হাদিদ’-এর ২০ নং-আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক শ্লাঘা ও ধনজনে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়, ওর উপমা বৃষ্টি, যার দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার অবিশ্বাসীদের চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীত বর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। পরকালে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি আছে। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।’
সত্যিকারের সফলতা প্রসঙ্গে পবিত্র আল কুরআনের কয়েক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘সূরা বাকারা : আয়াত নং-২. (এ) ওই গ্রন্থ, (কুরআন) যার মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই; এ ধর্মভীরুগণের জন্য পথপ্রদর্শক। ৩. যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, নামাজ কায়েম করে এবং তাদের যে উপজীবিকা দিয়েছি, তা হতে দান করে। ৪. এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল তাতে যারা বিশ্বাস করে এবং পরকাল সম্পর্কেও যারা দৃঢ় বিশ্বাসী। ৫. তারাই স্বীয় প্রতিপালকের নির্দেশিত সুপথে আছে এবং তারাই সফলকাম হবে।’
‘সূরা নূর : আয়াত নং-৫২. যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি হতে সাবধান থাকে, তারাই সফলকাম।’

‘সূরা তওবা : আয়াত নং-৭২. আল্লাহ বিশ্বাসী নর ও নারীকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন - যার নিম্নে নদী প্রবাহিত, তার মধ্যে তারা সর্বদা অবস্থান করবে, এবং চিরস্থায়ী জান্নাতের মধ্যে পবিত্র বালাখানাসমূহ রয়েছে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এই-ই চরম সফলতা।’
সত্যিকার অর্থে, এ জগতে কোনো মানুষই পুরোপুরি ব্যর্থ নয়। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দিক দিয়ে সফল। তাই কারোরই হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। সফলতা ও ব্যর্থতা উভয় প্রয়োজনীয়- প্রথমটি দেয় আনন্দ। আর দ্বিতীয়টি দেয় শিক্ষা। এ দুয়ের ইতিবাচক সমন্বয় জীবনে পূর্ণতা আনে। সঠিক ও সুন্দর চিন্তা এবং সততার সাথে অকপটভাবে কাজ করে গেলে প্রত্যেকেই তার জীবন-বাগিচায় মনোহর ফুল হয়ে ফুটতে পারে।
পরিশেষে, জন্মকে সার্থক ও বিশুদ্ধ আত্মিক সফলতা কামনায় রবিঠাকুরের উপদেশ হতে ব্রত গ্রহণ করি...
‘বড়োর দলে নাইবা হলে গণ্য-
লোভ কোরো না লোকখ্যাতির জন্য।
ভালোবাসো, ভালো করো, প্রাণ মনে হও ভালো-
তবেই তুমি আলো পাবে, তবেই দেবে আলো-
আপন-মাঝে আপনি হবে ধন্য।
স্বার্থমাঝে থেকো না অবরুদ্ধ-
লোভের সাথে নিয়ত করো যুদ্ধ।
নিজেরে যদি বিশ্বমাঝে করিতে পারো দান
নিজেরে তবে করিবে লাভ - তখনি পাবে ত্রাণ,
হৃদয়ে মনে তখনি হবে শুদ্ধ।’


আরো সংবাদ


premium cement