৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

লেখালেখির চল্লিশ বছর

-

গত সংখ্যার পর

১৯৯০ সাল। সুজন বড়ুয়ার পরামর্শে আতিকুর রহমান শাহীন নামটি কাটছাঁট করে ফেলি। আতিকুরকে ক্ষুর দিয়ে কেটে আতিক এবং শাহীনকে হীন করে দেই। নাম হয়ে যায় আতিক রহমান।
সেই থেকে আতিক রহমান নামে বড়দের পাতায় লিখতে থাকি। নতুন নতুন পত্রিকা বের হতে থাকে। আমিও সেই পত্রিকায় লিখে লেখার সম্প্রসারণ ঘটাই। এই সময়টায় খুব উৎসাহিত বোধ করি। অবশ্য, লিখে আতিকুর রহমান শাহীন নামেই টাকা পেয়েছিলাম আগে। সবুজ পাতার সম্পাদক লুবনা জাহান, বয়স দিয়ে যারা লেখে শুধু তাদের দিয়ে একটি সংখ্যা করলেন। এবং লেখা প্রকাশের পর সবার জন্য লেখক সম্মানী করলেন।
সেই সময়ই প্রথম লেখক সম্মানী চল্লিশ টাকা পাওয়া। এই প্রিয় সম্পাদক আমাকে এবং আর যাদের লেখা ছাপা হয়েছিল সবাইকে শতগুণ উৎসাহিত করেছিলেন সেদিন। তাঁকে আমরা হারিয়েছিলাম ৬-৭ বছর পরই। তিনি মারা গেলে আমরা তাঁর জন্য দোয়া করি। অসম্ভব ভদ্রমার্জিত সম্পাদক ছিলেন তিনি।
সেই সময় আতিকুর রহমান শাহিন নামে ‘নবারুণ’ পত্রিকায় লেখার সুবাদে সম্পাদক খালেদা এদিব চৌধুরীর সঙ্গে স্নেহ-শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি প্রায় প্রতি সংখ্যার ছড়া, কবিতা, গল্প, ফিচার ছেপে আমাকে উৎসাহিত করতেন। ওখান থেকে আমরা লেখক সম্মানী পেতাম।
বলছিলাম, এরপর যখন নতুন দৈনিক আজকের কাগজ, জনকণ্ঠ, বাংলা বাজার পত্রিকা, দৈনিক রূপালী, আল মুজাদ্দেদ, যুগান্তরসহ পুরনো পত্রিকার পাশাপাশি সেই সময় প্রকাশিত সকল নতুন পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ছড়া-কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লেখি দুই হাতে। তা ছাড়া সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকাগুলোতেও নিয়মিত লিখতাম। আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম এই জন্য যে, সবগুলো পত্রিকার শ্রদ্ধেয় সম্পাদক সাহেবদের সাথে আমার আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁরা আমাকে এক সময় তাগিদ দিয়ে লেখান এবং লেখা ছাপান। দাদাভাই তো টেবিল থাপড়িয়ে তালেতালে ছড়া পড়ে ছড়ার তাল-লয়-ছন্দ শিখিয়েছেন। তাই তো তাঁকে আমার বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখেছি- লেখক গড়ার আদর্শ শিল্পী, রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই)। আজ কৃতজ্ঞতার সাথে তুলে ধরছি তাঁদের নামগুলো, যাঁদের কাছে আমি ঋণী। তাঁরা হলেন রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই), রফিকুল হক (দাদুভাই), বিপ্রদাস বড়–য়া, সালাম জোবায়ের, ইউসুফ শরীফ, আখতার হুসেন, লুবনা জাহান, খালেদা এদিব চৌধুরী, সোলায়মান আহসান, মাহবুবুল হক, সেলিমা সবিহসহ আরো অনেকের কাছে।
পরবর্তী সময়ে লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, সুজন বড়–য়া, রহীম শাহ, ফারুক নওয়াজ প্রমুখ আমার শ্রদ্ধেয় অগ্রজ লেখকদের সহযোগিতা পেয়েছি। যাঁদের সহযোগিতায় আমি প্রায় চল্লিশ বছর লেখালেখির স্বপ্নের জগৎ পার করেছি। মনে পড়ে, উনিশ শত নব্বই সালে আমার প্রথম প্রকাশিত বই তুখোড় হাসির গল্পগ্রন্থ “অদ্ভুত আয়োজন” প্রকাশিত হবার পর সেই বই মেলাতেই দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়। আমাকে প্রতিদিন ষাট-সত্তরটি বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে হতো। তারপর একদল কিশোর পাঠকের কাছে আমি জনপ্রিয় হয়ে গেলাম। একের পর এক লিখতে থাকলাম, অদ্ভুত আয়োজন (হাসির গল্প), অদ্ভুত ভূত, অদ্ভুত রহস্য, অদ্ভুত লোকটির উদ্ভট কাণ্ড, হাসুর হাসি, চাপাহাসি-কাঁপাহাসি, চাঁদে যাবেন চাপল মামা, আমাকে দেখে হাসতে মানা ইত্যাদি।
এরপর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের লেখালেখি জীবনে প্রকাশিত হয়েছে ১১৫টি বই। শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞানবিষয়ক ‘মহাবিশ্বের মহাসীমানা’। ইতি থেকে চাপাহাসি-কাঁপাহাসি। বার্ড পাবলিকেশন্স থেকে ১০টি বই। প্রিয়প্রকাশ থেকে ৩৬টি বই। ২০০৪ সালে ‘ছন্দ শিখে লিখি উচ্চারণ শিখি’ গ্রন্থের মাধ্যমে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য শিশু একাডেমি পুরস্কার লাভ করি। এরপর ছন্দ ও উচ্চারণ, আবৃত্তি বিষয়ে অসংখ্য বই লিখি।
সাহিত্যের সকল শাখায় হাত বুলিয়েছি গত চল্লিশ বছরের লেখালেখির জীবনে। লিখেছি ছড়া, কিশোর কবিতা, আধুনিক গদ্য কবিতা, হাসির গল্প, রহস্য গল্প, গোয়েন্দা গল্প, ভূত ও হরর গল্প, শিশুতোষ গল্প, প্রবন্ধ- নিবন্ধ ও গান, গজল।
আমি আসলে অন্তরালের কবি, শিশুসাহিত্যিক। রাত জেগে লিখেছি কেবল বই। ফাঁকি দিয়েছি জীবনের অন্য অধ্যায়ে। নব্বই দশকে চলচ্চিত্রে নতুন মুখের সন্ধানে সুযোগ পেয়েও বাবার নিষেধের কারণে চলচ্চিত্রে যাওয়া হলো না। কণ্ঠশীলনে আবৃত্তি শিখে কিছুদিন আবৃত্তি করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিশুসাহিত্যই আমার পরমাত্মীয় হলো। উল্লেখ্য, গত ২২ ফেব্রুয়ারি আমার বায়ান্নতম জন্মদিন অতিবাহিত হলো। ভাবছি-বড় ক্যানভাসে ভিন্নভাবে ভিন্ন রকম কী লেখা যায়। মানবতা, নৈতিকতা, আদর্শ আমার সম্বল। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে লেখালেখিতে এই সত্যান্বেষী অনুসন্ধিৎসু ‘আমিটা’ সাদাতাজীর মতো এগিয়ে যেতে সবার দোয়া অপরিহার্য।


আরো সংবাদ


premium cement