০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

আধুনিক শিল্পকলা ও কবিতার কথা

-

নন্দনতাত্ত্বিকদের ভাবনায় চিত্র-কাব্য-ভাস্কর্য কিংবা অন্যান্য নান্দনিক বিষয়াদি কেবলমাত্র পরমার্থঘনিষ্ঠ শুদ্ধ কল্পনা থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়েছে। তাঁরা মনে করেছেন এসবের প্রেরণায় রয়েছে দৈব এবং সংশ্লিষ্টরা দৈবের অনুগ্রহপ্রাপ্ত। তাঁরা সামাজিক পরিবেশ বলে যে একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মানবজীবনে বর্তমান এবং প্রাণীর মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে শিল্প-সাহিত্য-কাব্য সহযোগী হলেও সমাজ অস্তিত্বের শর্তটাই মৌলিক তা অনুভবই করতে চাননি। শিল্পীরাও প্রশ্ন তোলেন সমাজে তো আরো অনেক মনুষ্য আছে তারা কবি/শিল্পী নয় কেন? আসলে কেউ একা কবি/শিল্পী নয়, বরং প্রত্যেকের মধ্যেই কবিত্ব/শিল্প বোধ রয়েছে আর রয়েছে বলেই শিল্পীর শিল্প, নাচিয়ের নৃত্য আঁকিয়ের চিত্র- এসবে সমাজের চাহিদার উপস্থিতি ঘটেছে। সেই চাহিদার কারণেই এসবের গঠনগত উদ্ভাবন ও সৃষ্টি। বাস্তবজীবনে সামাজিক প্রভাবকে আমরা অনুভব করি না যেমন করি না আমাদের চারপাশের আরো অনেক বিষয়াদির অস্তিত্ব। অবশ্য এর মধ্যে কল্পিত বিষয়াদিও আছে। যেমন- রামরাজ্য আমরা দেখিনি, কিন্তু কল্পনা এমন মিশেলে পল্লবিত যে রামরাজ্যের গুণকীর্তন যখন কেউ করে তখন তাকে অতিরিক্তও মনে হয় না। তেমনি এঁরা তাঁদের মেধা ও শক্তির আনুকূল্য পেয়েছেন ক্ষমতাবান শ্রেণী থেকে। সম্ভবত সেসব কারণে তাঁরা জীবন শিল্পসৌন্দর্য নানা ভাববাদিতার সংমিশ্রিত উপলব্ধি দ্বারা অই শ্রেণীর স্বার্থে নিবেদিত করে কৃপাই কুড়াতে চান। প্রাচীন দার্শনিকরাও দাসদের উপলব্ধিতে যে সৌন্দর্যপ্রিয়তা ছিল এবং তাও যে তাদের ভালোলাগার ভালোবাসার বিষয় ছিল তার উল্লেøখ আছে তাদের সংগ্রামী ইতিহাসে। আয়্যারলান্ডে জনগণের মুক্তির আন্দোলনে প্রথম যে বোমা বিস্ফারিত হয়েছিল এক কবি তাকে বলেছিলেন ‘হরিবল বিউটি’। কেউ কেউ সৌন্দর্যকে অনুভূতির সীমারেখা লঙ্ঘন করে বিশ^-পরমের সাথে যুক্ত করে সাধারণের অনুভবকে জখম করছেন তারও উপস্থিতি আছে, বা এখন একটু নেমে প্রান্তিক মানুষকেও তার অন্তর্ভুক্ত করে একটা নিরপেক্ষতার ভড়ংয়ের জন্মও দিচ্ছেন তাও লক্ষণীয়। বাস্তবে এসব উদ্যোগ শিল্প-সাহিত্যকে সাধারণের জন্য অচ্ছুত করে তাদেরকে সরিয়ে রাখারই পাঁয়তারা। আসলে সব কিছুই যে মানুষের তথা সমাজের এবং সব কিছুতেই যে তাদের সমান অধিকার (জানা ও বোঝার, বোঝার জন্য প্রশিক্ষণ পাবার) এবং বিপুল মানুষ যে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জ্ঞানার্জন ও বিকাশ ইত্যাদি থেকে দূরবর্তী- সেই কথাটা মান্যবরা স্মরণে রাখছেন না। এমনকি কবি/শিল্পীরাও না। ফলে সুন্দরের প্রকৃত সংজ্ঞা আড়াল হয়ে আছে। তারা এমন সব ব্যথাবেদনার চিত্র আঁকছেন গাইছেন অথবা নির্মাণ করছেন যার পেছনে তার প্রভু-শ্রেণীর আকাক্সক্ষাগুলোরই স্পষ্টতা। হতে পারে আজকে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা আর সনাতনী উপায়ে সম্ভব নয়, কিন্তু মানুষের সংগ্রাম সেই দাস যুগ থেকে আজ অবধি একটানা টান টান কি নেই? শোষণ ও পীড়নও কি থেমে গেছে? তা যারা স্বীকার করেন না; আসলে তাদের বোধ বাস্তবে ক্ষমতাবান শ্রেণীকেই সহায়তা দেয়া তা থেকে আনুকূল্য পাওয়ারই কৌশল মাত্র। আর এসবে বুর্জোয়ারা আনুকূল্য দিয়ে নিজেদের শ্রেণীর স্বার্থটাই সংরক্ষণ করে। আড়াল করে নিজেদের কুকর্ম। মানুষ দমিত হয় এবং সে তার ভাষা হারায়। সে নামতে নামতে এতদূর নেমে যায় যে তাকে আর চিহ্নিত করা যায় না।

 

নন্দনতত্ত্বের চলমান সূত্রগুলো নিয়ে নন্দনতত্ত্বের আলোচকরা আত্মহারা এবং তাদের লেখায় ইনিয়েবিনিয়ে এই তত্ত্বের ফেরি করে দু’পয়সার জোগান পাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা যেমন সমাজকে সমাজের অস্তিত্বকে তার ক্ষমতা ও প্রভাবকে গুরুত্ব দিতে পারেননি বা ভাবেননি, তেমনি এরাও অনুভব করে না- যে জ্ঞান তারা আহরণ করছে তা সামাজিক এবং সে যা পুনরুৎপাদন করছে তাও বিস্তার পাচ্ছে সমাজে। ধর্ম দর্শন আইন সংস্কৃতি সবই যে সমাজগর্ভ থেকে উৎসারিত এবং তার প্রয়োজনীয় জ্ঞান পরিশুদ্ধির নতুন প্রয়োগ সবই সমাজ থেকে উদ্ভূত আবার ফিরে যাচ্ছে সমাজে। কারণ মানুষের সব কীর্তি কৃতী সবই বিষয় হিসেবে সামাজিক মানুষের অস্তিত্বলগ্ন; তাকে সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। যদিও বাস্তবতা নানা কিছুর সাথে সংশ্লিষ্ট, কবি/শিল্পীর একাগ্রতায় যে চৈতন্যালোক প্রতিফলিত হয় তা তাঁর শ্রেণীরই দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির বজ্রআঁটুনি থেকে শিল্পীরা যখন মুক্ত হয়ে কল্পনার মুক্ত পৃথিবী দেখতে পাবেন তখনই তা পরিশুদ্ধ হয়ে বস্তুগত বিষয়জগতে রূপান্তরিত হবে এবং নতুনে রূপ পাবে। সেখানেই কবি/শিল্পীর শিল্প-আত্মার বিদ্রোহের প্রথম বিস্ফোরণ।
অগ্রজের অটল বিশ^াস না ভাঙতে পারলে কিংবা অনুরূপ কোনো চিন্তাধারাকে মনের পটভূমিতে বসাতে না পারলে কবিতার ভবিষ্যৎ থেকে যাবে গতানুগতিক। কারণ আমরা আর প্রাচীন অথবা মধ্যযুগীয় নই, আমরা আধুনিকতার গতিতে চলমান। আধুনিক মানুষ সে, যে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে। সে নয় যে নিজের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ। কান্ট মনে করতেন ‘আধুনিকতা কোনো কালপর্ব নয়, বরং এক মনোভঙ্গি’। এই মনোভঙ্গি বলে দেয় তার সৃষ্টি কার পক্ষে থাকবে এবং তিনি কিভাবে সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতারিত মানুষের মনে এই সংবাদটি জানিয়ে দেবেন- তিনি প্রতারিত হচ্ছেন। নিয়তি নয় কর্মই নিত্য মানুষকে আধুনিক করে তোলে। যদিও চারদিকে প্রতারক সে কবি/শিল্পী/সাহিত্যিক/ধর্মবেত্তা সবাই ওই মানুষটিকেই প্রতারণা করে চলছে। তেমনি কবি সাহিত্যিক শিল্পী তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে যা সৃষ্টি করে চলেছেন তার মধ্যে শ্রেণীর দ্বন্দ্বের উত্তরণের কোনো ছবক না দিয়ে তাকে তার বোধকে আরো কোণঠাসা করে বিত্তবানদের চক্রান্তকেই সফল করছেন। আধুনিকতার ‘এথোস’ বা ভাবসত্তা হচ্ছে নিজেকে চেনা এবং নিজের বন্দিত্ব থেকে নিজকে মুক্ত করা। যে মুক্তির জন্য পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো দমিত, তা থেকে মুক্তির দিশা তৈরিতে তাদের আটকেপড়া চেতনাকে উচ্চরব করা। আধুনিককালের দার্শনিক মিশেল ফুকো কান্টের আলোকপ্রাপ্তিকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক অন্বেষণ হিসেবে দেখেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে কবি বা শিল্পীর প্রথমেই তার ‘আত্মনের যতœ’ নেয়া দরকার। রুশ লেখক চেলিয়াপিনের দাবির মতো কেউ যদি বলে আমরা কবি সাহিত্যিকরা ভিন্নমানসিকতার মানুষ, তা হলে তিনি তার চারপাশের সামাজিক মানুষের কেউ নন। প্রকৃত যতœ তখনই সম্ভব যখন নিরাসক্ত কেউ ঘুরে ঘুরে জীবনকে দেখেন, বোঝেন এবং বস্তুর সাথে জীবনের সম্পর্ক, প্রকৃতির সাথে তার সখ্য নীরবতার মাঝে ঘুমভাঙার দামামাকে উপলব্ধি করেন। আর এর জন্য বোহেমিয়ান হওয়ার দরকার নেই, দরকার আবেগ ও শক্তিশালী কল্পনাশক্তির। এই উপলব্ধিই হলো জ্ঞান ‘আত্মার আত্মন’। অন্যথায় আধুনিক কবিতা বা শিল্প বা সাহিত্য বা সৃজনশীল কাজ নাচ গান সুর এসবই থেকে যাবে গতানুগতিক পরম্পরার স্র্রোত। ঐতিহ্যের টায় টায় ব্যবহার শিল্পকে সমৃদ্ধ করে না, দেয় না আধুনিক রূপ।

 


যখন বদলে যাচ্ছে অতীতের বোধ ভাষা ও ভাবনার বিষয়াবলি যা এখন ইতিহাসের অংশ, এমনকি পরমার্থিক সূত্রেও ধস আর বিকৃতি স্তূপ, ধারাবাহিক বিশ^াসেও ফাটল। প্রেমের গতানুগতিক ও ব্যবহারিক সংজ্ঞার বিবর্তন। বিশে^র অর্থনৈতিক ভিত্তিটাই বদলে শ্রমের প্যাটার্নও বদলে গেছে। তখন মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে যন্ত্র এবং সঙ্কুুচিত করছে শ্রমের পরিসর। উৎপাদনব্যবস্থায় যে ধনতন্ত্রের নির্দেশ তার মধ্যে ব্যক্তি অধীন হয়ে হারিয়ে ফেলছে তার স্বাধীনতা। বিচ্ছিন্নকরণের প্রকল্পে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে মানুষ পারস্পরিক সম্পর্ক হতে, উৎপাদন হতে। সে বুঝতেই পারে না যেখানে সে শ্রম দিয়ে এলো তার সাথে আসলেই তার কী সম্পর্ক। কারণ উৎপাদিত পণ্যের মুনাফা মালিকের, তার শুধু ঠকানো মজুরিতে শ্রম বিক্রি। এখন সে একটা আইনের শৃঙ্খলে স্বাধীন অর্থাৎ তার নিজের বলে আর কিছু নেই, সে কারো ইচ্ছের স্বাধীনতায় আটকে পড়েছে। সাম্র্রাজ্যবাদী শক্তি নানা কৌশলে একবিশ^ নীতির বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে শ্রমজীবী মানুষের পায়। মানুষকে তার নিজ পছন্দের স্বাধীনতা হারিয়ে ক্ষমতাবানদের দেয়া স্বাধীনতাকে পছন্দ করতে বলছে/নির্দেশ দিচ্ছে। অন্যথায় সেই হয়ে যাবে সন্ত্রাসী, জঙ্গি এবং দেশদ্রোহী।
আধুনিক কবিতা যে দুরূহ এমন অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেয়ার নয়। কারণ আধুনিক মনের গতিপ্রকৃতিটাই জটিলতার। অন্যদিকে প্রাক্তন কবিতা যে মহৎই তা-ও নয়। সেখানেও জটিলতা। কারণ মানুষের মনোজগতের সব ভাষা বিশেষ করে শিল্পী-সাহিত্যিক-কবিদের সরল একরৈখিক তাও নয়। সে কারণেই আধুনিক কবিতায় নানা তত্ত্বের সমাবেশ ঘটেছে। কোনোটা টিকেছে অংশ নিয়ে কোনোটা স্থিত হয়েছে স্বাভাবিক প্রবণতায়।


আরো সংবাদ


premium cement