০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

ছবির গল্প

ছবির গল্প -

ফুলতলার ঘাট থেকে যখন ওরা নৌকায় উঠল, তখন রাত প্রায় শেষ। পুবের আকাশে হালকা লালের ছোপ। শান্ত নদী, শীতের কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে দু’কূল, একটুও ঢেউ নেই, যেন নিশ্চুপ হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে নদী।
আব্বুর সাথে নৌকায় চড়ে শিকারে যাওয়া দিনার এই প্রথম। ছোট্ট ছই, সামনে সরু পাটাতন। একটা মোড়ায় বসলেন জাহিদ সাহেব আর আরেকটায় দিনা। জাহিদ সাহেব কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছেন চকচকে দোনালা বন্দুক, খাকি প্যান্টের পকেটে এক গাদা কার্তুজ।
দিনার কাঁধও খালি নেই। একটা পাটের ঝুলোঝুলো থলে, থলের পেটে ওর ক্যানভ্যাস, তুলি, আর যত রকম রঙ।
নৌকার মাঝি দাঁড় টেনে এগিয়ে চলেছে। দিনা ততক্ষণে পাটাতনের ওপর ওর রঙ, তুলি সব ছড়িয়ে দিয়ে পা মেলে বসে পড়েছে। কোনো দিন ও হাওর দেখেনি, হাওরজুড়ে বোরো ধানের সবুজ সমারোহ। পাড়ে চিনে বাদাম আর সরষে ক্ষেতে কিচিরমিচির আর যত নাচানাচি গাং-শালিকের।
ভোর না হতেই পাখিরা সব জেগে উঠে একটানা উড়োউড়ি শুরু করেছে। মহান ¯্রষ্টা আল্লাহ পাকের মহিমা দেখছে দূর-দূরান্ত জুড়ে।
বোরোধানের সবুজ ক্ষেতের মিষ্টি গন্ধে বাতাস ভরপুর। ততক্ষণে চার দিক আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উষার লালিমা টুকরো টুকরো হয়ে গলে পড়েছে নদীর বুকে। সোনারঙ বোরোধানের শিষে।
বেশ শীত। তন্ময় হয়ে প্রকৃতির অপূর্ব শোভা দেখতে লাগল দিনা। হাতে ওর ছোট-বড় তুলি। জাহিদ সাহেবের হাতও খালি নেই। কাঁধ থেকে নামিয়ে ভারী বন্দুকটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। আজ নৌকা ভরে সরালি, রাজহাঁস, চখা আর পিনটেইল শিকার করে বাড়ি ফিরবেন বাপবেটি।
আধ ঘণ্টার মধ্যে নদী ছেড়ে নৌকা ঢুকল গিয়ে একটা আঁকবাঁকা সরু খালের ভেতর। জোয়ার নেমে গেছে। খালের দু’পাড় জুড়ে মসৃণ কাদা চকচক করছে। কাদার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারছে ছোট-বড় যত সব রঙিন ঝিনুক। খালে লাফাচ্ছে ছোট্ট ছোট্ট যত মাছ লেজ উঁচিয়ে।
জাহিদ সাহেব ঝিনুকগুলো দেখিয়ে বললেন, দিনা, আমাদের দেশের এসব ঝিনুকগুলোতে পিংক-রঙ মুক্তো পাওয়া যায়, বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও পিংক পার্ল নেই।
মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল দিনা খালের পাড়ে ঢেউ খেলানো ধানক্ষেতের দিকে। রঙবেরঙের ঝিনুকগুলো কুড়িয়ে ওর থলে ভরতে ভারি ইচ্ছা করল।
খাল ধরে কিছুক্ষণের মধ্যে নৌকা ঢুকে পড়ল একটা মস্ত বড় বিলে। কুটির বিল। চার দিকে সমতল ক্ষেত আর মাঝখানে পানি আর পানি।
মাঝি ইশারা করে সাবধান করে দিলো জাহিদ সাহেবকে কথা না বলতে। সামনে সরালি আর চখার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। দিনা ওর থলের ভেতর থেকে একটা অটোম্যাটিক ক্যামেরা বের করে গলায় ঝুলিয়ে নিলো। শুধু রঙ তুলি দিয়ে ছবি আঁকবে না, বিলের পাড়ে নলখাগড়া আর কাশফুলের ছবি ধরে রাখবে ওর ক্যামেরায়।
অবাক হয়ে গেল দিনা বেশ দূরে বিরাট একঝাঁক সরালিকে বিলের জলে ভাসতে দেখে। হাজার হাজার সরালি, সমস্ত এলাকাটা যেন ঢেকে রেখেছে, কালো হয়ে গেছে বিলের পানি ওদের ছায়ায়। কয়েকটি আবার উড়ে উড়ে বাকিগুলোর দেখাশোনা করছে।
এত পাখি কোনো দিন এক সাথে দেখেনি দিনা। সামনে শুধু পাখি আর পাখি। আপন মনে ওরা চেঁচামেচি করছে আর ডুবে ডুবে যত ঝিনুক আর গুঁড়ামাছ ধরে খাচ্ছে।
নিঃশব্দে নৌকাটা আরো এগিয়ে গেল। পাখিগুলো আরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দিনা।
হঠাৎ দেখল, বোরোক্ষেতের পাশে বিলের পাড়ে এক জোড়া বড় হাঁস। চখা। বাদামি পাখনায় ঢাকা ওদের মোটাসোটা পা, দু’জন চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আর দেরি নয়। দিনা ওর রঙ তুলি নিয়ে লেগে গেল ছবি আঁকতে, মজার বিলের হাঁসের ছবি। কালো পানিতে একঝাঁক হাঁসের খেলা।
নৌকা এবার আরো কাছে এসে গেছে। ওস্তাদ শিকারি জাহিদ সাহেব। দিনার পাশে পাটাতনের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে বন্দুক উঁচিয়ে ধরলেন। মোটা তাজা চখা দুটো একদম রেঞ্জের ভেতর। ট্রিগারে একটু চাপ দেবেন আর পাখি দুটো এক গুলিতেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে।
অভিভূত হয়ে তুলির আঁচড় দিচ্ছে দিনা ওর ক্যানভাসে। ওরও টার্গেট চখা দুটো, ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা বক, সরুগলা পানকৌড়ি আর সবুজ বোরোক্ষেত।
ছবিটা বেশ সুন্দর হয়ে ফুটে উঠল ক্যানভাসে। ঠিক ঠিক এসে গেছে তুলির আঁচড়ে।
এতক্ষণ অভিভূত দিনা একটুও খেয়াল করেনি মিঠু ওর আব্বুর দিকে। নৌকাটা একটু দুলে উঠল। যেই না আব্বু ট্রিগারটায় চাপ দেবে, অমনি ও নৌকাটা জোরে দুলিয়ে দিলো, নিশানা নষ্ট হয়ে গেল জাহিদ সাহেবের।
আব্বুকে জাপটে ধরল দিনা, আব্বু প্লিজ, পাখিগুলো মেরো না। দেখনা কত সুন্দর ওরা, কেমন খুশিতে নাচানাচি করছে। আজ আমি সারাদিন ধরে ওদের অনেক ছবি আঁকব।
বিব্রত হয়ে গেলেন জাহিদ সাহেব। শিকার করতে এসেছেন, মেয়ে কিনা বলে গুলি ছুড়তে দেবে না। তাকিয়ে দেখলেন মেয়ের ক্যানভাসের দিকে। বাহ! চমৎকার এঁকে ফেলেছে হাঁসগুলোর আউট-লাইন। একদম জীবন্ত মনে হচ্ছে।
অবাক হলেন খুব, দিনা যে এত ভালো আঁকতে পারে, ভাবতেই পারেননি। ওর শক্ত হাত দুটো গুটিয়ে নিলেন, নামিয়ে রাখলেন টোটাভর্তি বন্দুক।
দিনা অমনি ওর ছোট্ট ক্যামেরাটা তুলে দিলো বাপের হাতে। আব্বু, বন্দুক দিয়ে শুট না করে ক্যামেরা দিয়ে শুট করো। ক্যামেরায় তোমার যা পাকা হাত! খুব সুন্দর আসবে।
মেয়ের আবদার। ক্লিক ক্লিক। অনেক ছবি তুললেন জাহিদ সাহেব। নিরুদ্বেগ পাখিগুলো। ওরা বোধ হয় বুঝতে পেরেছে, ওদের শিকার করা হবে না আজ। তাই নৌকা কাছাকাছি গেলেও আকাশে উড়াল দিয়ে পালাল না। ভয়ে ককিয়ে উঠল না বন্দুক দেখে।
অনেক ছবি আঁকল দিনা। মহাখুশি ও। সব ছবিই একদম জীবন্ত। ঘাটে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেল।
জাহিদ সাহেবের বসার ঘরে অনেক ছবি আর ফটো। নিশুম বিলের বুনো হাঁসের ছবি। দেয়ালজুড়ে যেন বিলটা ভেসে রয়েছে। গুলির হাত থেকে বেঁচে গিয়ে তুলির আঁচড়ে বেঁচে রয়েছে হাঁসগুলো।


আরো সংবাদ


premium cement
পদ্মা সেতুর নাট খোলা বায়েজিদের জামিন নামঞ্জুর ফরিদপুর জেলা ছাত্রদল সভাপতির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা চিকিৎসার জন্য আবার ব্যাংককে রওশন এরশাদ সিলেটে আবারো বাড়ছে পানি, অবনতি বন্যা পরিস্থিতির লঞ্চে মোটরসাইকেল ১০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে বিদ্রোহ, কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবেন বরিস জনসন ঢাবি অধ্যাপক ড. মোর্শেদের রিট খারিজ করায় উদ্বেগ আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে বাংলাদেশ ‘এ’ দল শিক্ষকদের ওপর হামলা মানে শিক্ষার ওপর হামলা : ইউনিসেফ মানিকনগরে উঠতি মাস্তানদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা রেকর্ড রাজস্ব আদায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূরিভোজ করালেন মেয়র

সকল