০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

স্মৃতিতে ফজল শাহাবুদ্দীন এবং সমারোহ

-

দিনটি ছিল শনিবার। তারিখটা মনে করতে পারবো না। আমরা তখন কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে ‘সমারোহ’ অফিসে বসি। সাপ্তাহিকটির ডিক্লারেশন হাতে এসেছে। এবার প্রথম সংখ্যার প্রস্তুতি। সমানে কাজ চলছে। ফজল ভাই সম্পাদক, আমি নির্বাহী সম্পাদক। আমাদের সাথে আছে কবি কামরুজ্জামান, চৌধুরী ফেরদৌস, ফারুক আফিনদীসহ একঝাঁক তরুণ সংবাদকর্মী। ফজল ভাই সবসময় তরুণ কবিদের অগ্রাধিকার দিতেন। তরুণরা তার বন্ধু। আমাকে বলতেন- সতীর্থ। সে দিন দুপুরে চিত্রনায়ক ফেরদৌস এসেছিল আমাদের অফিসে। বিনোদন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ফজল শাহাবুদ্দীনের আহ্বানে ‘সমারোহ’তে আসতে পেরে বারবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল সে। আমি, ফজল ভাই আর ফেরদৌস। টানা পৌনে দুই ঘণ্টার আলাপচারিতার উপর একটি ‘তারকার সাথে আড্ডা’ শিরোনামে লেখা রেডি করতে বসেছিলাম বিকেলে। ফজল ভাইসহ অন্যরা একে একে চলে গেলেও পিওন সাদেক আর আমি থেকে গিয়েছিলাম অফিসে। ঠিক মাগরিবের পরে কলিংবেল বেজে উঠল। সাদেক দরজা খুলে আমার কাছে ছুটে এসে জানালো একজন কবি এসেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে’? সে নাম বলতে পারলো না। আমি উঠে রুম থেকে বেরুতেই দেখি আল মাহমুদ ভাই। সাথে একটি অচেনা ছেলে। আমিতো অবাক। কাছে গিয়ে হাত ধরে ফজল ভাইয়ের বড় রুমটা খুলে বসালাম। জানতে চাইলাম, কী খবর মাহমুদ ভাই, এই সন্ধ্যারাতে? মাহমুদ ভাই একটু হেসে বললেন, বুড়ো হলে যা হয়। তোমাদের পাশেই একটা অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষে বেরুতেই মনে হলো, নিম্নচাপে ধরেছে। ওকে (ছেলেটিকে) বললাম, তোমাদের এখানে নিয়ে আসতে। ভাবলাম, ‘ফজলা আছে’। ফজলা মানে ফজল ভাই। বন্ধুকে দুষ্টুমি করে ফজলা বলে ডাকতেন মাহমুদ ভাই। আমি তাকে জানালাম, আমি ছাড়া আরতো কেউ নেই অফিসে। তিনি বললেন, কেউ না থাক তুমিতো আছো। বাথরুমটা কোনদিকে, বাথরুমটা দেখাও। আমি তাকে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে সাদেককে পাঠালাম চা, পুরি আর সিগারেট আনতে। মাহমুদ ভাই বেরিয়েই বললেন, সিগারেট দাও। বললাম, আনতে পাঠিয়েছি। তিনি হাসলেন। তুমি মিয়া কাজের লোক। সাথে চা থাকবে তো? বললাম, চায়ের সাথে পুরিও। তিনি এবার ভেঙে পড়লেন মায়াবী হাসিতে। এরপর জানতে চাইলেন পত্রিকার কথা। উঠে এলো ফজল ভাই প্রসঙ্গ। বললেন, ফজলা পাগলামী করে জীবনটা কাটিয়ে দিলো। ‘ও’ কি না করেছে! যখন ‘বিচিত্রা’ বার করলো তখন সারা দেশে যেন একটা বিপ্লব ঘটে গেলো। পত্রিকার কভার স্টোরি থেকে শুরু করে সব কিছুই ছিল নতুন আর নান্দনিক। মাহমুদ ভাইকে স্মরণ করিয়ে দিলাম ‘নান্দনিক’ নামেও ফজল ভাইয়ের একটা পত্রিকা ছিল। আমরা ‘সাপ্তাহিক সমারোহে’র সাথে সেটার ডিক্লারেশনও আপডেট করে এনেছি। এখন থেকে সাপ্তাহিক সমারোহের সাথে পাক্ষিক হিসেবে নান্দনিকও বেরোবে। আমার কথা শেষ না হতেই মাহমুদ ভাই বললেন, আর একটা কি যেন পত্রিকা ছিল, কি যেন নাম। আমি বললাম, ‘চিত্রিতা’। মাহমুদ ভাই বললেন, ওটা খুব ‘আগুন-পত্রিকা’ ছিল। শেখ সাহেবের ছবি ছাপিয়ে পত্রিকাটা একাত্তরে ব্যান্ড হয়েছিল। ফজলতো পালিয়ে বেঁচেছিল। ওর মাথায় যেমন নিত্যনতুন আইডিয়া খেলা করতো তেমনি ভরপুর ছিল সাহস। তবে এই সাহসটা ওর জন্য মাঝে মাঝে ক্ষতি টেনে আনতো।
জীবনে দীর্ঘকাল ধরে কোনো কাজ সে করতে পারেনি শুধু সত্য উচ্চারণের জন্য। এর মাঝে এসে গেছে চা আর পুরি। মাহমুদ ভাই চায়ে পুরি ভিজিয়ে খেতে খেতে বললেন, ফজলা থাকলে খুব ভালো হতো, আড্ডা জমতো। ফজল ভাই তখন মোবাইল ব্যবহার করতেন না। আমি উঠে অফিসের টিঅ্যান্ডটি নাম্বার দিয়ে বাসায় ফোন করে জানলাম তিনি বাসাতেও নেই। মাহমুদ ভাই আসার খবরটা তাকে দিতে পারলে তিনি খুব খুশি হতেন এবং হয়তো সাথে সাথে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসতেন অফিসে। দুই বন্ধুর গভীর আড্ডার উষ্ণতায় ডুবে যেতে পারতাম আমিও। মাহমুদ ভাই এবার সিগারেট ধরালেন। বললেন, ফজলার সাথে আমার যেমন জমে তেমন ঝগড়াও হয়। উত্তরে একটু হেসে আমিও বললাম, আমিই তো দুইবার আপনাদের ঝগড়া মিটিয়ে দিয়েছি। মাহমুদ ভাই হাসলেন। কি নিষ্পাপ শিশুর মতো হাসি! বললেন, তরঙ্গ না থাকলে নদী কি তার আসল রূপ খুঁজে পায়? মান-অভিমান আছে বলেই আমাদের সম্পর্ক ক্রমে গভীর হয়েছে। তিনি বললেন, তোমরা বোধ হয় জানো না, ফজলের একটা পকেট কবিতার বই ছিল। ছোট ছোট কবিতা। চার লাইনের। আমি তার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলাম। যে দিন আমি ভূমিকাটি লিখে নিয়ে ওর অফিসে যাই, ও সেটা পড়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল। কবি তো। জানোই তো কবিদের আবেগ অনেক বেশি। বলেছিল, সমকালের কবিরা আরেকজন কবিকে নিয়ে এরকম লেখা লেখে না। মাহমুদ আপনি আমার প্রকৃতই বন্ধু। এরপর জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী খাবেন? আমি তখন শক্তপোক্ত, আর একটু পেটুকও। বলেছিলাম, মোরগ পোলাও সাথে আস্ত ডিম। ফজলের বাসা থেকে আনা খাবার পাশে সরিয়ে রেখে আমরা সে দিন মনের আনন্দে মজেছিলাম ‘ক্যাফে ঝিলে’র মোরগ পোলাওতে। মাহমুদ ভাই উঠে যাওয়ার পর আমি আমার রুমে এসে বসলাম। আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন আর তাদের সান্নিধ্যগুলো আমার চারপাশ প্রদক্ষিণ করতে থাকলো। লেখা আর এগুলো না। কলম বন্ধ করে কাগজপত্র গুছিয়ে সাদেককে অফিস বন্ধ করতে বলে বেরিয়ে এলাম।
‘সমারোহ’তে আমার অনেক স্মৃতি। সমারোহের ডিক্লারেশন রের করতে গিয়ে সে এক মজার ঘটনা। ডিক্লারেশনের কাগজপত্রের সাথে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র দাখিল করতে হয়। ফজল ভাই কিছুতেই তা দাখিল করবেন না। তার এক কথা- আমি ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক ছিলাম। কবিতার জন্য বাংলা একাডেমী এবং একুশে পদক পেয়েছি। এ দেশের মানুষ আমাকে চেনে, জানে। আমাকে কেন সার্টিফিকেট জমা দিয়ে ডিক্লারেশন নিতে হবে? না, ফজল ভাইকে সার্টিফিকেট জমা দিয়ে ডিক্লারেশন নিতে হয়নি। তখনকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাকে সার্টিফিকেট জমাদান ছাড়াই ডিক্লারেশনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য আমাকে ফজল ভাইয়ের জন্ম-জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও যেতে হয়েছিল। আমার সাথে ছিল কবি ফারুক আফিনদী। খুব সকালে বাসে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে সেখান থেকে লঞ্চে চড়ে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছিলাম। কাজ সেরে সড়ক পথে ঢাকা এসে পৌঁছেছিলাম গভীর রাতে। সমারোহ অফিসটা ফজল ভাই সাজিয়েছিলেন খুব যতœ করে। অফিসে ঢুকেই বামপাশে যে বড় শীতাতপ কক্ষটি, সেটি ছিল ফজল ভাইয়ের ব্যক্তিগত রুম। মাঝখানে ছিল জেনারেল ম্যানেজার, একাউন্ট সেকশন এবং সম্পাদনা সহকারী ও রিপোর্টারদের বসার স্থান। আর শেষ মাথায় পাশাপাশি থাই ঘেরা তিনটি শীতাতপ রুমের একটিতে কাজের সময় ফজল ভাই বসতেন আর অন্যটিতে আমি। আর বাকিটায় কম্পিউটার সেকশন। কম্পিউটারের ইনচার্জ ছিল বিষ্ণুপদ রায়। তার সহযোগী ছিল মনিকা নামের একটি মেয়ে। ফজল ভাইকে সাহায্য করত তার হারুণ ডাইরির দীর্ঘদিনের সহচর জয়নাল। মাঝে বিরাট জায়গাজুড়ে বোর্ডটেবিলে জমতো আমাদের কথা কবিতার আড্ডা। আড্ডায় অধিকাংশ সময় জুড়েই ফজল ভাই বলতেন, আমরা শুনতাম। আমার উপর হঠাৎ হঠাৎ আদেশ হতো কবিতা পাঠের। আমি অধিকাংশ সময়ই ফজল ভাইয়ের কবিতা পাঠ করতাম। কেন জানি না ফজল ভাইয়ের কবিতার গভীরে আমি পৌঁছে গিয়েছিলাম। আর সে কারণেই খুব স্বাচ্ছ্যন্দেই আবৃত্তি করতে পারতাম। আমি পড়তাম আর সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো। এরপর শুরু হতো কমেন্টস। প্রথমে ফজল ভাইয়ের কবিতাটি নিয়ে তারপর প্রসঙ্গ ধরে অন্যদের। আমাদের আড্ডাগুলো ছিল নিরেট সাহিত্যের আড্ডা। রাজনীতি, অর্থনীতি, রণনীতি কোনো কিছুরই প্রবেশ ছিল না সেখানে। আমরা ক’জন মানুষ শুধু ‘কবি ও কবিতা’ কে নিয়ে কাটিয়ে দিতাম বেশ কিছুটা সময়। আজ ফজল ভাই নেই। বিষ্ণুপদ, যাকে দুষ্টুমি করে ফজল ভাই হরিপদ নামে ডাকতেন, সে ও হারিয়ে গেছে অনেক আগে। জ্বলতে জ্বলতে নিভে গেছে সমারোহের আলো। শুধু আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের হৃদয়ে সেই স্মৃতিগুলো নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে।


আরো সংবাদ


premium cement

সকল