২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

শতবর্ষে বিদ্রোহী কবিতা

-

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বাঙালি পল্টন ভেঙে ফেলে (মার্চ ১৯২০) কবি কাজী নজরুল ইসলাম পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে কলকাতায় চলে আসেন। এখানে তিনি পূর্ব পরিচয়সূত্রে মুজফ্ফর আহ্মদের সাথে তাঁর বাসায় বসবাস শুরু করেন। এ বাসায় ও অন্যত্র মুজফ্ফর আহ্মদসহ অন্য কবি-লেখক ও সম্পাদকের সংস্পর্শে, আড্ডায় এবং সর্বোপরি লেখা প্রকাশের সহজ সুযোগে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা প্রকাশ ও বিকাশের বেশ অনুকূল হয়। বিশেষত ‘মোসলেম ভারত’-এর বিভিন্ন সংখ্যায় ‘শাত-ইল আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি কবিতা প্রকাশিত হলে সাহিত্য মহলে তাঁর নাম-সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, বোদ্ধামহলে অনুভূত হয় তাঁর প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য। একই সময়ে মুজফ্ফর আহ্মদ ও তাঁর যুগ্ম সম্পাদনায় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ (১২ জুলাই ১৯২০) বের হলে তাতে তিনি চড়া ভাষায় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় লিখতে থাকেন, যার পরিণতিতে পত্রিকাটির জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত পত্রিকার প্রকাশনাও নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
নজরুল কলকাতায় এসে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা ছাড়াও রাজনীতির সাথেও জড়িত হন। সাহিত্যে তাঁর আত্মপ্রকাশের সময়খণ্ডে রচিত সাহিত্যে, বিশেষ ক’রে ‘অগ্নি-বীণা’ (১৯২২) কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে সেই রাজনৈতিক পটভূমি ও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। সেই প্রভাবেরই স্পষ্ট স্বাক্ষর মুদ্রিত ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে, তাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বীর সংগ্রামী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে বাঙালিদের পক্ষে রাখা ও যুদ্ধে নেয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধশেষে বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসন দানসহ নানা প্রতিশ্র“তি দেয়; কিন্তু যুদ্ধশেষে তারা সেই প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে আবার অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। জালিওয়ানাবাগে সমবেত জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি ক’রে গণহত্যা চালায়। সেই গণহত্যার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশপ্রদত্ত স্যার বা নাইট উপাধি বর্জন করেন। এ সময়ে বঙ্গ-ভারতীয় রাজনীতিতে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে ওঠে, কিন্তু তাতে ভ্রুক্ষেপ না-করে সরকার আধিপত্য পাকাপোক্ত করার জন্য গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট (১৯১৯) প্রণয়ন করে; পাশাপাশি সরকারবিরোধীদের ও বিপ্লবীদের দমন করার জন্য রাউলাট অ্যাক্ট জারি করে, প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ ক’রে তুরস্ক ভূখণ্ড ভাগ-বাটোয়ারা শুরু করে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের মুসলমানরা মাওলানা মোহাম্মদ আলি মাওলানা শওকত আলির নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন ও হিন্দু-মুসলমানরা মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এ দুই আন্দোলন চলছিল অভিন্ন ধারায় ও ঐক্যবদ্ধভাবে। এই প্রথমবার সমগ্র ভারতবাসী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অন্যায্য আচরণ ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একসাথে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। এ ঊর্মিময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা।
নজরুলের এ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি নজরুল-কবিতার সামগ্রিকতা ও স্বরূপ উন্মোচন করেছে। বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন এক স্বর শোনা গেল। শোনা গেল সম্পূর্ণ নতুন এবং মহৎ বাণী। সম্পূর্ণ এক শৈল্পিক আঙ্গিক দেখা গেল; অর্থাৎ বিষয় ও বিষয়াণুষঙ্গের উপস্থাপনেও অভিনবত্বের পরিচয় দিলেন তিনি। ফলে প্রকাশের সাথে সাথেই কবিতাটি সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২২ পৌষ সংখ্যায় সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় বিদ্রোহী প্রকাশিত হয়। অবশ্য আগের তারিখ দিয়ে (১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায়) মাসিক ‘মোসলেম ভারতে’ ‘বিজলীর অব্যবহিত পরে কবিতাটি প্রকাশিত হয়। বিপুল পাঠক চাহিদা থাকার কারণে ‘বিজলী’ পুনঃমুদ্রিত হয়ে দু’বারে ২৯ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল বলে মুজফ্ফর আহমদ শোনেন বলে উল্লেখ করেছেন। এর অব্যবহিত পরে মাঘ ১৩২৮ সংখ্যায় প্রবাসী, বৈশাখ (১৩২৯) সংখ্যায় সাধনা ও ২৬ শ্রাবণ (১৩২৯) সংখ্যায় ধূমকেতু প্রভৃতি কাগজেও কবিতাটি পুনঃমুদ্রিত হয়।
একই সাথে বোদ্ধা মহলে প্রশংসা ও রক্ষণশীল মহলে বিরূপ সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফলে সে সময়ে কবিতাটি সবার মনোযোগের ও পঠন-পাঠনের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কবিতাটির শিরোনাম অনুসারে সাহিত্য ও সাধারণ পাঠক মহলে নজরুলের নামের আগে অবলীলায় যুক্ত হয় ‘বিদ্রোহী’-বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
‘ধূমকেতু’তে পুনঃমুদ্রণের কৈফিয়ত দিয়ে লেখা হয়, ‘এই কবিতাটি প্রথমে ‘মোসলেম ভারতে’ বের হয়। পরে এটা ‘বিজলী’, ‘প্রবাসী’, প্রভৃতি পত্রিকায় উদ্ধৃত হয়। অনেক পাঠক কবিতাটি সম্পূর্ণভাবে পাবার জন্য ঐ সংখ্যার ‘মোসলেম ভারত’ কিনতে গিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেননা ঐ সংখ্যার পত্রিকা এত বেশি নগদ বিক্রি হয়ে গেছে যে, ‘মোসলেম ভারত’-এর গ্রাহকগণ ছাড়া এখন আর কাউকে দেয়া হচ্ছে না। সেই জন্য অনেকের অনুরোধে আমরা কবিতাটি ‘ধূমকেতু’তে উদ্ধৃত করে দিলাম। প্রার্থনা, কেউ যেন এটা আমাদের ধৃষ্টতা বলে মনে না করেন। সহকারী সম্পাদক
পরে ১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (অক্টোবর ১৯২২) নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’তেও দ্বিতীয় কবিতা হিসেবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি সঙ্কলিত হয়।
‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত কবিতাটি পরবর্তীকালে ‘ধূমকেতু’তে, ‘অগ্নি-বীণা’র বিভিন্ন সংস্করণে ও ‘সঞ্চিতা’য় কিছু স্তবক, পঙক্তি বর্জিত হতে দেখা যায়। এ বর্জন যে সব সময় নজরুলকৃত তা নয়, কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশকের অমনোযোগে বা ভুলেও হয়েছে। কারণ নজরুল পুনঃমুদ্রণকালে স্বভাবগত কারণে সেভাবে মনোযোগ দিতে পারেননি। তদুপরি তিনি সে সময় সাহিত্য, সাংবাদিকতায় ও রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিলেন। সেই ব্যস্ততার সুযোগে ও প্রকাশকের ভুলে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থেকে উল্লেখযোগ্য দু’টি পঙক্তি বাদ পড়ে যায়,
আমি সন্ন্যাসী, সুর সৈনিক
আমি যুবরাজ, মমরাজ বেশ ম্লান গৈরিক।
এ দু’টি পঙক্তি গৌতম বুদ্ধের অনুষঙ্গ বৌদ্ধ স্মারক, এ কবিতায় হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান মিথ বা ঐতিহ্যের ব্যবহার আছে। তার পাশাপাশি এ পঙক্তি দু’টি বৌদ্ধ মিথ-ঐতিহ্যের। কবিতাটিতে এ প্রধান চার ধর্ম-সম্প্রদায়ের মিথ- ঐতিহ্যের ব্যবহার নজরুল সচেতন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেছেন। ফলে কবিতাটি হয়ে উঠেছে বাঙালির জাতিসত্তার পূর্ণাঙ্গ স্মারক। তাই উক্ত পঙক্তি দু’টি বর্জনের কোনো সুযোগ নেই।
নজরুলের বিদ্রোহ শুধু তৎকালীন সমাজ-রাষ্ট্রের অত্যাচার-দুঃশাসনের বিরুদ্ধেই নয় বরং তা চিরকালের শোষণ-অত্যাচার, দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও। তাঁর নির্ঘোষ ও শৈল্পিক উচ্চারণে তা স্পষ্টতর, মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতদের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম-রণ-ভূমে রণিবে না।
এ বিদ্রোহের আন্তর্জাতিক রূপটিও স্পষ্ট করেছেন নজরুল, ‘আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার/নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার।’ অত্যাচারী ক্ষত্রিয় রাজা কার্তবীর্ষ ও তার অনুসারীদেরকে পরশুরাম তাঁর ধারালো কুঠার দিয়ে একুশবার হত্যা করে বিশ্বকে ক্ষত্রিয়মুক্ত করে শান্তি স্থাপন করেন। এ আন্তর্জাতিকতাবোধ বিদ্রোহী কবিতাটিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের শোষিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত গণমানুষের মুক্তির প্রেরণামন্ত্রে রূপ দিয়েছে। ফলে বিদ্রোহী বাংলা-বাঙালির ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক কবিতার মর্যাদায়ও অধিষ্ঠিত। বিশ্বসাহিত্যের আলোচক, সমালোচক ও সাহিত্যিকরা এ জন্যই বিদ্রোহী কবিতাটিকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা বলেছেন।
শতবর্ষ আগে রচিত এ কবিতাটি শতবর্ষ পরেও সমান আবেদনময় ও আবেগ-উদ্দীপনা সঞ্চারী। মানবজাতির সংগ্রাম ও বিদ্রোহ যেমন চিরকালীন, তেমনি বিদ্রোহী কবিতাটিও চিরকালীন, কালজ হয়েও তা কালোত্তর, কালোত্তীর্ণ।


আরো সংবাদ


premium cement