২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

আড়ালে থাকা কয়েকজন কবি

আড়ালে থাকা কয়েকজন কবি -

একই সময়ে যাত্রা শুরু করে এবং দীর্ঘকাল লেখার ভেতর থেকেও অনেকেই নানা কারণে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারেন না। বাংলাদেশে সাহিত্যের যে আবহাওয়া, তাতে লেখক নিজে খুব উদ্যমী হয়ে এগিয়ে না এলে তাকে অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিতির অসুবিধায় ভুগতেই হয়। টিক এটাই ঘটেছে এই পাঁচ কবির ক্ষেত্রে যাদের নিয়ে আজকের এই আলোচনা। কবিরা হচ্ছেন শেখ ফিরোজ আহমদ, কাজল কানন, শামীম সিদ্দিকী, চঞ্চল আক্তার ও হান্নান কল্লোল।
শেখ ফিরোজ আহমদ (১৯৬৩, চাঁদপুর) আশির প্রজন্মের কবি। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন বা তারও আগে থেকে তিনি কবিতায় সক্রিয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্বর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার লেখালেখি ও সংশ্লিষ্ট ভাবনার পালে জোর হাওয়া দিয়েছিল জানি। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর মাঝখানে কিছু বছর বোধ হয় লেখালেখিতে ভাটা পড়েছিল। কিন্তু একজন প্রকৃত কবি শেষ পর্যন্ত না লিখে থাকতে পারেন না। পারেননি শেখ ফিরোজ আহমদও। গত ১০-১৫ বছরে সৃজনশীলতার যে স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন তা উল্লেখ্য। ওই সময়পরিধির মধ্যে তার একাধিক কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে যার ভেতর ‘ঘুম ও তন্দ্রার ডাকাডাকি’ নামের একটি বইও আছে।
শেখ ফিরোজ আহমদকে সহজ হওয়ার সাধনা করতে হয়নি। গোড়া থেকেই তার কবিতা সহজ ও সাবলীল। সহজভাবে লিখেও কবিতাকে কতটা অভিঘাতী করে তোলা সম্ভব তা আমরা সুধেন্দু মল্লিক, তারাপদ রায়, মুস্তফা আনোয়ার, মিজান রহমান প্রমুখের কবিতায় দেখেছি। ফিরোজ ভাষা সহজতার ভেতর দিয়েই অভীষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে চেয়েছেন। অনেকখানি সফলও হয়েছেন। তার কবিতার ভাষা সাদামাটা হলেও ভাব বা ভেতরের কথা যে চট করে বুঝে ফেলা যাবে এমন নয়। তার কাব্য সম্পূর্ণ অনুধাবনের জন্য কখনো কখনো একাধিক পাঠ দাবি করে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। নমুনাস্বরূপ তার কবিতার কিছু পঙ্ক্তি দিচ্ছি-
১. যা ছিলে সেই তুমিই আছো/একটুও বদলাওনি,/ ভালোবেসে/অন্তর কালো ছাই/নাই কিছু, আছে কিছুটা হোঁচট/অতীতের (তেমনই আছো)
২. কস্মিনকালেও প্রেম মানেনি বাধা,/ বিষ ও মধু ফুলেরই দুই বোন/ প্রজাপতি দকায় ফি বছর। (লাড্ডু)
৩. ওই বনাঞ্চল থেকে আসে ঘুম।/ হরিণের পায়/বাজে রুনু ঝুনু-)/ গায় অরণ্য অঞ্চল (ঘুম)
৪. সহজ শর্তে/ কিস্তিতে/ ভালোবাসা নাও- পক্ষকাল বিরতিতে/ একটি করে শুধুই চুমু (এই ঋণ আমার ভালো লাগে)
৫. স্টিল ফটোগ্রাফ/ নীল সাদা রঙ শরৎ আকাশ (একটি ফটো)
ফিরোজের কবিতা উত্তরকালে এই সংক্ষিপ্ততা বর্জন করে বেশ প্রগলভ হয়ে উঠেছে। তার এখনকার কবিতা অনেকটাই ছড়ানো। শিথিল বুনট-এর লক্ষণীয় এক দিক। কবিতায় বেশি কথা বললে অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা ঢুুকে পড়ে। ফিরোজের বেলায়ও তাই ঘটেছে, অনেক কবিতায়। শেখ ফিরোজ আহমদ ছোট ছোট কবিতায় বেশি সফল। অল্প কথা ও অনিবার্য শব্দ-কল্পনার মূল্য বোঝা যায় ওই সব লেখায়।
কাজল কানন (১৯৭১, হোমনা, কুমিল্লা) নব্বইয়ের প্রজন্মের কবি। ইনি পেশায় সংবাদপত্র কর্মী। অথচ মিডিয়ার মাঝখানে থেকেও লেখা প্রকাশের ব্যাপারে এর সুবিধা নিয়েছে খুব কম। কাজল আসলে গোড়া থেকেই বিরলপ্রজ। ইনিও কবিতার সহজ পথের সন্ধান করেন। নিচু গলায় কথা বলেন। তার ভেতরেই নিজের বলবার কথাটি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন এবং এই কাজে প্রায়ই সফল হন। কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাজির করছি-
ক. সায়েদাবাদের সাথী হোটেল, তোতা মামার/ ছাত্র ইউনিয়ন সব আছে/কেবল তোতা মামার প্রেম বিক্রি হয়ে গেছে ত্রিশ হাজার টাকা যৌতুকে। (আমাদের ছেলে বেলা)
খ. সংসার বড়/মনোহর জিনিস; এই পৃথিবীতে মনোহর দু’একটা ব্যাপার/থাকলেই চলে (পরান ব্যাপিয়া যাও)
গ. আরো কিছু পর বুঝতে পারি- কেউ না/ থাকলেও গল্প চলতে থাকে চরিত্র পুড়তে।/ তারপর ছাই ফুঁড়ে মাথা তোলে তোমার গ্রাম (তোমার গ্রাম)
কাজল কাননের কাব্যগ্রন্থ ছয়টি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘পাতার কোলাহল’ গ্রন্থে তিনি তার কাব্যসমার্থ্য সবচেয়ে ভালো করে প্রকাশ করতে পেরেছেন। এই বইয়ের বেশ কিছু কবিতায় ভাষার সহজতার সাথে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব সুন্দরভাবে মিশেছে। সে রকম কয়েকটা কবিতা হচ্ছে ‘বেধো হয়’, ‘সহমরণে নাই’, ‘সর্বপ্রাণ’, ‘আমাদের ছেলেবেলা’। ‘সর্বপ্রাণ’ নামের লেখাটি, আমার মনে হয়, অল্প কথার ভেতর দিয়ে বেশ ভালোভাবে মনোভাব ফুটিয়ে তোলার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পড়–ন পুরো কবিতাটি- ‘পাতা আর পাতা/তারা সম্পর্কে কী? ঘাসের সাথে জড়াজড়ি করে শুয়ে পড়লো রোদ/ তারে বা কী বলি/ মায়ের গালে যে টোল দেখেছিলেন বাবা তার নামও প্রকৃতি/ মানুষ সেখানে এক প্রকারের বনায়ন/সেখানে অন্য কিছুরও আছে।’
কাজল কাননের কোনো কোনো কবিতায় স্বীকারোক্তি প্রধান কবিদের ঢঙ এসেছে বেশ খানিকটা। যেমন ১. ‘না ঘুমে না জেগে/ কোনো স্থিতাবস্থা নেই, তবুও আমরা জলাধার ভালোবাসি কখনো কখনো মনে হয় রুই-কাতলার চেয়ে বেশি;/ এই ধরনের মনে হওয়া আমাদের চরম অসুখ।/এই প্রকার অসুখে-বিসুখে আমাদের রোপণ করা/সকল চারা গাছ বিকারে ভরা’।
২. ‘আমাদের আধুনিক মন নেই, মনে হওয়াও নেই; তাই তোতা মামার বিপ্লবী রাজনীতি চেড়ে যাওয়ায় আমাদের কিছুই মনে হয়নি।’
এক একজন কবির দেখার ধরন এক এক রকম। লেখার স্টাইলেও পার্থক্য থাকে। মাঝারি মানের কবিদের ক্ষেত্রে সেটা এক নজরে চোখে পড়ে না। খুঁটিয়ে পড়লে তা বোঝা যায়। কাজলেরও নিজের একটা ঢঙ আছে। ‘প্রকল্প’ কবিতায় শেষ অংশে তিনি লিখেছেন ‘সব কিছু কাটাকুটি শেষে/আমাদের হৃদয় এখন মনিহারি দোকান’। ‘বোধোদয়’ কবিতার শেষ দু’লাইন হচ্ছে ‘ঘুমিয়ে আমি অল্প দেখি, জেগে দেখি না কিছুই/মানুষ দেখা হয়ে গেছে, এবার দেখব বাবুই।’ এ ধরনের উচ্চারণ কাজল কাননের অনুভবী মনটিকে বেশ চিনিয়ে দেয়। তার উপলব্ধির জায়গাগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে
শামীম সিদ্দিকীর (১৯৭২, কিশোরগঞ্জ) আবির্ভাব নব্বই দশকের মাঝামাঝি নাগাদ। তিনি যখন ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করতেন সে সময় তার অল্প কিছু কবিতা পড়েছিলাম লিটল ম্যাগাজিনে। তখনই বোঝা গেছে তার কবিত্বের ধরনটি। ‘অচেনা ফুলের লোখে; (২০০৯) নামের বইটি হাতে আসার পর তার সম্বন্ধে আমার ধারণা আরো পরিষ্কার হয়। শামীমের ভাবুকমনের প্রতিভাস ধরা পড়েছে এমন কিছু পঙ্ক্তি তুলে দিচ্ছি-
১. তোমাকে বলিতে চাই ‘হাই’, বলে লাভ নাই/হাই তুলে বসি গিয়ে রাইয়ের কানাই দূরে, সুরে/অযুত কামনা শাখা তমাল হিজল দোলে ঘন বন, চাঁদ/ শিশির মাদল বাজে, আমার না নাই-(ডিজিটাল)
২. মহাকাল কিছু দুমড়ে চুমড়ে গেছে/ আয়ু পতনশীল পাতামাত্র (বিভ্রম)
৩. একটা ট্রেনের চাকা ঘুরে গেলে গ্রামের সকাল/জন্মভূমি, প্রবল বাতাসে কেটে উড়ে চলে মন/ট্রেনের দু’পাশে বৃষ্টি, অবিরত প্রশান্ত প্রবল/ কত মাঠ, জলাশয়- ফসলের মোহকেটে কেটে/ ট্রেন চলেমায়ের স্নেহের কাছে, সুগন্ধনগর/ আমার ঘরের পাশে থোকা থোকা গোলাপ ফুটেছে (সুগন্ধনগর)
যে লেখক বলতে পারেন, ‘আয়ু পতনশীল পাতামাত্র’ কিংবা ‘ট্রেন চলে মায়ের স্নেহের কাছে’ তার কবিত্বে সংশয় জাগে কি? তবে একটা অভিযোগ আছে আমার। কবিতা তো নিরন্তর সাধনার বিষয়। এই শিল্পের পেছনে তিনি যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন না। দীর্ঘদিন শামীম সিদ্দিকীর কবিতা পড়িনি কোথাও! তিনি কি আর লিখতে পারছেন না? নাকি লিখছেন, ছাপতে দিচ্ছেন না?
যাই হোক, তার কবিতা আমাকে স্পর্শ করে; ভাবায়। ‘সুগন্ধনগর’ কিংবা ৪+৪+৪ লাইনে সজ্জিত ওই ধরনের কবিতাগুলো লেখকের প্রথানুগত্য প্রকাশ করছে। পাশাপাশি ‘অন্তর্দর্শন’, ডিজিটাল’-এর মতো কবিতাগুলোয় তিনি স্বাতন্ত্র্যপ্রয়াসী এসব রচনায় শামীমের নিজস্ব স্বর টের পাওয়া যায়। আর কেবল ভাষা-ভাবনায় নয়, কবিতার শরীর গঠনের বেলায়ও তিনি বৈচিত্র্য এনেছেন। লক্ষণীয়, ‘ডিজিটাল’ শিরোনামের কবিতাটি ইংরেজি এস (ঝ) অক্ষরের প্যাটার্নে সজ্জিত।
আরেকটি কথা, পৃথিবীর অসংখ্য কৃতী কবি সামান্য জিনিসের ভেতর অসামান্য কিছু আবিষ্কার করেছেন। একই বিষয় আমি শামীমের একাধিক কবিতায়- লক্ষ করেছি। তিনি লিখেছেন (ক) ‘সামান্য বালুর ভেতর/ কতই না আনন্দ আছে/ ক্ষীতি আছে, অপ আছে/ অফুরন্ত মরু/’ (অন্তর্দর্শন)
(খ) বালকেরা খেলা করে গাছের ছায়ায়/ বালকেরা ছন্নছাড়া কোথায় চেঁচায়?/ বালকেরা অগ্নিবিস্ফোরণে/ মহাশূন্য হাতে লয়ে নাচে।
তার নতুন বই তার প্রতি আমাদের আরো মনোযোগী করে তুলবে আশা করি।
চঞ্চল আক্তারের (১৮৬৯, কুলাউড়া (সিলেট) কবিতা আমি প্রথম পড়ি প্রায় বিশ বছর আগে। ‘বুনো খয়েরি ফুল’ (১৯৯৯) কাব্য গ্রন্থটির মাধ্যমে তার কবিতার সাথে আমার পরিচয়। ওই বইটিতে ছিল নবাগত কবির আবেগ, উচ্ছ্বাস, অস্বচ্ছ কল্পনা। চার/পাঁচটি মানসম্মত কবিতাও ছিল। প্রায় দু’দশক পর প্রকাশিত ‘নিশাচরের খোয়াবনামা’ (২০১৯) কাব্যগ্রন্থে দেখতে পাচ্ছি, ওই আবেগ অনেকখানি সংযত, উচ্ছ্বাস স্তিমিত এবং কবিকল্পনা মর্মগ্রাহী। চঞ্চল কবিতার আঙ্গিক নিয়ে মাথা ঘামান না। মনে যখন যে ভাবের উদয় হয় তখন তা অবিলম্বে লিখে ফেলেন, আমার এমনটাই ধারণা। তিনি এ যুগের লেখক। কিন্তু ঊনিশ শতকের স্বভাব কবিদের সাথে তার মিল অনেক, ঠিক যেমন আমরা দেখেছি আশির প্রজন্মের শক্তিমান কবি মিজান রহমানের ক্ষেত্রে। চঞ্চল কি ধরনের পঙ্ক্তি ব্যবহার করেন তার কবিতা, দেখুন)
ক. ঘুমন্ত নিঃশ্বাসেরা কাঁপছে/ বুকের শান্ত ঢেউয়ের মতো উঠছে নামছে। বড় ক্লান্তি ফুটে থাকে/বিছানার চাদরে আঁকা জ্যান্ত ফুল/ গন্ধ ছড়ায় দেখি, ভাবি/ তবু ভ্রমর হতে পারি না।
খ. মৃত্যু যেন এক সোনালী পাতা ঝরা/তারা খসা যেন/জলে ঢেউ কিংবা কেউ ছিল না কখনো।
গ. লক্ষ্মী আমার, মরে যেতে পারি/রোদঝরা যে কোনো রাতে।
ঘ. তুমি এলে যখন/আমার কাছে তখন/জীবন ছিল না। গলায় ঝুলছিল/ বাঘ-নখ আর কানা পয়সার মালা/নখের বাঁকানো অংশে/তখনো মাংসের গন্ধ ও অন্যান্য/ সমস্ত শরীর মন ছিল ব্যাপক ফোঁড়ার মতো/ উত্তপ্ত ও পুঁজভরা/ আমি তা দিতে থাকলাম তোমারই হাতে।
ঙ. জোনাকির আলো, নাকে হাস্নাহেনার গন্ধ/ আমি ছাড়া কেউ নেই-/ এ রকম নিঃশব্দ মৃত্যু-/ দেখতে দেকতে হারিয়ে যাওয়া!/ ডানা ঝাঁপটানো সময় পাখির পালকেরা ঝরে যায় কালের বাতাসে।
রাত ‘রোদঝরা’ এমন কবিকল্পনা এবং শরীর-মন ‘ফোঁড়ার মতো’ এমন উপমা অবশ্যই ব্যতিক্রমী। তবে প্রতীকের ব্যবহার তেমন একটা চোখে পড়ল না। ইঙ্গিতের প্রয়োগও খুব কম। চিত্রকল্প, বাকপ্রতিমা প্রভৃতি বিষয়ে লেখক আরো সতর্ক হলে তার কবিতা ঋদ্ধতর হবে। অনেক কবিতায় তিনি দ্রুত এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। বার প্রসঙ্গবদল কবিতাকে দুর্বল করে দেয়। শাহবাগ, অনন্তের নাগরিক, ব্যর্থতা অন্য রকম সময় প্রভৃতি কবিতা এই দোষে আক্রান্ত। মাঝরাতে ফুল ফোটে, মৃত্যুরথ, নিশাচরের খোয়াবনামা শিরোনামের কবিতাগুলো এই ত্রুটি থেকে মুক্ত। চঞ্চল এমন এক সময়ে লিখছেন যখন পৃথিবীর কবিতাঙ্গনে বহু কিছু ঘটে গেছে। বিংশ শতাব্দীতে যেসব সাহিত্য আন্দোলন হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার নানা দেশে সেগুলোর প্রভাব ও পরিণতি সম্বন্ধে জানার প্রয়োজন আছে। চঞ্চল আক্তারের স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্বের সঙ্গে এসব যুক্ত হলে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সচেতন অনুশীলন সম্ভব হলেই কেবল কবির এক উজ্জ্বল ভাবমূর্তি অর্জন সম্ভব হবে তার পক্ষে।
হান্নান কল্লোল (১৯৬৮, গৌরীপুর, ময়মনসিংহ) নব্বইয়ের প্রজন্মের কবিদের সমবয়সী। কবি হিসেবে তার আত্মপ্রকাশও নব্বইয়ের দশকে। নিভৃতচারী এই লেখক আড়ালে থেকেই কাব্যসাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন। খ্যাতিমান হওয়ার র্যাটরেসে তিনি শামিল হননি কখনোই। নিজের মনের আনন্দ-বিষাদকে শব্দরূপ দিতে পারলেই তিনি খুশি। পত্র-পত্রিকায় কবিতা ছাপার জন্য তৎপরতা আছে বলে মনে হয় না। তার কবিতা আমি প্রথম পড়েছি বছর দশেক আগে। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ‘পোড়ামাটির বিষাদবাড়ি’ নামে হান্নানের একটি কাব্যগ্রন্থ বের হয়। বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে তো একজন লেখককে ঠিক বোঝা যায় না। বইটা হাতে আসার পর তার দৃষ্টিভঙ্গি ও কবিতার ধরন সম্বন্ধে আমার সম্যক ধারণা তৈরি হয়।
বাংলা কবিতার প্রথাগত কর্মকেই অনুসরণ করেছেন হান্নান কল্লোল। কিন্তু তার বলার ধরন এমন যে, তার ভেতরেই কবিতার নিজত্ব ফুটে ওঠে। এই লেখকও কাব্যভাষায় যথাসাধ্য সহজ হতে পেরেছেন। তার কবিতার কিছু পঙ্ক্তির স্বাদ নিন-
১. ভালোবাসার ভেতরকার মিথ্যাচারের মতো/ তোমার মুখোশি হৃদ্যতার নিকুচি করি বারংবার-/ গিরগিটির রঙ বদলের চাইতেও দ্রুত বুরি পালটাও তুমি। (হৃৎগোলাপের উৎসর্জন)
২. কই গেলা রূপালি চিতল মাছ,/ কার, পুকুরের কোন তলদেশে/ লুকায়া জাড় পোহাও এ কলা! (এক পেগ শতি ঋতু)
৩. পরিপাশ্বজুড়ে ধোঁয়াটে সৌন্দর্যের ফুলন্ত প্রভাব থেকে ছিটকে পড়ে শাদা প্রজাপতি-/ ডোনার বিস্তারে উড়ন্ত বিভা ঘেঁষে নীলভাডা পাখি চলন্ত মেঘে খুঁজে ফেরে আশ্রয়-/ ইত্যবসরে স্বপ্নবিচ্ছরিত প্রস্থান বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমি গুনতেই থাকি দ্রোহতরঙ্গ- (গন্তব্যমুখী কচ্ছপগতি)
৪. আগ্রাসী রাষ্ট্র আমার, অন্ধের পাতিল ভাঙার লেখাটি/ অন্তত একটিবার আমাকে দেখতে এবং খেলতে দাও। (খেলা তো খেলাই)
দেখা যাচ্ছে তার কবিতার সুর কখনো আকুতিময়, কখনো কৌতুকপ্রদ, কখনো আবার ব্যঙ্গাত্মক। কবিদের অনেকেই রাজনীতি বিষয়ে উদাসীন। হান্নান কিন্তু পুরো মাত্রায় রাজনীতিচেতন। তাই তিনি বলতে পারেন ‘প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রযন্ত্র তুমি, নও তো কাদামাটির পাতিল! তোমার জারিকৃত শাসনতন্ত্র কোনো লাঠি নয় বাঁশের।’ ঠাট্টার মেজাজ তার আগের কবিতাগুলোতেও বিদ্যমান। নতুন এই বইয়ে তা আরো ঘনবদ্ধ হয়েছে। যেমন, আপনের কানের মইধ্যে গণতন্ত্রের গলিজ ঢুকতেছে/ নাকের সামনে জাতীয়তার বিগলিত দুর্গন্ধ ভাসতেছে/ গলার ভিতরে বাকপরাধীনতার কাঁটা আইটকা রইছে/ চোখের কর্ণিয়া ঘিরে প্রতি স্বাধীনতার তমসা নামতেছে।
এই লেখক কবিতায় টানা গদ্যও ব্যবহার করেছেন। সে রকম দুটি কাব্য হচ্ছে ‘দেশলাই ও গোলাপের রাত্রি’ ও ‘বুকের কন্দরে কতো বারুদ।’ প্রথমটিতে ‘কবিতা’ আছে গ্রহণযোগ্য পরিমাণে। শেষের দিকের পঙ্ক্তিগুলো এ রকম, ‘আজ খাবো না কিছুই।/ বারুদ ফুলের গন্ধমাখা অন্ধকার পান করে ঘুমিয়ে পড়বো মলিন/ বিছানায়। শোয়ার আগে বিদ্যুৎ চলে এলে লাল পানজাবিটা আবার পরে/ নেবো। ঘুমে প্রেম কিংবা প্রতিবাদের কোনো স্বপ্ন ধরা দেয় যদি!
যদিও অনেক লেখাতেই ভাব-কল্পনা সার্থক রূপ পায়নি, তবু সামগ্রিকভাবে হান্নানের কবিতার পরিমণ্ডলটি স্বরুচি চিহ্নিত। এই জায়গায় তিনি আলাদা, সব ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই।


আরো সংবাদ


premium cement