০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`
ব ই আ লো চ না

মাধুরিমা : নারী-অধিকার সংগ্রামের ইশতেহার

-

মাধুরিমা বইটি সম্পর্কে শুরুতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে একটা কথা বলে ফেলা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে আমাদের অবহেলিত নারী সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার প্রতিটি নারীকে অন্তত একবার করে হলেও বইটি পড়া উচিত। কারণ বইটিকে নিছক উপন্যাস না ভেবে চলমান নারী অধিকার, ক্ষমতায়ন ও লড়াই সংগ্রামের একখণ্ড ইশতেহার বলা যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিপরীতে নানান বাধা-বিপত্তি, উপেক্ষা, গ্লানি-বঞ্চনা ও লড়াই সংগ্রামের মূর্তিমান প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠা একজন নারী মাধুরিমা পাঠের মাধ্যমে সমাজের একেকজন নারী নিঃসন্দেহে নিজেকে কানেক্ট করতে পারবে।
শক্তিমান লেখক ও কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ আলী তাঁর গল্পে দক্ষ মুন্সীয়ানায় বঞ্চিত নারী গোষ্ঠীদের প্রতিনিধি ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মাধুরীমাদের জীবন আখ্যান নিদারুণ বাস্তবতায় পরম যত্ন ও মমতায় তুলে এনেছেন। কেননা তিনি সাধারণ মানুষের জীবন দেখেছেন নিবিড়ভাবে এবং জীবন উপলব্ধি করেছেন বলেই তাঁর গল্পে সুন্দরভাবে এসব সূক্ষ্ম ও স্থুল বিষয়গুলো চিত্রিত হয়ে উঠে এসেছে। তাঁর গল্পে সমাজ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই-সংগ্রামের পরিচয় মেলে।
পৃথিবীর ইতিহাসের মতো দারিদ্র্যের ইতিহাসও প্রাচীন- একথা বলা যায়। সমাজ অর্থনৈতিক কাঠামোয় পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারণার মধ্যে বেড়ে ওঠা নারীদের জীবনে চলমান চ্যালেঞ্জগুলো তিনি রীতিমতো চোখে আঙুুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ঘুণেধরা বিধ্বস্ত এই সমাজ কঙ্কালের ওপর কল্পনার অস্থিমজ্জা মিশিয়ে লেখক সৃষ্টি করেছেন সফল একেকটি চরিত্র। লেখকের বাস্তবলব্ধ জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও কল্পনায় চরিত্রগুলো বেশ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনা ও চরিত্রের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনী পেয়েছে প্রত্যাশিত গতি ও মাত্রা। উপন্যাসের বর্ণিত চরিত্র শিবলি এই যুগের আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ছেলে হয়েও প্রাগৈতিহাসিক ধ্যানধারণা লালন করা আপাদমস্তক একটি মানুষ। যে প্রতি পদে পদে মাধুরিমাকে যাবতীয় অভাব বঞ্চনা ও গ্লানির বিপরীতে বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করেছে। অথচ একজন স্বামী হিসেবে মাধুরিমাকে এগিয়ে যেতে কিংবা আত্মনির্ভরশীল হতে তার সাহস সমর্থন সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রগুলোও বেশ সাবলীল ও গতিময়তা পেয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চরিত্র বেশ চমৎকার ও যথেষ্ট মানবিক। বিশেষ করে মাধুরিমার দাদীমা, পিতা প্রফেসর আসগর আলী কিংবা ছোট মা নিলুফার নিলু ও আবুল বাশার সাহেব চরিত্রগুলো বেশ উপভোগ করেছি। মাধুরিমার জীবনে এরকম কিছু কিছু মানুষের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, অবদান অনিবার্য ছিল। রুবি, রিয়া ও তিতলিদের চরিত্রগুলো দারুণ ছিল। বিশেষ করে রুবি ও তিতলি চরিত্র দুটোর কথা না বললেই নয়, আলাদাভাবে দাগ কেটেছে। আর পরিশেষে বলব, শিবলি ও কবি শৈবাল কিংবা ইলিয়াস ফিরোজরা সমাজের একেকটি ক্ষত। যে সমাজে এমন অসুস্থ নোংরা মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ থাকে সে সমাজের গল্প একটু ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর মাধুরিমারা হচ্ছে বদলে যাওয়া সমাজ বাস্তবতার ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ওঠা একেকটি জীবন্ত ফিনিক্স পাখি।



আরো সংবাদ