১২ এপ্রিল ২০২১
`

কারেনদের ওপর বোমাবর্ষণ ও মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা

-

পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিতাড়নের পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এবার কারেন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালিয়েছে। ক্যুর পর সে দেশে এ পর্যন্ত ৫৫০ জন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও এ সংখ্যা ২০০০ পর্যন্ত হতে পারে মর্মে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়। ২০১৭ সালে পলায়নরত রোহিঙ্গাদের ওপরও সেনা ও সীমান্তরক্ষীরা গুলিবর্ষণ করে এক দিনেই ছয় হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে হত্যা করে এক নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। এখন ওই সব রোহিঙ্গা নিজেদের আবাসভূমিতে কেউ নেই। মিয়ানমার সরকার সামরিক ও শিল্পাঞ্চল করার প্রস্তুতি নিয়েছে সেখানে। সামরিক স্থাপনা তৈরি হলেও শিল্পাঞ্চল করা অত সোজা নয়। জনশূন্য এলাকায় জনসমাবেশ না হলে শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে অনেক সময় প্রয়োজন।
মিয়ানমারের হিসাব মতে, ৭ লাখ ৪০ হাজার জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ছুটে এসেছে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে। সে আজ তিন বছর হলো। আরো কিছু রোহিঙ্গা চুপিসারে বাংলাদেশে ঢুকে বিভিন্ন জনপদে মিশে গেছে। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ঠেলে দেয়ার কর্মসূচির নামকরণ করেছে, ‘রোহিঙ্গা ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’। মিয়ানমারের বিভিন্ন স্টেটে স্বাধীনতা ও বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন চললেও কোনো স্টেটের অধিবাসীদের এমন ব্যাপকভাবে দেশ ছাড়তে হয়নি। অথচ মিয়ানমার দাবি করে রোহিঙ্গাদের কখনো ‘পুশ করা’ হয়নি। এভাবে ওদের মিডিয়া বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে আসছে।
বাংলাদেশে মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে; এত দিনে তাদের সন্তান-সন্ততিও লাখ খানেক। জীবন বাঁচাতে ওরা বাংলাদেশ ও কিছু ভারতে আশ্রয় নেয়। ২০১৭ সালের আলজাজিরার রিপোর্টে জানা যায়, ৪০ হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে ভারতে গেছে। তাদের সেখান থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার।
দুইজন মিয়ানমার নাগরিক ভারতের আদালতে সরকারি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করে। ভারতের ডেপুটি ইন্টিরিয়ার মিনিস্টার কিরন রিজিজু ‘পার্লামেন্টে বলেন, ‘এরা অবৈধ উদ্বাস্তু’। ‘যথাযথ ডকুমেন্ট ছাড়া যারা ভারতে রয়েছে সেই ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে।’ অনেকেই বলেছেন তাদের মধ্যে টেররিস্ট অর্গানাইজেশনের সদস্য রয়েছে যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ১৯৮২ সালের মিয়ানমার সিটিজেনশিপ আইনে এসব রোহিঙ্গাকে ‘বাংলাদেশী অবৈধ উদ্বাস্তু’ হিসেবে বণর্না করা হয়েছে। ভারত ১৯৫১ সনের জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তু কনভেনশন এবং ১৯৬৭ উদ্বাস্তু প্রটোকলে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ নয়। কিন্তু উদ্বাস্তুদের বিষয়ে ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ১৪ তে ‘রাইট টু ইকুয়েলিটি’ এবং আর্টিকেল ২১ ও ৫১সি ধারায় ‘রাইট টু লিবারটি’র উল্লেখ রয়েছে।
মিয়ানমারের সেনা শাসনের শিকড় অনেক গভীরে। সেনারা সাধারণ প্রশাসনে অনেক পদ দখল করে আছে। বড় বড় বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান তারাই পরিচালনা করে। সেনা পরিবারের লোকরাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেশি পায়। একই জনগোষ্ঠীর কেউ বিত্তবান কেউ নিঃস্ব। সেনা ইনস্টিটিউশন এখন সে দেশে সমাজের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে।
রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান করে জেনারেলরা আবারো অন্ধকার অতীতের শাসনে ফিরে গেছেন। শীতের প্রভাতে যখন সবাই উষ্ণ আবরণে সুখ নিদ্রায় নিমগ্ন তখন সেনাদের দল অং সান সু চিসহ এনএলডির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। রাজধানী নেইপিডোতে ৮ নভেম্বর ২০২০-এর সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম সংসদ অধিবেশনের জন্য ৪০০ জমায়েত হয়েছিলেন। এমন এক মোক্ষম সময়ে সেনারা অভিযানের কাঁচি চালায়, এক বছরের ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে এবার দিয়েছে মার্শাল ল। ক্ষমতা গ্রহণের কারণ দেখানো হয়েছে, নির্বাচনে সু চি জাল-জালিয়াতি করেছেন। সেনাপ্রধান মিং বলেছেন, ‘আমি সংবিধান মেনে চলব।’ মি. মিং সংবিধানের ৩১৭ ধারার কথা তুলেছেন যেখানে ইমার্জেন্সি ও সেনাদের ক্ষমতাগ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। তবে মার্শাল ল দেয়াতে আর সংবিধান মেনে চলার প্রয়োজন নেই, সেনাদের আদেশই আইন।
২০০৮ সালের সংবিধানটিও সেনাদের ড্রাফট করা একটি দলিল। যার মাধ্যমে সেনাবাহিনী আধা বেসরকারি ধরনের একটি প্রশাসন চালায়। ৪১৭ ধারার মাধ্যমেই মিং অং দেশে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে সাংবিধানিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাগুলোকে কুক্ষিগত করেছেন। আবার এক বছর পর সাধারণ নির্বাচনেরও ঘোষণা দিয়েছেন। বিধানানুসারে স্টেট ও পার্লামেন্টে সেনাবাহিনী ২৫ শতাংশ পদ ধারণ করবে এবং ডিফেন্স ও সিকিউরিটি খাতে তিনটি কেবিনেট পদ সেনাদের দিতে হবে। মিয়ানমার সংবিধান পরিবর্তনের জন্য ৭৫ শতাংশ ভোট দরকার যা সু চি অর্জন করেছিলেন। আরো একটি বিধান রয়েছে, মিয়ানমারের কারো বিদেশী স্বামী বা স্ত্রী থাকে তবে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের উপযুক্ত হবেন না। যেহেতু সু চি র স্বামী একজন ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন সে কারণে সু চি মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। সেনাদের ভয় ছিল সু চি প্রথম অধিবেশনেই আইনটি পরিবর্তন করবেন। তাই এর আগেই সেনারা ক্ষমতা কেড়ে নিলো।
সেনাবাহিনী ক্ষমতায় থাকার সময় বিভিন্ন কারণে একজন বেসামরিক ব্যক্তিকে প্রধান করতে চেয়েছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত ৫০ বছর যাবত সামরিক কালোশাসনকালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে নানা ধরনের অবরোধ দেয়। এমনকি মিয়ানমারের জেনারেলরাও স্বীকার করেন যে, মিয়ানমার ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একটি অপ্রিত দেশের মতো মিয়ানমারের অবস্থা। ভেঙে পড়া অর্থনীতি, ইন্টারনেটের অভাব, মিডিয়ার ওপর সেন্সরশিপ, সামরিক বাহিনীর ব্যাপক নির্যাতন, জনগণ থেকে ইচ্ছামতো চাঁদা আদায় ইত্যাদি।
সেনাদের হিসেবে কারেনদের নির্মূল অভিযান এবং সু চিকে আইনের তীর দিয়ে ধরাশায়ী করাই এখন মূল কাজ। ২০১৭ সাল থেকে কারেন স্টেটের দু’টি ডিস্ট্রিক্ট মিয়ানমার সেনারা দখল করে আছে। মানবতাবাদী দলগুলো বলছে কয়েক মাস ধরে কারেন এলাকায় সেনাদের নিপীড়ন বেড়ে গেছে। রাশিয়ান ফাইটার জেট থেকে মিসাইল ও বোমাবর্ষণ করা হয়েছে কারেন ঘাঁটিতে। এটা নজিরবিহীন। চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে বহুদিন ধরে অস্ত্র জুগিয়েছে। ৩০ মার্চ প্রচণ্ড বোমা বর্ষণের পর যারা নদী ও স্থলপথে থাইল্যান্ডে পৌঁছে তাদের সেখানে কোনো আশ্রয় দেয়া হয়নি। ২৭-২৮ মার্চ কারেন বিদ্রোহী সেনা ও মিয়ানমার সেনাদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হলে মিয়ানমার রাশিয়া নির্মিত ফাইটার জেট ব্যবহার করে, এতে সাধারণ মানুষ বেশি হতাহত হয়। গত ২০ বছরে কারেনদের ওপর এমন বিমান হামলা হয়নি।
গোলাগুলির কারণে ১০ হাজার কারেন জীবন বাঁচাতে জঙ্গলের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। এরা সবাই সাধারণ মানুষ। তারা চিৎকার করে বলছে ‘সেনাদের কেউ নিবৃত্ত করুক’ আর ‘আমাদের কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা হোক।’ ফ্রি বার্মা রেঞ্জারের ডাইরেক্টর ডেভিড ইউবাঙ্ক বলেন, ‘নিরাপত্তাহীনতায় মাঠে ফসল ফলানোর কাজও তারা করতে পারছে না। ফলে আগামী দিনগুলো আরো ভয়াবহ হতে পারে।’ কারেন বস্তিতে ওষুধের কোনো সরবরাহ নেই বলেও তিনি জানান। কারেন সমস্যা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ নৃতাত্ত্বিক সঙ্ঘাত। অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী সামরিক জান্তার সাথে চুক্তি করেছে। কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নও এমন সই করেছে। তথাপি বারবার মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিজেদের এসব চুক্তি ভঙ্গ করে বিদ্রোহী ও জনসাধারণের ওপর আক্রমণ চালিয়ে থাকে। বর্তমান বোমাবর্ষণ ও সেনাভিযান সবচেয়ে নির্মম বলে বিভিন্ন এইড গ্রুপ বলছে। জান্তার ক্যুর ফলে সব ধরনের শান্তি আলোচনা ভণ্ডুল হচ্ছে।
কারেন এলাকাটি মিয়ানমার-থাই সীমান্তে অবস্থিত। বিদ্রোহীদের প্রায় সব ঘাঁটি গভীর জঙ্গল ও সীমান্ত এলাকায়। কারেনরা ৭০ বছর ধরে সেনা ও সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে আসছে। বলা হয়, এটি বিশ্বের সবচে দীর্ঘ সময়ব্যাপী নৃতাত্ত্বিক যুদ্ধ। মিয়ানমারে অন্তত ২০টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে। সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভে কারেন বিদ্রোহীরা বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছে।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীদের হাতে বা দখলে। এতে বোঝা যায়, সামরিক বাহিনীর অবস্থান সংহত নয়। বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর লোকজন জান্তার বিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের সাথে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এবং অনেক চাকরিজীবীরাও যোগ দিয়েছেন। জনগণ কোনো প্রকার সামরিক শাসন চায় না, বিশেষ করে নবীনরা সামরিক শাসনের ঘোর বিরোধী।
সু চি সরকার গত পাঁচ বছরে বেসরকারি রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। বিগত দুই দশকে সু চি ১৫ বছর গৃহবন্দী ছিলেন। এখন আবারো পুরনো খেলা শুরু হলো। অফিসিয়াল সিক্রেসি আইন ভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হলে সু চিকে ১৪ বছর জেলে থাকতে হবে। ‘তরী সেদিকে বইলে তার রাজনীতি করার সুযোগ এখানেই শেষ। সু চির পক্ষে এখন ছয়জন আইনজীবী কাজ করছেন। সর্বশেষ খবরে আরো জানা যায়, গৃহবন্দী নেত্রী সু চি রোহিঙ্গাদের সব অধিকার ও সিটিজেনশিপসহ মিয়ানমার সমাজে একীভূত করতে চান। সু চির নির্বাচনী প্রধান ড. সাসা ব্লুমবার্গের কাছে এই তথ্য দিয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা ভাই ও বোন’ বলেও ডেকেছেন। কিন্তু সু চি আগের সে বিশ্বাস ও আস্থা ফিরে পাবেন কি না, সে বিষয়ে অনেকেই সন্দিহান। নির্বাচনে রোহিঙ্গারা সু চিকে ভোট দিলেও তাদের ওপর কোনো নিপীড়ন বন্ধ হয়নি, তাদের এলাকায় উন্নয়ন হয়নি এবং সেনা নির্যাতনকে তিনি জোর সমর্থন দিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত নেত্রী, অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘ দিনের নির্যাতন দমনে সক্রিয় না হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েন এবং তার বহু আন্তর্জাতিক খেতাব ছিনিয়ে নেয়া হয় এ কারণে।
বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ ক্রমেই গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মিয়ানমারকে। সামরিক জান্তা শুধু গুলি করে মানুষ হত্যা করছে না, তারা একই সাথে আকাশ থেকে বোমা নিক্ষেপ করে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। কারেন আ তু হতা গ্রামে বেশি বোমা ফেলা হয়েছে। বোমা ও গুলিবর্ষণ করায় গ্রামের ভীতসন্ত্রস্ত লোকজন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছে থাইল্যান্ডে। তবে থাই কর্তৃপক্ষ তাদের পুশব্যাক করছে। এসব লোকজন জঙ্গল ও সুবিধাজনক স্থানে বাংকার খুঁড়ে অবস্থান নিয়েছে।
কারেন ছাড়াও আরো কয়েকটি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যেমনÑ মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, আরাকান আর্মি এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। খাবার ও নিরাপত্তার অভাবে বাধ্য হয়েই সেনা সরকারের বিরুদ্ধে নেমেছে অনেকে। তাই চার দিকে শোনা যাচ্ছে গৃহযুদ্ধের পদধ্বনি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমও গৃহযুদ্ধের পূর্বাভাস দিয়েছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বলেছে, যদি সামরিক জান্তা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা গুলি করে, মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে, তাহলে জনতার পাশে থেকে তারা যুদ্ধ করবে। সর্বশেষ খবরে জানা যায়, উত্তর মিয়ানমারে কাচিন গেরিলা বাহিনী পুলিশের ফাঁড়ি দখল করে নিয়েছে। কারেন গেরিলা বাহিনীও সেনাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে।
১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সদস্যসহ কয়েক শত মানুষ পালিয়ে গিয়ে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু ওই সীমান্তও সিল করে দেয়া হয়েছে। যেসব নাগরিক মিজোরামে গেছেন তাদেরকে পুশব্যাক করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সামরিক জান্তা।
মান্দালে ও ইয়াঙ্গুনে বিক্ষোভের প্রথম দিকে জনগণ যে ছবি, প্ল্যাকার্ড, দাবি ও সেøাগান ব্যবহার করেছে তা হলো “মাদার সু’ কে মুক্তির বিষয়। এখন বিদ্রোহীরা যোগ হয়ে বলছে, সামরিক শাসন চাই না, নতুবা যুদ্ধ হবে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এনএলডি কর্মীরা সু চিকে মিয়ানমারের আইডলে পরিণত করতে পেরেছে বিধায় বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সেনাদের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। এই বিষয়ে এ লেখকের লেখা নয়া দিগন্তে প্রকাশিত ‘সু চির বিজয় ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী’ পড়তে পারেন। ২০১৫-২০ সময়ে সু চি প্রশাসনের মানবাধিকার রেকর্ড বিশ্ববাসীকে আহত করেছে। সু চি সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের সময় চুপচাপ ছিলেন। তার সমর্থকরাও রোহিঙ্গা, কাচিন ও শানদের বিষয়ে কোনো অনুভূতি প্রকাশ করেনি। মনে হচ্ছে, কড়া এখন প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। মানবাধিকার সাংবাদিক ক্য সান হ্লিং ‘ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমারে সু চিকে দোষী সাব্যস্ত করে নিবন্ধ লিখেছেন। বলেছেন, ‘এমন সরকারকে সমর্থন করার কোনো যুক্তি নেই।’
জেনারেল স্ট্রাইক কমিটি এনএলডি ছাড়াও ২৪টি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে একত্র করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সেøাগান হচ্ছে ‘২০২০ সালের গণরায়কে আমরা সম্মান করি।’ ‘২০০৮ সালের সংবিধান মানি না।’
এতসব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর চাপ প্রশমিত করা সেনা শাসকদের পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে। হত্যা, গুম কতদিন চলবে? সেনাদের বিভিন্ন ‘অফার’ গোষ্ঠীগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রশাসন, ব্যাংক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো অনেকটা অচল। সেনা-প্রশাসন চালানোও এখন দুষ্কর। এর ওপর যোগ হয়েছে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রের’ অপচ্ছায়া। যদি শেষ পর্যন্ত যুবশ্রেণী, যারা জেনারেশন জেড নামে পরিচিতি পেয়েছে আর সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সেনাবাহিনীকে প্রত্যাখ্যান করে তবে মার্শাল ল কোনো কাজে আসবে না। সেনাবাহিনীর ভেতরও মতবিরোধ ও বিভক্তি বেড়ে যেতে পারে। জাতিসঙ্ঘের প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল উ থান্টের নাতি, গ্রন্থকার ও ঐতিহাসিক থান্ট মিন্ট উ বলেছেন, ‘কঠিন ভবিষ্যতের দুয়ার এখন উন্মুক্ত হলো। সামনে যে সমস্যা আছে সেগুলো কেউ আর সুরাহা করতে পারবে না। সমস্যার জন্ম হবে; সমাধান থাকবে না। মিয়ানমার অস্ত্রে প্লাবিত, নৃতাত্ত্বিক ও গোষ্ঠী সঙ্ঘাতে জর্জরিত এক দেশ। লাখ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত খেতে পায় না।’ জেনারেশন জেড ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘কেয়ারটেকার সরকার’ ও ‘অস্থায়ী নতুন সংবিধান’ চায়, কোনো প্রকার সেনাশাসন চায় না। হ
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার



আরো সংবাদ