১১ মে ২০২১
`

যদি মন কাঁদে

-

হালিম সাহেব অনেক দিন ধরেই ভাবছেন তিনি একটি গল্প লিখবেন। সুন্দর, মনোরম সফল একটি গল্প। কিন্তু ঠিক হয়ে উঠছে না। যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন টুকটাক লেখালেখি করতেন। অনেকের সাথেই যোগাযোগ ছিল তখন। তারপর চাকরি পাওয়ার পরও তিনি লিখেছেন। ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা ভালোই লাগতো তখন।
তারপর অনেক দিন তিনি শুধু ভেবেই চলেছেন। তিনি একটি গল্প লিখবেন। মাঝে মাঝে গল্পের বিষয়বস্তুও গুছিয়ে আনেন তিনি। চরিত্রগুলো সাজিয়ে ফেলেন মনে মনে। একটা নামও হয়তো ঠিক করে ফেলেন। কিন্তু তারপর আর হয়ে ওঠে না। সে গল্পও আর বাস্তবতা পায় না।
তিনি এক সময় গান শুনতেন। হেমন্ত, সতীনাথ, মান্না দে, সুবীর নন্দীর গান। ঠিক সেই সময় গানের দু-একটা কথাও তাকে মারাত্মকভাবে আটকে দিত। এত সুন্দর, এত আবেগময় একেকটি লাইন যেন ইচ্ছে করলেই একটি গল্প হয়ে যায়।
গান শুনতে শুনতেই এই একসময় তিনি লিখতে বসতেন। গান থেমে গেলেও গানের সুর মনের মধ্যে টুংটাং বাজতে থাকত। গানের কথাগুলো ঘুরে ফিরে মনের মধ্যে নেচে যেত। হালিম সাহেব লিখে যেতেন। আর সেসব গল্প সত্যিই একেকটি সফল গল্প হয়ে যেত।
সেই অডিও ক্যাসেটটি এখন আর নেই। ছোট ছেলে ভাঙারিওয়ালার কাছে বেচে দিয়েছে। ওসব এখন আর চলে না। ক্যাসেটের ফিতা কিনতে পাওয়া যায় না।
এখনো অসংখ্য ক্যাসেটের ফিতা শোকেসে সাজানো। এখন নাকি মোবাইলেই সব গান পাওয়া যায়। সেখানে কত শত শিল্পী, কত শত গান। কিন্তু হালিম সাহেবের ঠিক মনঃপূত হয় না। তিনি ওভাবে আর গান শোনেন না কিংবা শুনতে পারেন না।
হালিম সাহেব ভাবেন তিনি কেন লিখতে পারছেন না। তিনি গান শোনেন না তাই। কিন্তু গান তো তিনি ইচ্ছে করলেই শুনতে পারেন। তাহলে কি গান শোনার মতো সেই আবেগ তার নেই!
তিনি প্রতিদিন ঠিকঠাক সময়মতো অফিসে চলে আসেন। সারা দিন অফিসে কাজ করেন। তারপর শুক্রবার ছুটির দিন বিকেলে বের হন। হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের পাশের বইয়ের দোকানে চলে আসেন। সেখান থেকে দু-তিনটে দৈনিক পত্রিকা কেনেন। তারপর বাসায় এসে সাহিত্য পাতাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। বেশির ভাগই তরুণ, নবীনদের লেখা। কিছু কিছু লেখা তার সত্যিই ভালো লাগে। তার মনে পড়ে তারও কিছু কিছু লেখা এক সময় এসব পাতায় ছাপা হতো। মনের মধ্যে প্রজাপতি আনন্দ খেলে যেত। সেই সময় তিনি ভাবতেন তিনিও হয়তো একদিন বড় লেখক হয়ে যাবেন। একুশের মেলায় হাত ধরাধরি বিকেলে তার বইও বিক্রি হবে।
চাকরি পাওয়ার পরও হালিম সাহেব যে ঘরটায় থাকতেন সে ঘরটার পশ্চিম দিকে একটা ছোট ব্যালকনি ছিল। কিন্তু ঘরটা বড়ছেলের পড়াশোনার জন্য ছেড়ে দিতে হলো। হালিম সাহেব চলে এলেন মাঝের ঘরে।
হালিম সাহেব আগে যে ঘরটায় থাকতেন, যেখানে বসে লিখতেন সেখান থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যেত। মানুষের চলাচল দেখা যেত। রাস্তা দেখা যেত।
তিনি কিছুক্ষণ মানুষ দেখতেন, যানবাহন দেখতেন, বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া দেখতেন। তিনি তার চেয়ারটায় বসে বসে সবকিছুই দেখতেন আবার কিছুই দেখতেন না। তিনি ভোরের কুয়াশা দেখতেন। সন্ধ্যার অন্ধকার দেখতেন। দেখতেন তার গল্পের চরিত্রগুলো। সাজাতেন তাদের কথোপকথন।
কিন্তু যে ঘরটায় তিনি এখন থাকেন সেটি এখন অন্ধকার। লাইট না জ্বালালে কিছুই দেখা যায় না।
এখনো ঠিকই চেয়ারটায় এসে বসেন। কিন্তু লিখতে তিনি পারেন না। আর এই লিখতে না পারার যন্ত্রণা তার কাছে মাঝে মাঝে প্রসববেদনার মতো অসহ্য মনে হয়। তিনি তখন ছটফট করতে থাকেন। চেয়ার থেকে তিনি উঠে বাথরুমে চলে যান। ওজু করেন। ওজু করে নামাজ পড়েন। জায়নামাজে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। ভাবেন। তারপর আস্তে আস্তে তার লেখার উত্তেজনা নেমে যায়। তিনি শান্ত হন।
বড় ছেলেটার লেখাপড়া হলো না। বরঞ্চ ছোটটাই ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে খুলনাতে। মাসে মাসে টাকা পাঠাতে হয়। বড়টার মুদিখানার ব্যবসা। আলাদা সংসার।
হালিম সাহেবের স্ত্রী জাহানারা। গোছালো, সংসারী মহিলা। হালিম সাহেব যখন বিয়ের পরও কিছু কিছু লিখতেন জাহানারা বেগম কখনো কিছু পড়েছেন বলে তার মনে হয় না। এসব বিষয়ে তার কোনোই আগ্রহ নেই।
হালিম সাহেবের আলমারিতে এখনো প্রচুর বই। জাহানারা বেগম কখনো কোনো দিন কোনো বই আলমারি থেকে নামিয়েছেন এটা তিনি দেখেননি। তার অপার আগ্রহ ছিল কেবল দুই ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু বড়টার সাথে পেরে উঠলেন না। বড়টা নিজে নিজেই সংসার করে আলাদা হয়ে গেল। এখন ভরসা ছোটটা। জানি না সে কী করে!
ভাবেন তিনি একটি বাড়ি বানাবেন। সেই বাড়ির পশ্চিম দিকের ঘরটি তিনি নেবেন। যার উত্তর দিকে থাকবে একটি ব্যালকনি। যেখান দিয়ে সন্ধ্যা-সকালে বাতাস আসবে মুহুর্মুহু। তিনি তার প্রিয় চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে থাকবেন। বসে বসে ভাববেন।
তিনি ভাবেন ভাবনার জন্যও বোধ হয় একটা ঘর লাগে। যার নাম ভাবন ঘর। কোথায় যেন পড়েছিলেন তিনি। তিনি ভাবেন তিনিও একটি ভাবন ঘর বানাবেন। যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকবে। তিনি সেখানে ভাববেন। ভাবতে ভাবতেই তিনি একটি গল্প তৈরি করে ফেলবেন। সুন্দর, মনোরম, সফল একটি গল্প।
কিন্তু তিনি কী পারবেন! বাড়ি বানানোর মতো পর্যাপ্ত টাকা তার কাছে নেই। কিছু জমানো টাকা তিনি বড় ছেলেকে দিয়ে দিয়েছেন। ঠিক দিয়ে দিয়েছেন বললে একটু ভুল হবে। দিতে হয়েছে এক রকম।
এখনো তার প্রিয় চেয়ারটায় এসে বসেন। লিখবার চেষ্টা করেন। কিন্তু লেখা তার হয় না। হাজারটা চিন্তা মাথার মধ্যে এসে ঘুরপাক খায়। তিনি ভাবেন তিনি কি জীবনে সফল হয়েছেন! জীবনে তিনি কী হতে চেয়েছিলেন। মনে করার চেষ্টা করেন তিনি জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন।
তিনি কি একজন লেখক হতে চেয়েছিলেন? ঠিক বুঝতে পারেন না । তিনি ভাবেন স্বামী হিসেবে কিংবা বাবা হিসেবেও তিনি কতটা সফল। এসব ভাবতে ভাবতে হালিম সাহেবের চোখ দুটো এক সময় ঘোলা হয়ে আসে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে।
হালিম সাহেব ভাবেন তিনি কিছুই হতে পারেননি। কিছুই না। তিনি তার চার পাশে শুধুই শূন্যতা দেখেন। এক মহাশূন্যতা। তিনি ভাবেন তিনি মরে গেলে সহসাই বিলীন হয়ে যাবে তার অস্তিত্ব হাজার হাজার মানুষের মতো। কিন্তু কেনইবা তিনি জন্মালেন! আর তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাঝের এই সময়টুকু কিভাবেইবা চলে গেল!
ভাবেন তিনিতো এসব নিয়েও একটা গল্প লিখতে পারেন। ঠিক তার জীবনের মতো। কিন্তু ঠিক কোন জায়গা থেকে তিনি শুরু করবেন বুঝতে পারেন না। তিনি স্থবির হয়ে থাকেন। তিনি তার অন্ধকার ঘরে প্রিয় চেয়ারটায় চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকেন। দৃষ্টি তার অন্ধকারে হারিয়ে যায়।



আরো সংবাদ


খালেদা জিয়ার ভুয়া করোনা রিপোর্ট ছড়ানোর অভিযোগ (১১৫৪৫)‘কোয়াডে বাংলাদেশ যোগ দিলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক খারাপ হবে’ (৯৯৮০)হামাসের কমান্ডার নিহত (৭৩২৫)যেভাবে সুয়েজ খাল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স (৬০৫৪)বাবার লাশ দেখতে মাওয়া ঘাটে মিনি ট্রাকে অপেক্ষায় ১০ যাত্রী (৫৪৯৪)৫ বছর আগেই করোনাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল চীন! (৫২৮৯)যমুনায় লাশের মিছিল, করোনায় মৃতদের ভাসিয়ে দেয়ার অভিযোগ উত্তরপ্রদেশে (৫২২০)খালেদা জিয়ার আসল জন্মদিনের তথ্য প্রকাশ পেল : ওবায়দুল কাদের (৪৬০০)বাংলাদেশসহ ৪ দেশ থেকে আমিরাতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা (৪৫৭৫)জেরুসালেমে অব্যাহত সহিংসতা, বৈঠকে বসছে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ (৪৩৯০)