১৯ এপ্রিল ২০২১
`

সাহিত্য সংস্কৃতিতে একুশ

-

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এ দিনটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও সুপরিচিত। বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের সোনালি স্মৃতিবিজড়িত দিন হিসেবে পরিচিত। ১৯৫২ সালের এ দিনে (৮ ফাল্গুন ১৩৫৯) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। তাদের স্মরণে প্রতি বছর পালিত হয় এ দিবসটি।
অমর একুশে আমাদের জীবনে অনির্বাণ একটি চেতনা। এ চেতনায় ১৯৫২ থেকে আমাদের সংগ্রামী পথচলা। একুশ বাঙালির জাতিসত্তার জাগরণের প্রথম প্রণোদনা। একুশের চেতনা ১৯৭১-এ পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। তারই অসামান্য ফসল আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। এ আমাদের ঐতিহাসিক অর্জন।
একুশ কেবল আমাদের মুখের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি, দিয়েছে দেশপ্রেমের মহান আবেগ, দিয়েছে জাতীয়তাবাদী জীবনবোধ, দিয়েছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে চলার প্রাণশক্তি।
আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে একুশে ফেব্রুয়ারি যেন হাজার তারের এক বীণা। তাতে সৃষ্টি হয়েছে অনেক সুর, অনেক ঝঙ্কার! একুশের বীণায় ঝঙ্কৃত হয়েছে আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিচিত্র সুর। যে সুর-গান, কবিতা আমাদের নিয়ে যায় শিকড় থেকে শিখরে।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্মরণে দেশজুড়ে চেতনার যে উন্মেষ ঘটে তারই ফলে একাত্তরে আমরা পাই বাংলাদেশ। নিচে দেয়া হলো একুশের চেতনায় লেখা প্রথম গান-কবিতা-নাটক-সঙ্কলন-উপন্যাস আর শহীদ মিনার বিনির্মাণের ইতিহাসÑ

গান
ভুলব না, ভুলব না
একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না।

রচয়িতা ভাষাসৈনিক আ ন ম গাজীউল হক। গানটির প্রথম চরণ ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলা ময়দানে আয়োজিত এক জনসভায় প্রথম গাওয়া হয়। প্রভাতফেরির গানÑ

মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল
ভাষা বাঁচাবার তরে
আজিকে স্মরিও তারে।

১৯৫৩ সালে প্রথম শহীদ দিবসের প্রথম প্রভাতফেরিতে গাওয়া গানটির রচয়িতা প্রকৌশলী মোশারেফউদ্দিন আহমদ। তিনি এটি ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সালে রচনা করেন।

কবিতা
একুশের প্রেরণার প্রথম সাহিত্যপ্রসূন একটি কবিতা। তা লেখা হয়েছিল চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং সীমান্ত পত্রিকার সম্পাদক মাহবুল উল আলম চৌধুরী। একুশের ঘটনার কথা শুনে সে দিনই লিখেছিলেন সেই কবিতাটিÑ ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। কবিতাটি সে রাতেই চট্টগ্রামের কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেসে গোপনে ছাপানো হয় এবং পরদিন লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় পঠিত ও বিলি হয়। প্রকাশের পরপরই মুসলিম লীগ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
একুশের ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যে কতটা বেদনার, কতটা যন্ত্রণার, কতটা ক্ষোভের, কতটা নিন্দার তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এই প্রতিবাদী কবিতাটিতে।
এরপর অনেকেই রাষ্ট্রভাষা এবং একুশের ওপর অনেক কবিতা লিখেছেন। এর মধ্যে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতিস্তম্ভ’, শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘আর যেন না দেখি’, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘একুশের কবিতা’, আনিস চৌধুরীর ‘একুশের কবিতা’, ফজলে লোহানীর ‘একুশের কবিতা’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘একুশের কবিতা’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘এবার আমরা তোমার’, আহসান হাবিবের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘শহীদ মাকে’, আনিসুজ্জামানের ‘তারা’, আল মাহমুদের ‘নিদ্রিতা মায়ের নাম’ একুশের গান, ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘আত্মা থেকে একটি দিন’, শহীদ কাদরীর ‘একুশের স্বীকারোক্তি’, রফিক আজাদের ‘পঞ্চানন কর্মকার’, আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, হুমায়ুন আজাদের ‘বাঙলা ভাষা’, ফরহাদ মজহারের ‘মাতৃভাষা/মাতৃভূমি’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমাকে কী মাল্য দেবে দাও’ উল্লেখযোগ্য।

নাটক
নাট্য ও থিয়েটারের ক্ষেত্রে আমাদের যে বর্তমান অগ্রগতি তার পেছনেও একুশের চেতনা ফেলেছে অসামান্য প্রভাব।
ভাষা-আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার সময়েই এ নিয়ে নাটক লেখা হয়েছে। ১৯৫১ সালে লেখা আসকার ইবনে শাইখের নাটকটির নাম দুর্যোগ। এটি তার দুরন্ত ঢেউ (১৯৫১-৫৩) নাট্যগ্রন্থে সঙ্কলিত। আসকার ইবনে শাইখ ভাষা আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের নিয়ে লিখেছেন আরেকটি নাটক। নাটকটির নাম ‘যাত্রী’ (১৯৫৪)।
ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ ১৯৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত ও মুনীর চৌধুরীসহ অনেক লেখক-সাংবাদিক। রণেশ দাসগুপ্ত তখন অন্য সেলে আটক মুনীর চৌধুরীকে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি নাটক লিখে দেয়ার অনুরোধ করে একটি চিরকুট পাঠান। মুনীর চৌধুরী ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি লিখে শেষ করেন। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম বার্ষিকীতে মুনীর চৌধুরীর লেখা বিখ্যাত কবর নাটকের প্রথম অভিনয় হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারান্তরালেই এ নাটক লিখেছিলেন মুনীর চৌধুরী। অভিনয় করেছিলেন কারাবন্দীরাই। পরের বছর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে নাটকটি অভিনীত হয়।

প্রবন্ধ
কবিতার পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বিষয়ে লেখা হয়েছে ব্যাপক সংখ্যক প্রবন্ধ। এর মধ্যে মোজাফফর আহমদের ‘উর্দু ভাষা এবং বঙ্গীয় মুসলমান’, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তান ভাষা সমস্যা’, অলি আহাদের ‘নাজিমুদ্দিনের বিশ্বাসঘাতকতা’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞার ‘ভাষা নিয়ে কথা’, আবুল হাশেম ফজলুল হকের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের মর্মকথা’ শিরোনামের প্রবন্ধ উল্লেখযোগ্য।

সঙ্কলন
একুশের প্রথম সঙ্কলন একুশে ফেব্রুয়ারি। সম্পাদনা করেন হাসান হাফিজুর রহমান। ১৯৫৩ সালে পুঁথিপত্র থেকে এটি প্রকাশ করেন বিশিষ্ট রাজনৈতিককর্মী মোহাম্মদ সুলতান। সঙ্কলনের অসাধারণ স্কেচগুলো করেন মুর্তজা বশীর। হাসান হাফিজুর রহমানের অনুরোধে নিজ হাতে উৎসর্গপত্রটি লিখে দেন ড. আনিসুজ্জামান। একুশের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে একুশের সঙ্কলনগুলোর রয়েছে অনন্য ভূমিকা। সঙ্কলনটিতে প্রকাশিত হয় একুশের কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, গান ইত্যাদি। একুশে ফেব্রুয়ারি সঙ্কলনের সূচিপত্র দেখলে এতে সঙ্কলিত সাহিত্যের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ও প্রতিবাদী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
এই ঐতিহাসিক ও চিরভাস্বর সঙ্কলনটি আমাদের জাতীয় সচেতনতার উদ্বোধনের প্রথম সাহিত্যিক দলিল। এর মাধ্যমে একুশের সঙ্কলন প্রকাশের গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিল। সঙ্কলনটি প্রকাশের পর থেকে প্রতি বছর একুশ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে কত না সঙ্কলন, কত না সাময়িকী। ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে আমিরুল মোমেনিনের সম্পাদনায় যে একুশের সঙ্কলন গ্রন্থপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দুই হাজার ২৮২টি সঙ্কলনের উল্লেখ আছে। এর বাইরেও অনেক সঙ্কলন থেকে থাকবে। এর পরও প্রকাশিত হয়েছে প্রচুর। তাছাড়া একুশে উপলক্ষে প্রতি বছর প্রকাশিত হয়েছে পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যা। আমাদের সাহিত্য-সৃষ্টির ইতিহাসে এসব সঙ্কলন ও বিশেষ সংখ্যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে। শোক ও বেদনার একুশ যে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে, সৃজনের প্রেরণা হয়েছে, তার পেছনেও রয়েছে এসব সঙ্কলন ও একুশের সংখ্যার অসামান্য অবদান।
উপন্যাস
অমর একুশের ওপর লেখা প্রথম উপন্যাস জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’। শহীদ দিবস পালন, একুশের মিটিং-মিছিল, সরকারি বাধা, শহীদ মিনার নির্মাণসহ একুশের স্মৃতিবিজড়িত নানা ঘটনা উপন্যাসটির উপজীব্য। পঞ্চাশের দশকেই এটি পত্রিকায় ছাপা হয়, বই আকারে বের হয় ১৯৬৯ সালে।

চলচ্চিত্র
১৯৭০ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তি পায়।

শহীদ মিনার
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণের যে জায়গায় প্রথম গুলি হয়েছিল সে জায়গায় নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার।
নাম : শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ; উচ্চতা ১২ ফুট; প্রস্থ ৬ ফুট; নকশাকার বদরুল আলম; নির্মাণ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২; ভেঙে ফেলা হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।
প্রথম শহীদ মিনার : শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার ধ্বংসের প্রতিবাদে কবিতাÑ
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?
ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো।
পুলিশের হাতে প্রথম শহীদ মিনার ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ রচনা করেন ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতা।

শহীদ দিবস
১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো পালন করা হয় শহীদ দিবস। ওই দিন বিভিন্ন স্তরের ও শ্রেণীর মানুষ বিশেষ করে নারীরা খালি পায়ে ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত দীর্ঘ শোভাযাত্রা নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে।

ইউনেস্কোর জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সাতটি দেশের ১০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত সংগঠন গড়ঃযবৎ খধহমঁধমব খড়াবৎং ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ। কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম ছিলেন এ সংগঠনের উদ্যোক্তা। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষার জন্য আত্মত্যাগকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০০ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি এ বিশেষ দিবসটিকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশ প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করে।
ইউনেস্কোর পর জাতিসঙ্ঘও একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ৫ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়।



আরো সংবাদ