১৯ এপ্রিল ২০২১
`

দাগ রেখে যাই

-

৯.

হারুনার রশিদ আমার ক্লাস ফ্রেন্ড ছিল। সেও আমাদের গ্রামের চরপাড়া থেকে এসে আমাদের দলে যোগ দিত। সে আমার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। সে পাজামা পরে স্কুলে আসত। কারণ সে লম্বাটে ধরনের বয়সে একটু বড় ছিল। সে আমাকে দারোগা বলত। আমি এতে ঈষৎ রেগে যেতাম, কারণ তখনকার দিনে ফুলপ্যান্ট পরা পুলিশ প্রমোশন পেলে হাফ প্যান্ট পরতে বাধ্য থাকত। আমি হারুনকে হেসে বলতাম তাহলে এএসপি, এসপিরা কি লেংটি পরে? হারুন ফিক করে হেসে বলত ধুর বোকা এস পিরা লেংটি পরলে তো ডি আইজি আইজিরা লেংটা থাকবে। আমি তখন হারুনকে বলতাম তুমি একটা ফুলিশ পুলিশ। ও বলত আমি তো ক্লাসের সেকেন্ড বয় তাই আমার পায়জামা আর তুমি হলে ফার্স্ট বয় তোমার ড্রেস তো খাকি হাফপ্যান্টই হবে। এখন মুশকিল হচ্ছে আমার এক ভায়রা ভাই এসপি সে এসব শুনলে শ্যালিকাকে কথা শুনিয়ে দেবে।
আমি শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সব পরীক্ষায় সব ক্লাসেই ফার্স্ট হয়েছি। আমি রেকর্ড নাম্বার পেতাম। পঞ্চম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় আমি অঙ্কে ১০০, বাংলায় ৯৬ নম্বরসহ অন্যান্য বিষয়ে ৯৫ থেকে শতের কাছাকাছি পেয়েছিলাম।
আমার এই রেজাল্টে হেডস্যার অনাথ বন্ধু কর্মকার খুব খুশি হয়ে আমাকে একটি গোল্ডপেন উপহার দিয়েছিলেন। তিনি বাংলায় বিএ অনার্স পাস ছিলেন। ক্লাসে প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত কথা বলতেন না। তিনি রাশভারী রাগী মেজাজের মানুষ ছিলেন। আমাকে পুরস্কার দেয়ার সময় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন আমার শিক্ষকতা জীবনে আমি কাউকে লেটার মার্ক এ পর্যন্ত দেইনি। তোমরাও কেউ ষাটের ওপরে নম্বর পাওনি। সেখানে ও পেয়েছে ছিয়ানব্বই মার্ক। আমি ওকে খুশি হয়ে এই স্বর্ণকলম উপহার দিলাম। সে অনুষ্ঠানে আমাদের অঙ্কের শিক্ষক অতুল খাঁ, সমাজপাঠের শিক্ষক হরিপদ ভট্টাচার্য ছিলেন। এরা আমাকে খুব যতœ করে পড়িয়েছেন। হেডস্যারের সেই সোনার কলম আমাকে সোনার মুকুটের স্বর্নস্বপ্নে এখনো উতলা করছে।
আজ মনে পড়ছে বালক বেলার স্বর্ণসতীর্থদের। আমার সহপাঠীঘনিষ্ঠ আমৃত্যু বন্ধু ছিল সুশীল কুমার কর্মকার। সে ছিল ক্লাসের তৃতীয় স্থান অধিকারী মেধাবী ছাত্র। সে আজ ক’বছর হলো মারা গেছে। আমি তার শ্মশানে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। আমার তৃতীয় ভাই হাফেজ মাওলানা শাহ হাবিবুল্লাহ তার দেহ শ্মশানে দাহ করার সময় উপস্থিত ছিল। সে আমার মাকে মাতৃজ্ঞানে মা বলত। আমদের পরিবারের সদস্যের মতো সে ছিল। ঈদ, পূজা পার্বন, বিয়েশাদি অনুষ্ঠানে আমাদের পরস্পরের যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়া প্রচলন ছিল। এখনো সে ধারা বলবত আছে।

ছি কুৎ কুৎ ছিঃ

সুশীলের ডাকনাম ছিল পোকো। অন্য বন্ধুরা তাকে পোকা বলত। এতে সে রেগে ফুলে উঠত কিন্তু তাদের কিছুই বলতো না কেবল কথা বন্ধ করে দিত। থুতনিতে বুড়ো আঙুল লাগিয়ে তিন বার আড়ি, আড়ি, আড়ি বলে কথা না বলার দিব্যি দিত।
এই বন্ধু তাদের নিজেদের ছোট্ট কারখানা থেকে আমার জন্য রুপার মেডেল গড়ে দিত। ময়েনদিয়া বাজারের এই ছোট্ট কামারশালায় সে স্কুল শেষে বিকেলে সোনা রুপার গহনা গড়তে, বড়দা অখিলকে সহায়তা করত। মাঝেমধ্যে তার বাবা পঞ্চানন কর্মকারও কাজ করতেন। তাদের দোকানে মেয়েদের গহনা গড়ার ভিড় লেগে থাকত। অখিল দা সিঙ্গাপুর থেকে কাজ শিখে দোকানে বসেছেন। তার হাতের নৈপুণ্য ছিল আকর্ষণীয়। তিনি দিলখোলা অসাম্প্রদায়িক সাধু মননের অধিকারী
ছিলেন। তিনিও আমাকে আদর করতেন। দোকানে গেলে সহকারী দিয়ে চেয়ার টানিয়ে বসতে দিতেন।

আমি তার ছোট ভাইয়ের বন্ধুই কেবল নয়, শাহ ইসরাইল মিয়ার পুত মিয়ার বেটা মিয়া ছাপ। বাজারে যে বড় বড় ঘরে যেতাম সকলেই এই মিয়ার বেটা মিয়াছাপকে পুঁচকে পোলাকে সম্মান দেখিয়ে চেয়ার টেনে বসতে দিত। যা অন্য পোলাপানের ভাগ্যে জুটতো না। আমি সুশীলের দেয়া উপহার সামগ্রী না নিয়ে পারতাম না। ওর উপঢৌকন না নিলে ও মাথা গরম করে রাগে গড়গড় করত। তাই ওকে আর কখনো এ বিষয়েই শুধু নয় ওর যেকোন আদেশ আমি শিরোধার্য করে নিতাম। আমার আরো ক্লাসমেটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো নিমাই দত্ত, ধলা দত্ত, বিনয় পোদ্দার, ওর বোন বুড়ী, মজিবর সরদার, প্রমীলা, করুণা, মিলন নামের এক মেয়ে, যমুনা, হারুন, শুকুর, সৈয়দ কামরুল হক মনিরুজ্জামান প্রমুখ।

আমার উপরের ক্লাসের মধ্যে সামাদ মোল্লা, ডাক্তার মোকন্দ লাল সাহা যাকে আমি মামা ডাকতাম তার মেয়ে চায়না রাণী সাহা, বিধান দার বোন আরতিদি আমাকে খুব ভালো জানতো। আমি ভালো ছাত্র বিধায় আমার প্রতি তাদের একটি সুনজর ও কৌতূহল কাজ করত। পড়াশোনার অনেক বিষয় তারা আমার সাথে আলাপ আলোচনা করত। টিফিন প্রিয়ডে স্কুল প্রাঙ্গণে ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা দিনে খেলাধুলা চলত। আমরাও মেয়েদের মত বৌ-ছি বা ছি বুড়ী খেলতাম। আমাদের মধ্যে হারুনর রশীদ ওরফে হারু দারুণ তেজে ছি বুড়ী খেলত। ও ভিষণভাবে দৌড়াতে পারত। ছি বুড়ী খেলায় দম বেধে ছড়া কাটতে কাটতে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের তাড়া করে বৌ বা বুড়ীর নাগাল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হত। দম বাঁধা অবস্থায় কোনো খেলোয়াড়কে ছুঁতে পারলে সে মারা যেত অর্থাৎ আউট হয়ে যেত খেলা থেকে। বুড়ী বাধা মুক্ত হয়ে দৌড়ে ঘরে গেলে এক গেম হয়ে যেত। ছি বুড়ী খেলায় যে ছড়া বলা হত তা খানিকটা এমন:

ছি কুত কুত ছি
মৌমাছিদের ঝি।
কামড় দিয়ে হুল ফুটাবো
মধু চুরির ঝাল উঠাবো।
ছি কুত কুত ছি
কানা বুড়ীর ঝি।
কানা বুড়ী আসবে তেড়ে
ঘর সামলা আগে বেড়ে।
এ ছড়াটিতে আমার লেখার মিশ্রণ রয়েছে, কারণ অনেক আগের লৌকিক ছড়া যার সবটি আমার স্মরণে নেই।

ও গঙ্গা ও যমুনা

আমি আর নিমাই স্কুলের পাড়ে বাবু বাড়ির ঘাটলার শানবাঁধানো বেঞ্চিতে বসে বসে গল্প করতাম। এ ব্যপারে নিমে দত্তের ভুমিকা বেশি থাকত। টিফিন পিরিয়ডে যে দিন ছেলেদের খেলা থাকতো না সেদিন অবসরে ঘাটলায় যেতাম। ঘাটলার পাড়ে ছাদ দেয়া অঙ্গনে বড়ো থামের আড়ালে নিমাই আমাকে নিয়ে গল্পচ্ছলে নদীতে গোছলরত নারী পুরুষের উচ্ছ্বাস অবলোকন করত। অনেক গৃহবধূ পিতল কাঁসার কলসিতে জল ভরে নিতে আসতো। ঘাটে কম লোক বিশেষত পুরুষের উপস্থিতি না থাকলে কিছু রমণী উরত পর্যন্ত শাড়ি গুছিয়ে দু পা ঈষদ ফাঁক করে জল ত্যাগ করত। মুহূর্তে জলে কলসির ধাক্কায় ফ্রেস গঙ্গাজল কলসিতে ভরে ত্রস্ত পায়ে ডাঙায় উঠে পাকা ঘাটলার ছাদওয়ালা আঙিনা মাড়িয়ে যেতে যেই উপক্রম হত নিমাই থামের আড়াল থেকে হাততালি সোল্লাসে বলত, ”দিদি স সি, স সি, ই রে জল নষ্ট হইয়া গেছে। ঘাটলায় একটা নাইড়া আছে”। নিমাই এর সাথে আমাকে ঘাটলায় হাজির দেখে দিদি কাখের কলসির পুরো জল ফেলে দিয়ে আবার গাঙে গাঙুড়ের জল ভরত। নিমাই এর এই আচরণ ও দিদির জল ফেলে দেয়ার লজ্জায় সেদিন বড়ো আঘাত পেয়েছিলাম। নিমাইকে বলেছিলাম আমি নেড়ে ঠিক আছে। আমি দিদির জল নষ্ট করলাম কি ভাবে? আমি তো দিদির কাঁখের জলের কলস ছুঁই নি। বাবুদের বাঘা কুকুরটাও তো ওখানে শুয়ে আছে। তাতে জল স সি হয় না অপবিত্র হয় না! আমার বন্ধুটি সরল মনে বলেছিল কুহুর (কুকুর) তো ম্যালোচ না, নাইড়া না। তুই জলের কলস না ধরলে কি অবে। তোর একটা বাও বাতাস আছে না? আমি ওকে বলেছিলাম তা হলে আমাকে এখানে কেন নিয়ে আসলি? আমিতো তগো বাড়িতে যাই। সুশীলের বাড়িতে ভাত তরকারি খাই। মোকন্দ মামার বাড়িতে চা নাশতা খাই তাতে তাদের জাত যায় না? তারাতো সাহা হিন্দু। নিমে দত্ত হাসতে হাসতে বলেছিল আরে ধুর ওসব বাদ দে। দিদির সাথে একটু মস্করা করলাম। দোস্ত তুই কিছু মনে করিস না হেডস্যারের কাছে নালিস দিস না। তোরে কামরাঙা খাওয়াবানে। কমল পোদ্দার বাবুর গাছ পাকা কামরাঙা চুরি করে খাওবানে তোরে। আমি মনে মনে বল্লাম দিদি গঙ্গার জলে জল ছেড়ে যে কামে রাঙা করেছে, ডাঙায় কাঁখের জল ঢেলে যে কামে লাল করেছে সেখানে গাছপাকা কামরাঙা কত আর রাঙা করবে ? টকে জিহ্বা মুষড়ে যাবে হে!

ঘাটলার পাশে একটি নিমগাছকে ঘেরাও করে রাম কানাই সাউ একটি মন্দির গড়েছেন। সেখানে ভূমি থেকে উত্থিত আবক্ষ একটি পিতলের নারী মূর্তি আছে। কথিত আছে এক রাতেই হঠাৎ এই মূর্তির আবির্ভাব হয়েছে,ইনি শীতলা দেবী। আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার অবতার হিসেবে তিনি বসন্ত রোগ, ঘা, ব্রণ, প্রভৃতি রোগ নিরাময় করেন। মাঘ মাসের ৬ষ্ঠ দিনে দেবী শীতলার পূজা করা হয়। আমরা গায়েবে ওঠা এই দেবীকে দেখার জন্য কৌতূহল ভরে মন্দিরে যেতাম। রামকানাই বাবু জমিদার পুত জমিদার হলেও কৌপীন পরে অর্ধনগ্ন আদুল দেহেই সাধুর বেশে জীবন চালনা করতেন। আমাকে অর্থাৎ এই দামি নামী বাড়ির পুঁচকে নেড়েকে দেখে কদাচিৎ ভ্রু কোঁচকালেও এক্কেবারে বারণ করেন নি, দেবী শীতলাকে স সি বলে উপড়ে ফেলেননি।
[চলবে]



আরো সংবাদ