২৭ নভেম্বর ২০২০

রেনেসাঁ ও ফররুখ মানস

-

বাংলা সাহিত্যে অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) যে সময় সাহিত্য চর্চা করেছেন সে সময়টা ছিল দুর্বল অসহায় অতিসাধারণ মানুষদের জন্য চরম সঙ্কটকাল। বিশ্বে দু-দু’টি বড় বড় যুদ্ধ; দেশে খাদ্যসঙ্কট, দুর্ভিক্ষ, বেনিয়াদের অত্যাচার, দেশীয় দালালদের দৌরাত্ম্য ও দাসত্ব; রাজনীতিতে দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং স্বার্থানে¦ষী গোষ্ঠীর আত্মপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সমাজবিধ্বংসী চেতনা সমাজকে ঘোর অন্ধকারে টেনে এনেছিল। তখন ভারতবর্ষের মসনদে অধিষ্ঠিত হয়ে ইংরেজরা বৈষম্যের ডালা সাজিয়ে কিছু প্রজাকে করে রেখেছিল কোণঠাসা। এমন অমানিশার নিকষ অন্ধকারে বসে একজন প্রকৃত সাহিত্যিক কখনোই আত্মভোলা হয়ে থাকতে পারে না। ফররুখ আহমদও পারেননি। মনের গহিনে কোথায় যেন অনুভব করেছিলেন মানবমুক্তির জয়গান। প্রকৃত লেখকদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়া। পরের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করা এবং সেই কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা। ফররুখ আহমদও ক্ষতবিক্ষত ছিলেন মানুষের প্রতি মানুষের জুলুম, অত্যাচার নিগ্রহ দেখে। বিশেষ করে তিনি মুসলিম ঐতিহ্যের ধ্বংস দেখে শঙ্কিত ছিলেন। মুসলিমদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য ছিল শৌর্যের, মানবতার, মনুষত্বের, বীরত্বের। সেটা ভেঙে গিয়ে মুসলমান বিশ্বজুড়ে নিগ্রহের জাঁতাকলে পিষ্ট হযেছে। মুসলিমদের এ অধঃপতন ফররুখ আহমদের মনকে করে তুলেছিল ব্যথিত, উদ্বেলিত। জাতির এমন গাঢ় অন্ধকার দেখে কবি ফররুখ স্থিত থাকতে পারেননি। মুসলমানদের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা এবং সহজ-সরল সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি লিখতে শুরু করলেন একের পর এক কবিতা। তিনি পাঞ্জেরী কবিতায় লিখলেনÑ
রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে,আমি দাঁড় টানি ভুলে
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি ॥
কবিতা দিয়ে ফররুখ আহমদ অবহেলিত মানুষকে আত্মসচেতন করার মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত করতে চাইলেন। মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলেন অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য, ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তিনি চাইলেন নিগৃহীত মানুষরা অবিচার, অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে শিখুক, প্রতিরোধ গড়ে তুলুক, জেগে উঠুক, ঘুরে দাঁড়াক। মুসলমানদের ঘুরে দাঁড়ানোকেই বলা হচ্ছে মুসলিম রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ। এ কারণেই ফররুখ আহমদের পরিচিতি রেনেসাঁর কবি জাগরণের কবি। ফররুখ আহমদের ব্যাপক পরিচিতি পেতে হলে যেতে হয় তাঁর সৃষ্টি সম্ভারে। তাঁর কর্মপরিধিতে রয়েছে মানুষের জয়গান। মানুষের জন্য তিনি রচনা করেছেন ‘সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪); সিরাজাম মনিরা (১৯৫২); নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১); মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩); ধোলাই কাব্য (১৯৬৩); হাতেম তায়ী (১৯৬৬); নতুন লেখা (১৯৬৯); কাফেলা (১৯৮০); হাবিদা মরুর কাহিনী (১৯৮১); সিন্দাবাদ (১৯৮৩); দিলরুবা (১৯৮৪)। শিশুদের জন্য লিখলেন- পাখির বাসা (১৯৬৫); হরফের ছড়া (১৯৭০); ছড়ার আসর (১৯৭০) এবং ফুলের জলসা (১৯৮৫) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়াও তিনি লিখেছেন কাব্যনাট্য। ফররুখের কাব্য প্রতিভার মূল লক্ষ্যই ছিল মুসলমানদের ঐতিহ্যকে তুলে এনে সমাজে তার বিস্তার ঘটানো। এ কাজটি তিনি নিরলসভাবে করেছেন কবিতা রচনার মাধ্যমে।। ফররুখের সবচেয়ে জননন্দিত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’। এ গ্রন্থের ‘সিন্দবাদ’ কবিতায় কবি স্মরণ করলেন জাতির সোনালি অতীতকে। তিনি লিখলেনÑ
কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ
পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ ব’য়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক;
নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ।
ফররুখ আহমদ যখন এক এক করে কবিতার প্লট তৈরি করেছেন তার আগেই ইউরোপীয় রেনেসাঁর হাওয়া এশিয়াতেও সবেগে বইয়ে গেছে। আনুমানিক চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্তু চলেছে ইউরোপজুড়ে পুনর্জাগরণ। ইতালির ফ্লোরেন্সে পঞ্চদশ শতকের প্রথম দিকে রেনেসাঁর সূত্রপাত ঘটেছিল। ধারণা করা হয় সেখান থেকেই আধুনিক ইউরোপের উত্থান ঘটেছে। রেনেসাঁ হলো সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। অর্থাৎ প্রাচীন যুগের গ্রিক ও রোমান সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, শিল্পকলা ইত্যাদি অধ্যয়নের মাধ্যমে জীবনকে নতুনরূপে পরিচালনা করা। সরল অর্থে বলা যেতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজজীবনে যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছিল সেটাই রেনেসাঁ। মনে করা হয় ক্লাসিক্যাল গ্রিক ও রোমান সভ্যতার প্রতি মানুষের আগ্রহ থেকেও রেনেসাঁর বিস্তার ঘটেছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ মানুষকে মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা থেকে টেনে বের করে ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা ও সাম্য-সমতার মূল্যবোধে বিশ্বাস করানো। এ ধারার লেখক ছিলেন পেত্রাক। পেত্রাক দেখালেন ক্লাসিক্যাল বিজ্ঞানের পুনর্জাগরণই শুধু নয়, ক্লাসিক্যাল আত্মারও পুনর্জাগরণ দরকার। তিনি রচনা করলেন নতুন ধারার সনেট সাহিত্য। ইউরোপীয় সাহিত্যে জীবনবোধের যে ধারা সৃষ্টি হলো তা সঞ্চারিত হতে থাকে বিশ্বজুড়ে এবং ভারতবর্ষে তার প্রভাব পড়ে উনিশ শতকের দিকে। মূলত রাজা রাম মোহনের সময় (১৭৭৫-১৮৩৩) এই জাগরণ শুরু হয়। বিশেষ করে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজদের সংস্পর্শে এসে বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ইত্যাদিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। উল্লেখ্য, ইউরোপের মানবতাবাদী চেতনা চণ্ডিদাসকেও প্রভাবিত করেছিল। সেজন্যই তিনি লিখতে পেরেছিলেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নেই’।
মানবতার যে কনসেপ্ট ইতালি রেনেসাঁসে বলা হচ্ছে তা আসলে নতুন কিছু নয়। এটি পুরাতন। এর আগেই আরব রেনেসাাঁয় মানবতার পত্তন হয়েছিল মুহাম্মদ সা. এর তত্ত্বাবধানে মক্কা-মদিনা নগরীতে। ফররুখ আহমদ সে রেনেসাঁর সাথে যে পরিচিত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার কাব্যের ভাব ও ভাষা বিশ্লেষণে। যে জ্ঞান, সাম্য, মানবতা, বিজ্ঞান ও ক্লাসিকাল আত্মার কথা ইউরোপীয় রেনেসাঁয় উঠে এসেছে তা সেমেটিয় সভ্যতার প্রভাব থেকেই এসেছে। এ কথা ইউরোপ অস্বীকার করলেও মুসলিম সমাজ তা করতে পারে না। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অকাট্য ইতিহাসের পরিপূর্ণ উৎস কুরআনুল হাকিম। কুরআনুল হাকিমের নিখাদ তথ্যে দেখা যায়, মুহাম্মদ সা.সহ নবী-রসূলগণই আরব সমাজে সৃষ্টি করেছিলেন এক নবজাগরণ; যে জাগরণের মূল প্রতিপাদ্যই ছিল মানবতার মুক্তি। এই ধারাকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন সাহাবা আজমাইন ও খোলাফায়ে রাশেদিন।
এ জাগরণের আলোর ছটায় একদিন ইউরোপের স্পেনও ঝলমলিয়ে উঠেছিল। নবজাগরণের সেই দিনগুলোর ইতিহাস থেকে ফররুখ আহমদ কখনই বাইরে ছিলেন না। ইতিহাসের সেই জ্ঞানকেই তিনি আবার কাজে লাগাতে চেয়েছেন। ফররুখ আহমদ লক্ষ করেছেন ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে ঠিকই কিন্তু মানবাত্মার মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। সেজন্যই ঘটেছিল ১৭৫৭ সালে পলাশীর ঘটনা; ১৮৫৮ সালে আজাদী আন্দোলন; ১৯২৩ সালে তুরুস্ক খেলাফতের অবসানসহ ইতিহাসের নানান ঘটনা। এমন সব ঘটনা ফররুখ আহমদকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে।
মানুষের মুক্তির জন্য ফররুখ আহমদের প্রেরণার প্রধান উৎস ছিল নবুয়তের জ্ঞান আর দ্বিতীয় উৎস ছিল বাগদাদ, কায়রো ও কর্ডোভার ইতিহাস। কিন্তু আজ পৃথিবীর মানুষ শোষিত হচ্ছে সেই পেত্রাকি শোষণে। ইতিহাস সচেতন কবি ফররুখ তাই তার ‘লাশ’ কবিতায় লিখলেনÑ
হে জড় সভ্যতা
মৃত- সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ!
মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ;
তারপর আসিলে সময়
বিশ্বময়
তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডে পদাঘাত হানি’
নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে টানি;
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও,
ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও॥


আরো সংবাদ